ইস্টবেঙ্গল-০
লাজং এফসি ০
দুর্ঘটনায় আড়াই মাস হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা মিশায়েল শুমাখার আর ইস্টবেঙ্গলের মধ্যে মিল কোথায়?
স্কি করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত সাত বারের ফর্মুলা ওয়ান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন এখন গভীর কোমায়।
কিংবদন্তি জার্মান চালককে নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন জল্পনা চলছে। কখনও বলা হচ্ছে তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন। কখনও বলা হচ্ছে, আর বাঁচবেন না শুমাখার।
আর্মান্দো কোলাসোর টিমের আই লিগের খেতাব জয়ের জন্য বেঁচে থাকার রেখচিত্র অনেকটা সে রকমই।
তিন দিন আগেই মহমেডান ম্যাচ জেতার পর মনে হচ্ছিল, এই বুঝি খেতাব জয়ের লড়াইয়ে ভেসে উঠলেন চিডি-মোগারা। আবার যুবভারতীতে শুক্রবার ম্যাচের পর মনে হচ্ছে ইস্টবেঙ্গলের আই লিগ জয়ের স্বপ্নের মৃত্যু হয়তো হয়েই গেল।
“খেতাবের ব্যাটনটা আর আমাদের হাতে নেই। এই ম্যাচটা জিতলে হয়তো আশা থাকত। এখন অপেক্ষা করতে হবে, কবে বেঙ্গালুরু পয়েন্ট নষ্ট করে,” ম্যাচের পর হতাশ শোনায় লাল-হলুদের গোয়ান কোচের গলা। ঠোঁটের কোণে পরিচিত হাসিটা উধাও। কর্তারা আই লিগ খেতাব জয়কে তাঁর টিকে থাকার ডেডলাইন করে দিয়েছেন আগেই। বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে আর্মান্দোর জায়গায় নতুন নতুন কোচের নাম। লিগ অঙ্কের জটিল নিয়মে বেঁচে থাকলেও আই লিগে ইস্টবেঙ্গল যে কার্যত কোমায় তা বুঝে গিয়েই সম্ভবত আর্মান্দোর মুখ থেকে এ দিন বেরিয়েছে, “শেষ দিন পর্যন্ত চেষ্টা করে যাব যতটা উপরে থাকা যায়। আমি তো শেষ দিন পর্যন্ত ইস্টবেঙ্গল কোচই।” ডেম্পোকে পাঁচ বার আই লিগ খেতাব জেতানো কোচ বিধ্বস্ত। হতাশ। মরুভূমির মধ্যে হঠাৎ হাজির কোনও বাসিন্দা মনে হয় তাঁকে।
কিন্তু বিদায়ী মার্কোস ফালোপার আমলে এই লাজংকেই তো চার গোল দিয়েছিলেন চিডি-মোগারা! পাহাড়ে গিয়ে কঠিন শৃঙ্গ জয় করে লাল-হলুদ পতাকা পুঁতে এসেছিলেন ডিকারা। সেই টিমের সঙ্গেই এ দিন কেন এমন দিশাহীন ফুটবল খেললেন অর্ণব-ডিকারা? কেন মাঝমাঠ আর জোড়া বিদেশি স্ট্রাইকারের মধ্যে কোনও সেতু ছিল না বল জোগানোর? কেন এক লাইনে বারবার দাঁড়িয়ে পড়ে লাল-হলুদ রক্ষণ বারবার ডেকে আনছিল বিপদ? কেন অতিমানব হয়ে বারবার উইলিয়ামস-টুবোইদের নিশ্চিত গোল রুখে দিতে হচ্ছিল? ইস্টবেঙ্গল তো প্রথম সুযোগই পেল দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর পাঁচ মিনিট পর! কেন, কেন এই হাল। আর্মান্দোর যুক্তিটা শুনলে ঘোড়াও হয়তো হাসবে। “আসলে আত্মতুষ্টি। এই টিমটাকেই তো চার গোল দিয়েছিল আমাদের টিম।” আরে তিন-চার মাস আগের হ্যাংওভার কাটেনি এখনও! কবে ঘি দিয়ে ভাত খেয়েছে, তার গন্ধ এখনও! এই টিমটার তা হলে পেশাদারিত্ব কোথায়? সত্যিই নেই, একেবারেই নেই। না হলে ম্যাচ শুরুর কিছুক্ষণ আগে কোচ জানতে পারেন দলের গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার হরমনজ্যোৎ খাবরা কার্ডের জন্য খেলতে পারবেন না! যার পরিণতিতে একটা টিম লিস্টের অন্য পিঠে নতুন টিম ছেপে প্রেসবক্সে দিতে হল ইস্টবেঙ্গলকে! পেশাদারিত্বের যুগে এ রকমও হয়? গোটা পঞ্চাশেক কাগজও জুটল না নতুন টিম লিস্ট ছাপানোর জন্য!
খাবরা না থাকায় আর্মান্দোর ছকে আসা পরিকল্পনাটাই যে ঘেঁটে গেল। তাঁর জায়গায় হঠাৎ নামা সুবোধ কুমার তো মানসিক প্রস্তুতির অভাবে ‘সুবোধ বালক’-এর মতো দাঁড়িয়েই রইলেন। আর সেই সুযোগটা নিয়ে ব্রাজিলিয়ান উইলিয়ামস, বৈথাং, টুবোইরা পাহাড় থেকে নেমে এসে সমতলে দৌরাত্ম্য করে গেলেন। উইলিয়ামসের শট পোস্টে লাগল, বৈথাং-টুবোইয়ের নিশ্চিত গোল রুখলেন লাল-হলুদ কিপার অভিজিৎ।
এ ভাবেই লাজং-রক্ষণে বারবার আটকে গেল চিডিদের আক্রমণ।
নিজেদের মাঠে খেলা। শিলংয়ের ঠান্ডা থেকে আসা লাজংকে মরসুমের সবথেকে গরম দিনে খেলতে নামানো। বিশ্বকাপার কর্নেল গ্লেনের মতো বিপক্ষের সেরা স্কিমার চোটের জন্য মাঠের বাইরে। এত সব সুবিধা নিতে পারল না আর্মান্দোর টিম। আর নিজেদের মাঠের বাইরের পিছিয়ে পড়া রুখতে দেশীয় কোচ থাংবোই দুটো অসাধারণ চাল দিলেন। ফর্মেশন বদলে ৪-৩-২-১ চলে গেলেন। আর তুলুঙ্গা এবং ডিকার ডানা মেলা উইং দৌড় আটকাতে পাল্টা পাঠালেন হাউকিপ আর রিদমকে। চিডি-মোগাদের আটকাতে শিলং কোচের স্ট্র্যাটেজি ছিল ডাবল কভারিং। তাইসুকেকে ডাবল কভারিং করে সেটাই করলেন তিনি। লাল-হলুদের জোড়া বিদেশি স্ট্রাইকারকে অকেজো করে দেওয়ার মূল হোতা জাপানি মিনচোল শন বলছিলেন, “প্রথম পর্বে চার গোল খাওয়ার সময় আমি মাঝমাঠে ছিলাম। এ বার স্টপারে খেলেছি ওদের আটকাব বলে।” ইস্টবেঙ্গলকে আটকে সুয়োকার গাড়িতে ওঠার সময় শিলং স্টপারের মন্তব্য, “ওরা দু’জনেই কিন্তু আনফিট। আগের বার যা দেখেছিলাম সেই জায়গায় নেই কেউই।” কেন এমন হল তার উত্তর অবশ্য আর্মান্দোর কাছে নেই।
ইস্টবেঙ্গলের চূড়ান্ত বিশৃঙ্খল ফুটবলের দিনেও সুযোগ যে আসেনি তা নয়। পরিবর্ত লোবো গোল নষ্টের পর আর এক পরিবর্ত লেনও ওয়ান-টু-ওয়ান অবস্থায় পেয়ে গিয়েছিলেন শিলং কিপারকে। কিন্তু গোল করতে পারেননি।
ইস্টবেঙ্গলের পিছিয়ে যাওয়া চোখের সামনে দেখল চ্যাম্পিয়ন হতে যাওয়া বেঙ্গালুরু। ওয়েস্টউডের টিম এতটাই পেশাদার যে, পরের লাজং ম্যাচের স্ট্র্যাটেজি ঠিক করতে একদিন কলকাতায় থেকে গিয়েছিলেন সুনীল ছেত্রী-শন রুনিরা। মেপে নিলেন পাহাড়ের টিমকে। যুবভারতীতে খেলা দেখে বেরোনোর মুখে পুরো বেঙ্গালুরু টিমের মুখেই চওড়া হাসি। হবে না-ই বা কেন! পথের কাঁটা যে একে একে সরে যাচ্ছে।
আমার্ন্দোর টিমের আরও অন্ধকারে চলে যাওয়ার দিনে বেঙ্গালুরু ছাড়া খুশি হবেই বা কে?
ইস্টবেঙ্গল: অভিজিৎ, নওবা, রাজু, অর্ণব, রবার্ট, ডিকা, সুয়োকা, সুবোধকুমার (লোবো), তুলুঙ্গা (বলজিৎ), চিডি, মোগা (লেন)।
ছবি: উৎপল সরকার।