আতঙ্ক নয়। সঙ্কটও নয়। সব মিলিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ক্রমশ সেই উদ্বেগ ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। তবে সমস্যা যে একেবারেই নেই তা নয়। বাণিজ্যিক গ্যাসের জোগানের প্রতুলতা নিয়ে সমস্যা রয়েছে। মানছেন কর্তৃপক্ষ। আসলে পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের প্রভাব পড়েছে এ দেশের তেল, রান্নার গ্যাসের ভান্ডারে। তবে যত না টান পড়েছে, তার থেকে বেশি উদ্বেগ গ্রাস করছে সাধারণ মানুষকে।
অভিযোগ, প্রয়োজন না-থাকলেও গ্যাস বুক করতে শুরু করে দিয়েছেন গ্রাহকদের একটা বড় অংশ। না-পেলে পরিবেশকের কার্যালয়ে গিয়ে ‘হত্যে’ দিচ্ছেন। রেস্তরাঁ, হোটেল মালিকদের বিরুদ্ধেও সে রকমই অভিযোগ। তবে রেস্তরাঁ, হোটেলের মালিকদের বড় অংশ এই অভিযোগ মানছেন না। তাঁরা বলছেন, আগের থেকে দেড় গুণ বেশি দামে গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। কলকাতার ‘খাদ্য সরণি’ ডেকার্স লেনের প্রায় সব দোকানেই কাটছাঁট হয়েছে মেনুতে। কয়েকটি জেলায় বন্ধ হয়েছে বেশ কিছু বিরিয়ানির দোকান। কালোবাজারি হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে পুলিশ-প্রশাসন সে কথা মানছে না। তারা স্পষ্টই জানিয়েছে, কড়া নজরদারি রয়েছে। অভিযোগ পেলেই পদক্ষেপ করা হচ্ছে। কলকাতার একাধিক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও জানিয়েছেন, রোগীদের রান্নায় এখনও পর্যন্ত কোনও সমস্যায় তাঁদের পড়তে হয়নি। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে। মিড-ডে মিলে কাটছাঁটের অভিযোগও মানেননি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের ‘কিচেন’
কলকাতার হাসপাতালগুলিতে ভর্তি রোগী এবং তাঁদের পরিবারের একাংশের মনে উদ্বেগ, বর্তমান পরিস্থিতিতে কি টান পড়তে পারে সেখানকার হেঁশেলে? অনেক রোগীর বাড়িই হাসপাতাল থেকে অনেক দূরে। কেউ এসেছেন ভিন্জেলা থেকে। তাই তাঁদের পরিবারের পক্ষে বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে এসে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে রোগী এবং পরিবারের উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়েছেন কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ, আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ, চিত্তরঞ্জন ক্যানসার হাসপাতাল, বিসি রায় শিশু হাসপাতালে খাবার জোগানের দায়িত্বে থাকা সংস্থার ম্যানেজার তরুণ দে। তিনি জানান, এখনও কোনও হাসপাতালের ‘সেন্ট্রাল কিচেনে’ গ্যাসের সমস্যা হয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, গ্যাস সরবরাহকারী সংস্থার সঙ্গে বৈঠকও করা হয়েছে। তাতে সরবরাহকারী সংস্থা জানিয়েছে, জরুরি পরিষেবার ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা হবে না। কারও কোনও অসুবিধা হলে কর্তৃপক্ষকে জানাতে বলা হয়েছে।
এসএসকেএম হাসপাতালের ‘সেন্ট্রাল কিচেনের’ সুপারভাইজ়ার প্রেমাংশু ভুঁইয়া জানান, ওই হাসপাতালে রোগীদের খাবার তৈরির জন্য প্রতি দিন গড়ে ছয় থেকে সাতটি সিলিন্ডার লাগে। প্রতি বেলায় ২,২০০ থেকে ২,৩০০ রোগীর জন্য রান্না হয়। এক দিন অন্তর বা সিলিন্ডার খালি হলে সংস্থা সরবরাহ করে যায়। এখনও তেমনই চলছে। মেডিক্যাল কলেজের কিচেন সুপারভাইজ়ার ইন্দ্রজিৎ মোহান্ত জানান, প্রতি দিন গড়ে ১,৫০০ রোগীর রান্না হয়। তাঁদের খাবার তৈরির জন্য গড়ে প্রতি দিন পাঁচটি সিলিন্ডারের প্রয়োজন হয়। এখন ৮ থেকে ১০টি সিলিন্ডার তাঁদের হাতে রয়েছে। এখনও রান্না করতে কোনও অসুবিধা হয়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রান্নাবান্নার খোঁজ নিয়েছেন এবং হাসপাতাল সুপার বৈঠক করেছেন। কোচবিহার জেলার এমজেএম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সুপার সৌরদীপ জানা বলেন, ‘‘মঙ্গলবারই জেলাশাসককে চিঠি দিয়েছি, যাতে হাসপাতালের রান্নাঘরে গ্যাসের সঙ্কট না হয়। এখনও কোনও সমস্যা হচ্ছে না। প্রতি দিন এখানে প্রায় ৫০০ রোগীর রান্না হয়।’’ যদিও হাসপাতালে খাবার সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে যে সংস্থা, তার সুপারভাইজ়ারের দাবি, বেশি দামে ‘কালোবাজার’ থেকে গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এই নিয়ে যদিও সুপার কোনও মন্তব্য করেননি। আসানসোল জেলা হাসপাতালের রান্নাঘরের কর্মী মন্টু দাস ও রাজেশ প্রসাদ জানান, বেশি দাম দিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার কিনে রান্না চালানো হচ্ছে। তাঁদের কথায়, “সংগ্রহে প্রায় ২০টি গ্যাস সিলিন্ডার রাখা হয়েছে। কিন্তু এ ভাবে অতিরিক্ত দাম দিয়ে গ্যাস কিনে দীর্ঘ দিন রান্না চালানো সম্ভব নয়।’’
ডেবরা সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালের রান্নার দায়িত্বে রয়েছে যে সংস্থা, তাদের সূত্রে জানা গিয়েছে, ভাঁড়ারে যত সিলিন্ডার মজুত ছিল, তাতে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রান্না চলেছে। শুক্রবার থেকে কাঠের জ্বালানিতেই ২০০ লোকের রান্না করা হবে। যদিও মেনুতে কোনও পরিবর্তন নেই। এই নিয়ে তারা আজ ডেবরা সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালের সুপারের সঙ্গে আলোচনায় বসবে বলে সংস্থা। মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে রোগীর চাপ রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ৭০০-৮০০ জনের রান্না হয় দু’বেলা। তা ছাড়া দুধ ও ডিমসেদ্ধ দেওয়া হয় জলখাবারে। রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার যা মজুত রয়েছে, তাতে দু’দিন চলে যাবে। কিন্তু তার পর কী হবে, তা নিয়েই চিন্তায় রয়েছেন রান্নার দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার। তিনি জানান, গ্যাসের সমস্যার বিষয়টি হাসপাতাল সুপারকে জানানো হয়েছে। তাঁরাও গ্যাস সরবরাহকারী ডিলারের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
জেলায় কালোবাজারির অভিযোগ!
রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় গ্যাস সিলিন্ডার বেশি দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন গ্রাহকদের একাংশ। হোটেল, রেস্তরাঁগুলির মালিকদেরও অভিযোগ, দেড় গুণ দামে তাঁরা গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হয়েছেন। এ ভাবে চললে খুব শীঘ্রই দোকানে ঝাঁপ ফেলতে হবে বলেও দাবি করেছেন তাঁরা। অটোচালকেরাও অভিযোগ করেছেন, বেশি দামে সিএনজি কিনতে হচ্ছে। ভাড়া বাড়ানোর দাবিও তুলেছেন তাঁরা। যদিও পুলিশ-প্রশাসন সেই অভিযোগ মানছে না। উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ পুলিশ জেলার সুপার বিদিশা কলিতা দাশগুপ্ত বলেন, ‘‘বুধবার গোপালনগরে একটা দোকান থেকে ১৮টা গ্যাস সিলিন্ডার উদ্ধার করা হয়। সেগুলি সব অটোর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছিল। মামলা রুজু হয়েছে। এক জনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘গ্যাসের কালোবাজারি যাতে না হয়, তার জন্য সর্ব ক্ষণ নজর রাখছি। সকলকে বলে রেখেছি, কোথাও কোনও রকমের কালোবাজারি নজরে এলে, তা যেন সঙ্গে সঙ্গে পুলিশকে জানানো হয়।’’
বাঁকুড়ায় এলপিজি দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইন। — নিজস্ব চিত্র।
দার্জিলিং জেলার পুলিশ সুপার প্রতীক্ষা ঝারখারিয়া বলেন, ‘‘এখনও পর্যন্ত কালোবাজারির অভিযোগ পাইনি। হোটেল, রেস্তরাঁয় বাণিজ্যিক গ্যাস সরবরাহ আপাতত বন্ধ রয়েছে। গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে মিড ডে মিল এবং পরিষেবামূলক ক্যান্টিনকে।’’ বারসতের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (জ়োনাল) দুর্বার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘আমরা নজরদারি চালাচ্ছি। এখনও পর্যন্ত কোনও কালোবাজারির খবর নেই।’’ একই কথা বলেছেন পূর্ব মেদিনীপুরের পুলিশ সুপার পারিজাত বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘‘এখনও পর্যন্ত তেমন কোনও খবর পাইনি (কালোবাজারি)। তবে কোথাও যাতে কালোবাজারি বা অকারণে মজুত না হয়, কড়া নজর রাখছি।’’ শিলিগুড়ি এনফোর্সমেন্ট বিভাগের আধিকারিক ফারুক মহম্মদ চৌধুরী বলেন, ‘‘গ্যাসের কালোবাজারি রুখতে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালানো হচ্ছে। ইতিমধ্যেই প্রধাননগরের একটি জায়গায় অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু সিলিন্ডার বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে৷ সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে।’’
গ্যাসের ‘আকাল’ ঘিরে জেলায় জেলায় তৎপরতাও শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বর্ধমান শহর-সহ জেলার মোট ২০টি জায়গায় গ্যাস ডিলারের কার্যালয় এবং গুদামে অভিযান চালায় জেলা এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ (ডিইবি)।
নদিয়াতেও বাণিজ্যিক গ্যাসের অভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে বেশ কিছু হোটেল। — নিজস্ব চিত্র।
মিড ডে মিল
বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজ্যের সরকারি এবং সরকার পোষিত স্কুলগুলিতে মিড ডে মিলেও কি টান পড়েছে? প্রশাসন বলছে, তেমন কোনও সমস্যা এখনও নেই। তবে বেশ কয়েকটি স্কুলের তরফে সমস্যার কথা জানানো হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা স্কুল পরিদর্শক সানি মিশ্র জানান, মিড ডে মিলে কোনও সমস্যা নেই। আগে যেমন দেওয়া হত, তেমনই খাবার দেওয়া হচ্ছে। নদিয়া জেলায় গ্রামীণ স্কুলগুলি বিকল্প জ্বালানি হিসেবে কাঠের উনুন তৈরি শুরু করেছে। ধুবুলিয়া শ্যামাপ্রসাদ ভট্টাচার্য বিদ্যানিকেতনের প্রধানশিক্ষক নুর মহম্মদ খান বলেন, ‘‘মজুত গ্যাসে বড়জোর শুক্রবার পর্যন্ত চলবে। ঝুঁকি না নিয়ে আমরা মাটির উনুন ও কাঠের জ্বালানি মজুত করছি।’’ একই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কৃষ্ণনগর হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষক উৎপল ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘‘শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কাঠের উনুনে রান্না ঝুঁকিপূর্ণ। তা ছাড়া দমকলের অনুমতি মেলে না। সোমবারের মধ্যে গ্যাস না-পেলে মিড ডে মিল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।’’ একই ছবি মুর্শিদাবাদেও। বহরমপুর ও ডোমকল মহকুমার বেশ কিছু স্কুলে সমস্যা তৈরি হয়েছে। মুর্শিদাবাদের একটি স্কুলের প্রধানশিক্ষক অনিরুদ্ধ সরকার বলেন, ‘‘বিকল্প জ্বালানির সংস্থান না করলে আগামী সপ্তাহ থেকে খিচুড়ি দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়বে। আমরা ব্লক প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলছি।’’ বেলডাঙা এলাকার একটি স্কুলের কর্তৃপক্ষ জানাচ্ছেন, গ্রামীণ এলাকায় কাঠ বা ঘুঁটে পাওয়া গেলেও শহরাঞ্চলে সেই সুযোগ নেই। অন্য দিকে, মিড ডে মিলে বৃহস্পতিবার থেকে খিচুড়ি দেওয়া বাধ্যতামূলক এমন কোনও নির্দেশিকা বাঁকুড়া জেলায় এখনও এসে পৌঁছোয়নি। বাঁকুড়া জেলা স্কুল পরিদর্শকের দফতর সূত্রেই এ কথা জানানো হয়েছে। জেলার বেশ কয়েকটি স্কুলের শিক্ষকেরা জানান, সরকার নির্ধারিত সূচি মেনেই বৃহস্পতিবার মিডডে মিল রান্না করা হয়েছে স্কুলগুলিতে। আগামী দিনে তেমন সরকারি নির্দেশিকা মিললে সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ করা হবে। হাওড়ার দু’টি প্রাইমারি স্কুলে বৃহস্পতিবার মিড ডে মিল রান্না হয়নি। শিবপুর হিন্দু গার্লস প্রাইমারি স্কুল ও ডোমজুড় মহিষনালা প্রাইমারি স্কুলে রান্না হয়নি। শুক্রবার আরও অনেক প্রাথমিক স্কুলে রান্না না-হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, সেখানে গ্যাসের মজুত নেই। অভিযোগ, সরবরাহকারী সংস্থা গ্যাস দিচ্ছে না। বড় প্রাথমিক স্কুল যেখানে পড়ুয়া সংখ্যা অনেক, সেখানে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে।
কলকাতার ডেকার্স লেনের পরিস্থিতি
কলকাতার ‘খাদ্য সরণি’ বলে পরিচিত ডেকার্স লেনেও পড়েছে জ্বালানি উদ্বেগের ছায়া। চিত্তবাবুর দোকানের ম্যানেজার সন্দীপ রায় বলেন, ‘‘হাতেপায়ে ধরে অনেক দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। খাবার কমিয়ে দিয়েছি। পোলাও-চিকেন কষা, ভেজ চপ, ভেজ স্টু, চিকেন স্টু বন্ধ। খাবারের দামও বাড়াতে বাধ্য হতে হবে।’’ তাঁর কথায়, ‘‘একটা সিলিন্ডার আগে ২ হাজার টাকা দিয়ে কিনতাম। বুধবার তা ৩ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছি। বৃহস্পতিবার বলছে ৩,৮০০ টাকা!’’ ডেকার্স লেনেরই রমেশ বাবুর দোকানের বাপ্পা সাহা বলেন, ‘‘আগে একটা সিলিন্ডারের দাম পড়ত ১,৭৮০ টাকা। শেষ কয়েক দিন পাচ্ছিই না। যা সংগ্রহে রয়েছে, তা দিয়ে দু’দিন চলবে। কয়লার উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। চাউমিন, রাইস তৈরি বন্ধ করছি। এ বার শুধু স্টু, ঘুগনি হবে।’’ ডেকার্স লেনে চাউমিনের দোকান রয়েছে সায়ন মণ্ডলের। তিনি জানান, গ্যাসের অভাবে তিন দিন দোকান বন্ধ রেখেছিলেন। এখন ৪ হাজার টাকা দিয়ে কালোবাজারে গ্যাস কিনে দোকান খুলেছেন। ডেকার্স লেনে ভাতের হোটেল রয়েছে কালীপদ রায়ের। তিনি জানান, ৪ হাজার টাকা দিয়ে গ্যাস না-কিনে কয়লার উনুন ব্যবহার করছেন। রান্নার পরিমাণ এবং পদ কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
কলকাতার ডেকার্স লেনে চিত্তদার দোকানে মেনুতে কাটছাঁট। বেড়েছে দামও। — নিজস্ব চিত্র।
মিস্ড কল বিভ্রান্তি
এমনিতে নির্দিষ্ট নম্বরে মিস্ড কল দিলেই গ্যাস বুকিং হয়। হুগলির চন্দননগর এবং ভদ্রেশ্বরে গ্রাহকদের বড় অংশের দাবি, নির্দিষ্ট নম্বরে মিস্ড কল করলেও ডেলিভারি অথেন্টিকেশন কোড (ডিএসি) দিয়ে বুকিংয়ের মেসেজ আসছে না। উৎকণ্ঠা নিয়ে গ্যাসের অফিসে ভিড় জমাচ্ছেন তাঁরা। গ্রাহকদের একাংশ জানিয়েছেন, সময়ে রান্নার গ্যাস না-পেয়ে অনেকে পাঁচ কেজির ছোট সিলিন্ডার নিয়ে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। কিন্তু সেই সিলিন্ডারের দাম অনেক বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটর গৌরী সরকার বলেন, ‘‘গ্যাসের গাড়ি আসছে। গ্রাহকেরা গ্যাস পাচ্ছেন। সার্ভার ডাউন থাকায় মাঝেমধ্যে সিস্টেমে কিছু দেখা যাচ্ছে না। গ্যাসের সরবরাহ ঠিক রয়েছে। এখনও সেই অর্থে কোনও অসুবিধা নেই। গ্রাহকেরা যদি সহযোগিতা করেন আমাদেরও সুবিধা হয়।’’ দক্ষিণ ২৪ পরগনার মহেশতলার বাসিন্দা মাজেদ খান জানান, আগের গ্যাস পাওয়ার ২৫ দিন পরে, গত সোমবার মিস্ড কল দিয়ে গ্যাস বুক করেছিলেন। অনলাইনে টাকাও দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনও গ্যাস পাননি। তাঁর অভিযোগ, ওই এলাকার গ্যাস ডিসট্রিবিউটর ফোন ধরছেন না। দোকানও বন্ধ করে দিয়েছেন।
আরও পড়ুন:
সঙ্কটে বিরিয়ানি, মিহিদানা
হুগলির চুঁচুড়া, শ্রীরামপুরের প্রায় প্রত্যেক গলির মোড়ে রয়েছে বিরিয়ানির দোকান। বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ, গ্যাস উদ্বেগে ছবিটা কিছু বদলেছে। লাল কাপড় জড়ানো বিরিয়ানির হাঁড়ি এখন এলাকায় কম দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। চুঁচুড়া খাদিনামোড়ের বিরিয়ানির দোকানের মালিক মহম্মদ তাহির জানান, গত কয়েক দিন ধরে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। যতটুকু ছিল তা দিয়ে কাজ চালানো হয়েছে। শেষ একটি সিলিন্ডারে যেটুকু গ্যাস ছিল, তা দিয়ে বৃহস্পতিবার বিরিয়ানি বসানো হয়েছে। গ্যাস যদি রান্নার মাঝে শেষ হয়ে যায়, তা হলে সমস্যায় পড়তে হবে। এমনিতেই শুক্রবার থেকে আর দোকান খোলা যাবে না। বিপাকে পড়েছেন বর্ধমানের মিহিদানা, সীতাভোগ ব্যবসায়ীরাও। সীতাভোগ ও মিহিদানা ট্রেডার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সহকারী সম্পাদক দেবাদিত্য চক্রবর্তী জানান, তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা না-হলে আগামী দিনে মিষ্টি তৈরি কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কারণ, এই ধরনের মিহিদানা, সীতাভোগের মতো মিষ্টি, রসগোল্লা তৈরির জন্য প্রচুর পরিমাণে জ্বালানির প্রয়োজন হয়। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, আপাতত শুধু সন্দেশ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। তবে তা-ও বেশি দিন করা যাবে না।
দুশ্চিন্তায় পরিবহণ নিগম
উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগম (এনবিএসটিসি)-এর চেয়ারম্যান পার্থপ্রতিম রায় জানান, বাস চালানোর ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত কোনও সমস্যায় পড়তে হয়নি, তবে সিএনজিচালিত পরিষেবা নিয়ে চিন্তিত নিগম কর্তৃপক্ষ। উত্তরবঙ্গের আট জেলায় চলে নিগমের বাস। ডিজ়েলচালিত বাসের পাশাপাশি, সিএনজিচালিত বাসও চলে তাঁদের। সেই বাসের সংখ্যা ৩০। তাঁদের একাংশের প্রশ্ন, আগামী দিনে জ্বালানি গ্যাসের জোগান কি কমানো হতে পারে? যদি সিএনজির জ্বালানির ঘাটতি হয়, তা হলে এই পরিষেবা বিঘ্নিত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন নিগম কর্তৃপক্ষ। তবে ডিজ়েলচালিত বাসগুলির ক্ষেত্রে এখনই কোনও অশনিসঙ্কেত দেখছেন না আধিকারিকেরা। ইতিমধ্যেই ইন্ডিয়ান অয়েল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাঁরা আশ্বস্ত করেছেন, তাঁদের কাছে পর্যাপ্ত তেল রয়েছে। ডিজ়েল পেতে কোনও রকম অসুবিধা হবে না।। এখনও পর্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই বাস চলাচল করছে বলে তিনি জানান। নিগম সূত্রে খবর, ৩০টি সিএনজি বাসের প্রতিটি দূরপাল্লার যাতায়াত করে। এর মধ্যে মালদহ, কোচবিহার, রায়গঞ্জ পর্যন্ত চলাচল করা বাস রয়েছে। শিলিগুড়ি এবং রায়গঞ্জ এই দুই ডিভিশনের সবথেকে বেশি সিএনজি বাস চলাচল করে।
মন্দিরেও প্রভাব!
দিঘার জগন্নাথ মন্দিরে ভোগ রাঁধার জন্য গ্যাস মজুত রয়েছে। তবে ভক্তদের যে ভোগ বিতরণ করা হয়, তা অনেকটা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এত দিন দিনে তিন হাজার ভক্তের জন্য ভোগ রাঁধা হত। বৃহস্পতিবার থেকে তা ৭৫০ জনের পরিমাণে নামিয়ে আনা হয়েছে। এ কথা জানিয়েছেন ইসকনের তরফে রাধারমণ দাস। তিনি এ-ও জানিয়েছেন, কলকাতার ইসকন মন্দিরে আগামী দু’দিনের গ্যাস মজুত রয়েছে। তার পরে কী হবে বলা মুশকিল।
গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা মন্দিরে ভোগ রান্নার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক না-হওয়া পর্যন্ত মন্দিরে ভোগ রান্নার আয়োজন বন্ধ করা হচ্ছে। বর্ধমান শহরের এই সর্বমঙ্গলা মন্দির শক্তিপীঠ। ১৭০২ খ্রিস্টাব্দে রাজা কীর্তিচাঁদ নির্মিত এই মন্দিরটি অবিভক্ত বাংলার প্রথম নবরত্ন মন্দির। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সঞ্জয় ঘোষ বলেন, ‘‘রোজ মন্দিরে ৪০০ জনের ভোগ রান্না হয়। তাতে গড়ে প্রতি দিন একটি করে গ্যাস সিলিন্ডার খরচ হয়।’’ তাতে টান পড়ায় শুক্রবার থেকে বন্ধ হল ভোগ রান্না।
বর্ধমানের সর্বমঙ্গলা মন্দিরে রান্নাঘরের সামনে খালি গ্যাসের সিলিন্ডার। — নিজস্ব চিত্র।
বেলুড় মঠে প্রতি দিন অসংখ্য দর্শনার্থী ও ভক্তকে ভোগ খাওয়ানো হয়। এই রীতি কোনওমতেই বন্ধ হচ্ছে না৷ এলপিজি গ্যাস ছাড়াও মঠের নিজস্ব পদ্ধতিতে তৈরি করা বায়োগ্যাস বা সোলার সিস্টেমে বৈদ্যুতিক পদ্ধতিতে নিত্য দিনের রান্নার অনেকটাই প্রয়োজন মিটছে। এই মুহূর্তে বেলুড় মঠে যে পরিমাণ জ্বালানি মজুত আছে তাতে আগামী বেশ কিছু দিন সঙ্কট মোকাবিলা করা সম্ভব বলে মনে করছে তারা।