২৯ বছর। ১৬ অগস্ট, ১৯৯০। হাজরায় সভা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। হঠাৎ করেই সেখানে সটান মমতার উপর লাঠিসোটা নিয়ে চড়াও হয় কিছু দুষ্কৃতী। তাদের লাঠির ঘায়ে মাথা ফাটে তখনকার যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আহত হন আরও অনেকে। অভিযোগ ওঠে, হামলার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বালিগঞ্জ, মনোহরপুকুরের দাপুটে সিপিএম কর্মী লালু আলম।

দিনটা এখনও ছবির মতো মনে করতে পারেন লালু। আদতে হুগলির থানাকুলের বাসিন্দা লালু অল্প বয়সেই থিতু কলকাতায়। দাদা বাদশা আলম তখন দক্ষিণ কলকাতায় সিপিএমের দাপুটে নেতা। লালু নিজেও লোকাল কমিটির সদস্য। ফোনে লালু বলেন, ‘‘সে দিন আমি হাজরা মোড়ের ধারে কাছেও ছিলাম না। দুপুরে গন্ডগোলের কথা শুনেছিলাম। রাত তখন ১টা। হঠাৎ বাড়িতে পুলিশ।’’ এর পর আড়াই মাস জেলে। আর তখন থেকেই পরের ২৯ বছর প্রতিটা তারিখে আদালতে হাজিরা দিয়ে গিয়েছেন লালু।

এর মাঝে বদলে গিয়েছে অনেক কিছু। সে দিনের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। সিপিএমের ‘সম্পদ’ লালু আলম কংগ্রেস এবং পরে তৃণমূল কংগ্রেসের ভাষায় কুখ্যাত সমাজবিরোধী। লালুর কথায়, ‘‘সিপিএম আমাকে বেইমান, তৃণমূলের দালালের তকমা দিল।” বদলে গিয়েছেন মামলার একের পর এক বিচারক এবং সরকারি আইনজীবী।

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৯। সে দিনের ২২ বছরের তরুণ লালু আজ ৫২ বছরের প্রৌঢ়। বেকসুর খালাস হয়ে আলিপুর আদালত চত্বরে তাঁর প্রশ্ন, ‘‘এই বিচারটা তো আমি আরও অনেক বছর আগেও পেতে পারতাম। তা হলে তো আমার জীবনের ৩০টা বছর নষ্ট হত না।”

আরও পডু়ন: নিশানা শুধুমাত্র মমতা, অনৈক্য সামলান: বঙ্গ বিজেপিকে হুঁশিয়ারি শাহের

কিন্তু কেন এত দেরি? সেই ১৯৯০ সাল থেকেই লালুর আইনজীবী গণেশ মাইতি। তিনি বলেন, ‘‘১৯৯৪ সালে মামলার চার্জ গঠন হয়। সরকারের তরফে প্রথম এবং মূল সাক্ষী ছিলেন অভিযোগকারিণী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে। তিনি সরকারের সাক্ষী হিসাবে এসে লালুকে চিহ্নিত করেন। কিন্তু অভিযুক্তের আইনজীবী হিসাবে আমরা তাঁকে আর জেরা করার সুযোগ পাইনি।” তিনি অভিযোগ করেন, একের পর এক তারিখ দেওয়া হয়েছে। তার পরেও তিনি আদালতে আসেননি। এর পর মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর তাঁর নিরাপত্তার কারণে আদালত ভিডিয়ো কনফারেন্সের মাধ্যমে তাঁর সাক্ষ্য গ্রহণ এবং জেরার প্রস্তাব দেয়। গণেশবাবুর কথায়, ‘‘আমরা সেই প্রস্তাবেও রাজি ছিলাম। কিন্তু ভিডিয়ো কনফারেন্সেও তিনি সময় দিতে পারেননি।” লালুর আইনজীবীর ইঙ্গিত, সরকার পক্ষ থেকে শুরু করে অভিযোগকারিণী— কেউই এই মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যাপারে আন্তরিক ছিলেন না। গণেশের প্রশ্ন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়াও তো আরও ৩৬ জন সাক্ষী ছিলেন। তাঁদের সাক্ষ্যও কেন নিল না সরকার পক্ষ?”

পাল্টা যুক্তি রয়েছে সরকারি আইনজীবীর কাছেও। রাধাকান্ত মুখোপাধ্যায় সরকারি আইনজীবী। তিনি বলেন, ‘‘ওই মামলা হয়েছিল বাম জমানায়। সবটাই ছিল গট আপ। সরকারি আইনজীবী এবং অভিযুক্তের আইনজীবী মিলে আইনের মারপ্যাঁচে পিছিয়ে দিয়েছেন মামলা। মাঝখানে প্রায় ন’বছর মামলা পড়েছিল হাইকোর্টে।”

আরও পড়ুন: এনআরসি নিয়ে পথে মমতা, ‘২ কোটি কেন, ২ জনের গায়ে হাত দিন’, চ্যালেঞ্জ কেন্দ্রকে

লালু কিন্তু বামেদেরও ছাড় দিচ্ছেন না। তিনি বলেন, ‘‘সিপিএমের দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বের শিকার আমি। জেল থেকে বেরনোর পর ১৯৯৩ সালে আমাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। বারে বারে আমার উপর হামলা চালানো হয়। আমার দোকানে বার বার সিপিএম হামলা চালিয়ে রুজিরুটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।” তবে তাঁর আক্ষেপ, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তো ক্ষমতায় এসেছেন আট বছর হয়ে গেল। তা হলে তিনি কেন নিষ্পত্তি করেননি?” সরকারি আইনজীবীর অকপট স্বীকারোক্তি, অনেক বছর মামলাটাই ওঠেনি আদালতে। তা হলে সরকারি আইনজীবী কেন সেই মামলা তোলার আবেদন করেননি? রাধাকান্তবাবু বলেন, ‘‘আমাদের উপর সে রকম কোনও নির্দেশ ছিল না।” ফলে আদালতের রেকর্ড ঘরের অন্ধকারেই থেকে গিয়েছে লালুর মামলা।

অথচ এই শহরেই একের পর এক উদাহরণ আছে যেখানে মামলার নিস্পত্তি হয়েছে পাঁচ দিনে। এ বছরেরই জুলাই মাসে উল্টোডাঙা থানা এলাকায় এক নাবালিকার যৌন হেনস্থার ঘটনায় এফআইআর হওয়ার পাঁচ দিনের মাথায় অভিযুক্তের যাবজ্জীবনের নির্দেশ দেন শিয়ালদহ আদালতের বিচারক। এটা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত কয়েক বছরে কলকাতা শহরের একাধিক আদালতে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসে মামলার নিষ্পত্তি হওয়ার ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে।

তা হলে লালুর হল না কেন? জবাব দিতে গিয়ে সরকার পক্ষ এবং অভিযুক্তের আইনজীবী একে অপরকে দোষারোপ করেছেন। সরকার পক্ষের দাবি, ‘‘প্রশাসন বরং অনেক মানবিক এবং বাস্তব বোধসম্পন্ন। ইতিমধ্যে মামলার অনেক প্রধান সাক্ষী মারা গিয়েছেন। তাই আমরাই মামলা শেষ করার অনুরোধ করি আদালতকে।” রাধাকান্তবাবু বলেন, ‘‘আইনে একটা প্রবাদ আছে, জাস্টিস ডিলেড, জাস্টিস ডিনায়েড। এই মামলার আর কোনও ভবিষ্যত ছিল না।”

কিন্তু প্রশাসন একই যুক্তিতে তো আরও আগে মানবিক হতে পারত! লালুর প্রশ্ন, ‘‘তা হলে বিচারপ্রক্রিয়ার এই দেরিতে বিচার কে পেলেন না, মমতা নাকি আমি? ২৯ বছর ধরে সমাজ বিরোধীর তকমা বয়ে কে বেড়ালো? আমার জীবন থেকে তো ২৯ বছর হারিয়ে গেল!’’