ইস্টবেঙ্গল-৩ (চিডি-পেনাল্টি, ভাসুম, লেন)
রাংদাজিদ-১ (র্যান্টি)
পাহাড় টপকেও আলোর ঝর্নাধারায় গা ভাসাতে পারছেন না! উল্টে আরও যেন দুঃস্বপ্নের অন্ধকার গলিতে ঢুকে পড়লেন আর্মান্দো কোলাসো!
আই লিগের কঠিন যুদ্ধে রবিবার রাংদাজিদকে বড় ব্যবধানে হারানোর পরেও লাল-হলুদ কোচের রাতের ঘুম কেড়ে নিলেন নিজের দলেরই দুই সৈনিক জেমস মোগা ও সুয়োকা রিউজি! প্রথম জন ইস্টবেঙ্গলের চোটের তালিকা-বৃদ্ধিতে অবদান রাখলেন। পরের জন বিখ্যাত লাল-হলুদ ঐক্যবদ্ধতার প্রাচীরে সপাটে ‘হাতুড়ি’ মারলেন।
চোট-আঘাতে এমনিতেই নাজেহাল আর্মান্দোর দল। গোদের উপর বিষফোঁড়া এ বার মোগার কুচকির চোট। সুদানের জাতীয় দলের স্ট্রাইকার আগেই চোট নিয়ে ভুগছিলেন। তাই তাঁকে ‘নিরাপদ-অঞ্চলে’ রাখার জন্য এ দিন প্রথম দলে রাখেননি আর্মান্দো। ৪-৪-১-১ ছকে একা স্ট্রাইকার চিডির ভরসায়। যিনি ম্যাচের ১৫ মিনিটেই কোচের অটুট বিশ্বাসের যোগ্য মর্যাদা তো দিলেনই, একই সঙ্গে আই লিগে নিজের ১০০তম গোল করে ফেললেন পেনাল্টি কিকে। ম্যাচ শেষে যে রেকর্ডের কথা শুনে নাইজিরিয়ান স্ট্রাইকার অবাক ভাবে বললেন, “আমার তো মনেই ছিল না। এই সাফল্য আমার পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই। বিশেষ করে আমার বেটার-হাফের সঙ্গে।”
মোগাকে বেঞ্চে রাখার প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারেননি আর্মান্দো। চিডির গোলের পর যখন র্যান্টি মার্টিন্সের গোলে ১-১ করে ফেলেছে রাংদাজিদ, তখন লাল-হলুদ কোচ জয়ের গোলের সন্ধানে সুয়োকার পরিবর্তে নামান মোগাকে। যেখান থেকে ইস্টবেঙ্গল শিবিরে তাণ্ডবের শুরু। যে আগুনের আঁচ ম্যাচের এক ঘণ্টা পরেও টের পাওয়া গেল যুবভারতীর সর্বত্র।
ম্যাচের বয়স তখন চল্লিশ মিনিট। সুয়োকাকে বসাতেই যেন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন জাপানি মিডিও। মাঠ থেকে বেরিয়ে রিজার্ভ বেঞ্চে গিয়ে বসা তো দূরের কথা, গট-গট করে হেঁটে যুবভারতীর টানেল দিয়ে সোজা ড্রেসিংরুমে চলে গেলেন। যাওয়ার আগে চোখ-মুখে চরম বিরক্তি নিয়ে নিজের দলের রিজার্ভ বেঞ্চের দিকে আঙুল তুলে বিড়বিড় করতে দেখা গেল তাঁকে। সুয়োকার ক্ষোভের তির যে লাল-হলুদ কোচের উদ্দেশ্যে, সেটা অবশ্য গ্যালারিতে বসে থাকা কচি-কাঁচাদেরও বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। বিরতিতে ক্ষোভের মাত্রা আরও বেড়ে যায় যখন আর্মান্দো ড্রেসিংরুমে ঢোকেন। কোচ দরজা ঠেলে ঢুকতেই তাঁর সামনে তোয়ালে ছুড়ে সজোরে মাটিতে আছাড় মারেন সুয়োকা। পরিস্থিতি ক্রমে ঘোরালো হতে দেখে ‘আসরে’ নামেন লাল-হলুদের অন্যতম শীর্ষকর্তা দেবব্রত সরকার। তাঁর হস্তক্ষেপেই দ্বিতীয়ার্ধে দলের সঙ্গে মাঠে গিয়ে বেঞ্চে বসেন সুয়োকা। ছেড়ে ফেলা জার্সি-টার্সি ফের গায়ে দিয়ে।
‘পিকচার’ অবশ্য এখানেই শেষ নয়! সুয়োকা-এপিসোডের প্রভাব এতটাই তীব্র ছিল যে, ম্যাচের পরে সাংবাদিক সম্মেলনে ‘সিকিউরিটি গার্ড’-এর মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় ম্যাচ কমিশনার গোকুলদাসকে। সুয়োকা নিয়ে প্রশ্ন হলেই অভূতপূর্ব ভাবে পিছনে থেকে ম্যাচ কমিশনারের আবেদন ভেসে উঠছে, “প্লিজ, এই নিয়ে কোনও প্রশ্ন করবেন না।” ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসেই নয়, কোনও খেলায় এ রকম ঘটনা আগে কখনও ঘটেছে কি না সন্দেহ। ম্যাচ কমিশনার হস্তক্ষেপ করছেন সাংবাদিক সম্মেলনে! সাজিয়ে দিচ্ছেন নিদিষ্ট প্রশ্নমালা!
তাতেও অবশ্য আর্মান্দোর মুখ বন্ধ করা যায়নি। বরং লাল-হলুদ কোচের সোজাসাপ্টা উত্তর, “পুণেতেও সুয়োকা এ রকম ভাবে আমাকে আক্রমণ করেছিল। সুয়োকা যা করেছে, তার জন্য ওর লজ্জিত হওয়া উচিত। আমি ওর সঙ্গে ঝগড়া করব না বলে কর্তাদের জানিয়ে দিয়েছি, যা শাস্তি দেওয়ার আপনারাই ঠিক করুন। আমার কিছু বলার নেই।” সুয়োকার উপর বিরক্ত কর্তারাও। তবে দলে অনেক ফুটবলারের চোট-আঘাতের কথা চিন্তা করে এখনই জাপানির বিরুদ্ধে বড় শাস্তির পথে হাঁটছেন না তাঁরা। দেবব্রতবাবু বললেন, “সুয়োকা ওর আচরণের জন্য কোচের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। আমরা ওকে শেষবারের মতো সতর্ক করে দিয়েছি।”
রবিবারের যুবভারতীতে পাশাপাশি আরও একটা বড় আলোচনার বিষয় কেন তাঁর ফুটবলারদের সঙ্গে বারবার বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছেন আর্মান্দো? মরসুমের শেষ বড় ম্যাচ শুরুর আগে চিডি হঠাৎ উধাও! কোচের প্রাথমিক টিম লিস্টে নাম থাকা সত্ত্বেও। এ দিনও মোগার নাম শুরুতে প্রথম এগারোয় ছিল। পরে তা কেটে ভাসুম করে দেওয়া হয়। এ-হেন শেষ মুহূর্তের রদবদলে সমস্যা হচ্ছে ফুটবলারদেরও। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক ইস্টবেঙ্গল ফুটবলার বললেন, “সকালেও জানতাম মোগা খেলবে। মাঠে নেমে দেখলাম নেই। দুম করে সিদ্ধান্ত নিলে মানসিক প্রস্তুতির সময় থাকে না।”
ইস্টবেঙ্গলের সৌভাগ্য, কোচের খামখেয়ালিপনার প্রভাব টিমের স্কোরলাইনে পড়েনি। প্রধান কারণ, ব্যক্তিগত দক্ষতা। দলের প্রথম গোলে পেনাল্টি আদায়ে চিডি নিজেই কান্ডারি। দ্বিতীয় গোলের পিছনে চিডির পাস থাকলেও তিন জনকে কাটিয়ে রাংদাজিদ-রক্ষণ ভাঙার নায়ক স্কোরার ভাসুম। শেষ গোল আবার ভাসুমের পাস থেকে লেনের। সেখানেও তিনি সূক্ষ্ম চিপে বিপক্ষ গোলকিপারকে যে ভাবে বোকা বানান, তাতে ব্যক্তিগত দক্ষতাই ফুটে ওঠে। নইলে তিন গোলে জেতা ম্যাচে সেরার পুরস্কার লাল-হলুদ গোলকিপার অভিজিৎ মণ্ডল পাবেন কেন!
তিন গোলের পাশপাশি ক্ষোভ, ঝামেলা, বিতর্ক! তবু অনেক অস্বস্তির মধ্যে আর্মান্দোর স্বস্তি অন্তত অঙ্কের বিচারে আই লিগ শৃঙ্গ-জয়ের স্বপ্ন এখনও দেখতেই পারেন লাল-হলুদ কোচ!
আই লিগের প্রথম পাঁচ গোলদাতা
র্যান্টি ১৮০
ওডাফা ১৬৫
ইয়াকুবু ১৪৩
ব্যারেটো ১০১
চিডি ১০০
ভারতীয়দের মধ্যে
ভাইচুং ৮৯
সুনীল ৭৮
* পরিসংখ্যান হরিপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
ইস্টবেঙ্গল: অভিজিৎ, রাজু, অর্ণব, অভিষেক, রবার্ট, হরমনজ্যোৎ, সুয়োকা (মোগা, লেন, সুবোধ), ভাসুম, লোবো, জোয়াকিম, চিডি।
হারল এক নম্বর
নিজস্ব সংবাদদাতা • কলকাতা
আই লিগে ধাক্কা খেল বেঙ্গালুরু এফসি। শিলংয়ের মাঠে লাজং এফসি-র কাছে ০-৩ হারলেন সুনীল ছেত্রীরা। যদিও ২০ ম্যাচে ৩৭ পয়েন্ট নিয়ে আই লিগের শীর্ষে এখনও বেঙ্গালুরুই। মূলত কর্নেল গ্লেনের কাছেই আত্মসমর্পণ করল এ দিন বেঙ্গালুরু। লাজংয়ের তিনটি গোলই দ্বিতীয়ার্ধে। উইলিয়ামস ১-০ করার পর অবশ্য অ্যাশলি ওয়েস্টউডের দল সমতা ফেরানোর সুযোগ পেয়েছিল। উল্টে ম্যাচের শেষের দিকে গ্লেন পরপর দু’টো গোল করেন লাজংয়ের হয়ে। লিগে তৃতীয় স্থানে থাকা পুণে এফসি-ও হারের স্বাদ পেল এ দিন। সুভাষ ভৌমিকের চার্চিল ব্রাদার্সের কাছে হারল পুণে। ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পুণে ২-১ এগিয়ে থাকলেও ইনজুরি টাইমে নাটকীয় ভাবে বলবন্ত সিংহ এবং বিনীশ বালানের গোলে ৩-২ জিতল চার্চিল। চার্চিলের এই জয়ে মহমেডান চলে গেল ১৩ নম্বরে। অর্থাৎ আরও অবনমনের আওতায়।