Advertisement
E-Paper

বাংলার আসন্ন রঞ্জি বিদায় দেখলেন দুই ‘বাতিল ঘোড়া’

সন্ধ্যায় স্বপ্ননগরীর রাস্তার মহা ট্র্যাফিক জ্যামে ফাঁসলে যে অবস্থা হয় মুম্বইয়ের ‘রইস’-দের। না পারেন বসে থাকতে, না পারেন দামি গাড়ি থেকে নেমে একা হেঁটে চলে যেতে, তাঁর অবস্থা যেন সে রকম।

রাজীব ঘোষ

শেষ আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০৩:৫৩

সন্ধ্যায় স্বপ্ননগরীর রাস্তার মহা ট্র্যাফিক জ্যামে ফাঁসলে যে অবস্থা হয় মুম্বইয়ের ‘রইস’-দের। না পারেন বসে থাকতে, না পারেন দামি গাড়ি থেকে নেমে একা হেঁটে চলে যেতে, তাঁর অবস্থা যেন সে রকম।

ব্রেবোর্ন স্টেডিয়ামের টিভি কমেন্ট্রি বক্সে বসে সারা দিন ধরে বাংলার পারফরম্যান্স দেখে তাঁর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে চৌচির। না পারছেন থাকতে। না পারছেন বক্স ছেড়ে বেরিয়ে যেতে। খেলা শেষ হওয়া পর্যন্ত আর থাকতে পারলেন না। তার আগেই মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে চলে গেলেন। রাগে, দুঃখে কিছুটা অভিমানেও।

বাংলার প্রাক্তন কোচ অশোক মলহোত্র। যাঁকে চরম অবহেলা সহ্য করে বাংলার কোচের দায়িত্ব থেকে সরে যেতে হয়েছিল। এক বছরও হয়নি। তাই ঘা-টা ঠিকমতো শুকোয়ওনি বোধহয়। সেই ঘায়েই এ দিন যেন নুনের ছিটে পড়ল।

Advertisement

এ বারের রঞ্জি ট্রফিতে বাংলার শেষের শুরু দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে পড়া মলহোত্র ব্রেবোর্ন ছেড়ে বেরোনোর আগে বলে গেলেন, ‘‘আর পারছি না দেখতে। সারা দিন ধরে খুব কষ্ট করে বসে বসে দেখতে হয়েছে বাংলার জঘন্য ক্রিকেট। নেহাত কমেন্ট্রি করতে এসেছি, তাই। না হলে আরও আগে চলে যেতাম।’’

মরসুমের মাঝখানেই যিনি দুই দশকেরও বেশি ক্রিকেট কেরিয়ার শিকেয় তুলে অবসর নিতে কার্যত বাধ্য হয়েছেন, সেই লক্ষ্মীরতন শুক্ল বাড়িতে বসে টিভিতে বাংলার খেলা দেখছিলেন। তাঁর উপায় ছিল টিভির সামনে থেকে উঠে যাওয়ার। কিন্তু পারেননি। বললেন, ‘‘বাংলার খেলা। কী করে উঠে যাই বলুন তো?’’

দুই বাতিল ঘোড়া। একজন ছিলেন কোচ ও অন্যজন অধিনায়ক। এই দুই প্রাক্তনকে সরিয়ে নাকি এখন বঙ্গ ক্রিকেটের ভরা সংসার। তা বঙ্গ ক্রিকেটের ভরা সংসার থেকে যে এমন মরা ক্রিকেট বেরিয়ে আসবে, তা কেউ ভেবেছিলেন?

শুক্রবার ব্রেবোর্নের প্রেস গ্যালারিতে বসে রঞ্জি ট্রফি থেকে বাংলার আসন্ন বিদায় দেখতে দেখতে নোটবুকে ছ’সাত লাইনের বেশি নোট নেওয়া গেল না। ক্রিকেট-পাগল মুম্বইয়ের প্রাচীন ক্রিকেট মন্দিরে যেমন এই নিষ্প্রাণ ক্রিকেট দেখার কেউ নেই, তেমনই বাংলার বোলার, ফিল্ডারদের পারফরম্যান্সে উল্লেখ করার মতো কিছুই নেই। সারা দিন ধরে তাঁদের উপর মাতব্বরি করে গেলেন মধ্যপ্রদেশের ব্যাটসম্যানরা। এটুকুই লেখার।

ব্রেবোর্নে বাংলার বোলাররা ধুঁকতে ধুঁকতে বিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের একটা সেঞ্চুরি, দুটো হাফ সেঞ্চুরি করতে দেখলেন। যা দেখতে দেখতে কমেন্ট্রিতে বসে অশোক মলহোত্রকে বারবার ‘শানদার পারফরম্যান্স... কেয়া শট হ্যায়’ বলে গলা তুলতে হল। যে সংসারটা নিয়ে গত দু’বছর ধরে ক্রিকেটজীবনে ঘর করেছেন, সেই সংসারের এমন দৈন্যদশা দেখে অশোক বললেন, ‘‘খুব কষ্ট হচ্ছিল। অথচ কিছু করারও নেই। হাত-পা বাঁধা। সেই অধিকার তো আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তাই আরও বেশি কষ্ট হচ্ছিল। এই উইকেটে, যেখানে এমপি দু’ইনিংস মিলিয়ে প্রায় সাতশো রান তুলে ফেলেছে, সেখানে আমাদের ছেলেরা উইকেট ছুড়ে ছুড়ে দিয়ে চলে এল! আমার এখনও বাংলার ইনিংসটা কেমন দুঃস্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। যার মাঝখানে ঘুম ভেঙে গেলেই ভাল হত।’’

আর লক্ষ্মীরতন শুক্ল। তিনি বলার মতো কোনও ভাষাই নাকি খুঁজে পাচ্ছেন না। সন্ধ্যায় ফোনে বললেন, ‘‘কী আর বলব? আমার কিছু বলার নেই।’’ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বললেন, ‘‘বাংলার এই ব্যাটিং দেখে আমি খুব হতাশ। টস জিতে কেন ফিল্ডিং নিল কে জানে? তা ছাড়া একটা বোলারের উপর ভরসা করে কখনও রঞ্জির কোয়ার্টার ফাইনাল জেতা যায় না। দিন্দার উপর সব চাপ পড়ে গেলে তো এমন হবেই। দলে তো আর একজন পেশাদার ক্রিকেটার আছে, প্রজ্ঞান ওঝা। ওর বোলিং দেখে তো আমি হতাশ। ও যদি টার্নিং উইকেট না পেলে ভাল বল করতে না পারে, বাংলার ক্রিকেটের পক্ষে সেটা দুর্ভাগ্যজনক।’’ অন্য দিক থেকে মলহোত্রর আক্রমণ, ‘‘শুনেছি এখন নাকি বাংলার ড্রেসিংরুমের আবহাওয়া আগের চেয়ে ভাল। কিন্তু মাঠে তো তার প্রতিফলন দেখলাম না।’’

তবে অশোক দিন্দাকে নিয়ে মলহোত্র বলছেন, ‘‘ও আর আগের মতো নেই। বলের স্পিড কমে গিয়েছে, টানা বেশিক্ষণ বল করতেও পারছে না।’’ লক্ষ্মীর ব্যাখ্যা, ‘‘দিন্দার উপর এত চাপ পড়ে যাচ্ছে যে ও আর তা নিতে পারছে না।’’ তা হলে দলের তরুণ পেসাররা? মলহোত্রর বক্তব্য, ‘‘বীরপ্রতাপ ফিট নেই। তবু ওকে কেন নেওয়া হয়েছে জানি না। মুকেশকে এখনও অনেক দূর যেতে হবে।’’

ও দিকে যেখানে হরভজন, গুরকিরাতদের পঞ্জাবকে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠতে চলেছে অসম, সেখানে সৌরভের বাংলার এই অবস্থা! দায়ী কে? ‘‘কোচের দায়িত্বই বেশি। সে তো ক্যাপ্টেন ছাড়া আর কোনও সিনিয়রের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয় না’’, বললেন লক্ষ্মী, ‘‘সঠিক পরিকল্পনার অভাব। দলটাকে দাঁড় করাতেই পারেনি সাইরাজ।’’ মলহোত্রর অভিযোগ, ‘‘টস জিতে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্তই তো ভুল হয়েছে। তার পর এই পারফরম্যান্স। কোচের সঙ্গে ক্রিকেটাররাও দায়ী।’’ সিএবি প্রেসিডেন্ট সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় কিছু বলবেন কী? ফোনই ধরলেন না। মাঠে দাঁড়িয়ে নির্বাচক প্রধান দেবাঙ্গ গাঁধী-র সাফাই, ‘‘নতুন ছেলেদের আর একটু সময় দিতে হবে তো। কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছি, এটাই যথেষ্ট।’’

লিখতে তো ভুলেই গিয়েছি যে দ্বিতীয় ইনিংসে মধ্যপ্রদেশ ৩৩৮-৫ তুলে বাংলার ঘাড়ে ৫৬৫ রানের বোঝা ইতিমধ্যেই চাপিয়ে দিয়েছে। শনিবার নাকি আরও চাপাতে পারে। এখনও দু’দিন হাতে আছে যে। দিন্দাদের পিটিয়ে অনামী রজত পাটিদার সেঞ্চুরি হাঁকালেন। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে চারশোতম উইকেট পেয়েও খুশি হলেন না প্রজ্ঞান ওঝা।

সাকুল্যে এই নোটগুলোই নোটবইয়ে ছিল।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

মধ্যপ্রদেশ ৩৪৮ ও ৩৩৮-৫ (রজত ১৩৭, নমন ৫২, বুন্দেলা ৭২, দিন্দা ১-৬৫, প্রজ্ঞান ১-৯৩)। বাংলা ১২১।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy