কোথাও গুহামুখ সঙ্কীর্ণ, সোজা হয়ে হাঁটা যায় না, কোথাও আবার নামতে হয় চেন ধরে খানিক পাতালপ্রবেশের মতো। কখনও নাকে আসে চামসে গন্ধ। আলো-আঁধারি পেরিয়ে সেই গুহাপথ পার হতে পারলেই বিজয়ের আনন্দ। ভারতের নানা প্রান্তে রয়েছে এমনই সব গুহা। কোনওটি ভুবনভোলানো চিত্রসম্পদে পূর্ণ, কোনওটি ভূগোল বইয়ে পড়া স্ট্যালাকটাইট এবং স্ট্যালাগমাইটের অপূর্ব রূপ। ভ্রমণসূচিতে জুড়তে পারেন প্রকৃতির এমন সব সম্পদ। সেখানে আছে রোমাঞ্চ, আছে বিস্ময়!
বোরা গুহা। ছবি: সংগৃহীত।
বোরা গুহা
বোরা গুহার অন্দরে। ছবি:সংগৃহীত।
অন্ধপ্রদেশের অনন্তগিরিতে রয়েছে এক সুবিশাল গুহা, যার কিছুটা জানা, কিছুটা অজানা। গাইডেরা বলেন, গুহার কিছু কিছু শুঁড়িপথ যে কোথায় মিশেছে, কেউ জানেন না। বিশাল গুহা যেন বিস্ময়। এই গুহায় নানা রকম পাথুরে রূপের সৃষ্টি হয়েছে। চুনাপাথর এবং জলের বিক্রিয়ায় তৈরি হয় ক্যালশিয়াম কার্বোনেট। চুনাপাথরের এই গুহায় জলের বিক্রিয়ার ফলে জমাট বাঁধা ক্যালশিয়াম কার্বনেট নানা আকৃতির সৃষ্টি করেছে। ক্যালশিয়াম কার্বোনেট জমে যদি গুহার উপর থেকে ঝুলতে থাকে, তাকে বলা হয় স্ট্যালাকটাইট। গুহার ছাদ থেকে জল চুঁইয়ে পড়ে মেঝে থেকে স্তম্ভ তৈরি হলে তাকে বলা হয় স্ট্যালাগমাইট। বিশাল গুহার ছাদের অনেকটা অংশ খোলা। জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রের তালিকায় ঠাঁই করে নিয়েছে বোরা গুহা।
কী ভাবে যাবেন?
হাওড়া বা শিয়ালদহ স্টেশন থেকে বিশাখাপত্তনম যাওয়ার জন্য করমণ্ডল এক্সপ্রেস, যশবন্তপুর এক্সপ্রেস-সহ একাধিক ট্রেন রয়েছে। কলকাতা থেকে সড়কপথে বা বিমানেও বিশাখাপত্তনম পৌঁছোনো যায়। বিশাখাপত্তনম স্টেশন থেকে বোরা গুহা ৯০ কিলোমিটার। বিশাখাপত্তনম স্টেশন থেকে কিরণ্ডুল প্যাসেঞ্জার রয়েছে। এই ট্রেনে ভিস্তা ডোম কোচও হয়েছে। রেলপথে পড়বে একাধিক টানেল। বিশাখাপত্তনম থেকে সরাসরি গাড়িতেও যাওয়া যায়।
কোথায় থাকবেন?
বোরা গুহার আশপাশে একাধিক হোটেল, রিসর্ট রয়েছে। বোরা গুহা ঘুরে আরাকু ভ্যালিতেও চলে যেতে পারেন।
পাতাল ভুবনেশ্বর
ঘুরে আসতে পারেন পাতাল ভুবনেশ্বর থেকেও। ছবি:সংগৃহীত।
উত্তরাখণ্ডের পিথোরাগড়ে গাঙ্গোলিহাটে স্ট্যালাকটাইট এবং স্ট্যালাগমাইটের আর একটি বৃহৎ গুহা রয়েছে, পাতাল ভুবনেশ্বর। জল এবং চুনাপাথরের বিক্রিয়ায় যে ধরনের আকৃতির জন্ম হয়েছে, সেগুলিকে দেবদেবী কল্পনা করে পুজো করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। চুনাপাথরের বিভিন্ন রূপকে ত্রেত্রিশ কোটি দেবদেবী রূপে কল্পনা করা হয়। পাতাল ভুবনেশ্বরে প্রবেশের পথটি অন্ধকার, সঙ্কীর্ণ। লম্বা চেন নেমে গিয়েছে নীচে। তা ধরেই পাতালের পথে যেতে হয়। বিশাল এই গুহার নানা স্থানে ক্যালশিয়াম কার্বোনেটে জমাট বেঁধে নানা রকম আকৃতি তৈরি করেছে।
কী ভাবে যাবেন?
নৈনিতাল, মুন্সিয়ারি বা উত্তরাখণ্ডের কোনও একটি বড় শহর বা রেল স্টেশনে পৌঁছোতে হবে। পাতাল ভুবনেশ্বরের সবচেয়ে কাছের স্টেশন হলদোয়ানি বা কাঠগুদাম। হাওড়া থেকে লালকুঁয়া বা বাঘ এক্সপ্রেস যায়। পিথোরাগড় পর্যন্ত গাড়িতে পৌঁছে সেখানে থেকে পাতাল ভুবনেশ্বর ঘোরা যায়। ভ্রমণতালিকায় জুড়ে নিন মুন্সিয়ারি, আলমোড়া, কৌশানিও।
কোথায় থাকবেন?
পাতাল ভুবনেশ্বর, পিথোরাগড়, আলমোড়া সর্বত্রই একাধিক থাকার জায়গা আছে।
আরও পড়ুন:
ভীমবেটকা
ভীমবেটকায় রয়েছে প্রস্তরযুগের গুহাচিত্র। ছবি:সংগৃহীত।
মধ্যপ্রদেশের রাইসিনা জেলায় ভীমবেটকা হল সভ্যতার আঁতুড়ঘর। পাহাড়ঘেরা এই বনাঞ্চলে এখনও পর্যন্ত প্রায় আড়াইশোটি গুহা বা পাথরের খাঁজে থাকার মতো জায়গা পাওয়া গিয়েছে। দু’দিকে পাহাড়, গাছ, পাথুরে রাস্তা দিয়ে বেশ খানিকটা হেঁটে গেলে চোখে পড়বে গুহা। এখানে রয়েছে প্রস্তুরযুগের গুহাচিত্র। ২০০৩ সালে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তকমা পাওয়া ভীমবেটকা তথাকথিত সভ্যতার সূচনার আগে এক আদিম সময়ে নিয়ে যায়। গুহাচিত্রের পুরনো ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে মূলত বিশালকায় জন্তু। গন্ডার, বাইসন ইত্যাদি। বেশির ভাগই লালচে বা সবজেটে রঙের পাথর ঘষে আঁকা। আবার পরবর্তী সময়ের (মধ্যপ্রস্তর যুগ) ছবিতে দল বেঁধে শিকারে যাওয়া মানুষ বা গৃহস্থালির ছবি। বোঝা যায়, দল বাঁধাটা মানুষের সহজাত। বেশ কিছু অস্ত্রের ছবিও দেখা যায়।
কী ভাবে যাবেন?
ট্রেনে কিংবা উড়ানে ভোপাল পৌঁছোতে হবে। সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে ভীমবেটকা।
কোথায় থাকবেন?
ভোপালে থাকার একাধিক থাকার জায়গা রয়েছে। নানা মানের রিসর্ট, হোটেল আছে।
বাদামি গুহা
বাদামি গুহা। ছবি: সংগৃহীত।
কর্নাটকের বাগলকোটের বাদামি গুহায় রয়েছে হিন্দু এবং জৈন মন্দির। চালুক্য স্থাপত্যের নিদর্শন পাথর কেটে তৈরি হওয়া মন্দিরগুলি। বিশাল পাহাড় কেটে তৈরি হয়েছে মন্দির। এই স্থানের সঙ্গে কিছুটা হলেও ওড়িশার উদয়িগিরি এবং খণ্ডগিরির সাদৃশ্য মিলতে পারে। বেঙ্গালুরু থেকে প্রায় ৪৫০ কিলোমিটার দূরে বাদামি গুহা। গুহার মধ্যে পাথর কেটে খোদাই করা হয়েছে অপূর্ব সব ভাস্কর্য। রয়েছে পাথরের মূর্তিও। মূলত চারটি গুহা আছে এখানে। গুহায় রয়েছে শিবমূর্তি, যা নটরাজ রূপে পাথরে খোদিত। অন্যান্য গুহায় রয়েছে বিষ্ণুর নানা রকম অবতারের খোদাই করা রূপ।
কী ভাবে যাবেন?
হাওড়া থেকে ছাড়ে অমরাবতী এক্সপ্রেস। সেই ট্রেন যায় গাদাগ জংশন। সেখান থেকে বাদামি গুহার দূরত্ব প্রায় ৯০ কিলোমিটার।
কোথায় থাকবেন?
বাদামি গুহা থেকে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে থাকার একাধিক জায়গা রয়েছে। নানা মানের রিসর্ট, হোটেল আছে।
মাউসমাই গুহা
রোমাঞ্চের শখ থাকলে চলুন মাউসমাই গুহা অভিযানে। ছবি:সংগৃহীত।
মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে রয়েছে চুনাপাথরের প্রাকৃতিক গুহা। নাম মাউসমাই। প্রবেশপথটি বেশ চওড়া হলেও, স্থানে স্থানে তা বেশ সঙ্কীর্ণ। কোথাও মই বেয়ে এগোতে হয়, কোথাও হামাগুড়ি দিতে হয়। বিশেষ করে যাঁরা রোমাঞ্চ পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য এই গুহার এক প্রান্ত থেকে শেষ প্রান্ত পর্যন্ত যাত্রা এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে থাকতে পারে।
কী ভাবে যাবেন?
মেঘালয়ের শিলং বা চেরাপুঞ্জি থেকে এই গুহা যাওয়া যায়। বিমান, ট্রেনে গুয়াহাটি পৌঁছে গাড়িতে যেতে পারেন। বিমানে শিলং পৌঁছে বাকি পথ গাড়িতে যাওয়া যায়।
কোথায় থাকবেন?
শিলং, চেরাপুঞ্জিতে থাকার একাধিক স্থান রয়েছে। নানা মানের হোটেলও রয়েছে।