Advertisement
E-Paper

এশিয়ার ‘সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন’ গ্রামে ঘোরা যায় না রবিবার, কেন এমন অদ্ভুত নিয়ম এখানকার?

পর্যটকদের জন্য রবিবার দরজা বন্ধ থাকে এই গ্রামের। এশিয়ার ‘পরিচ্ছন্নতম গ্রাম’ মাওলিননংয়ে কেন এমন নিয়ম চালু হয়েছে?

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ ১৭:৪১
এশিয়ার পরিচ্ছন্নতম গ্রামের শিরোপা পাওয়া মাওলিননঙে কেন রবিবার পর্যটক প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়েছে?

এশিয়ার পরিচ্ছন্নতম গ্রামের শিরোপা পাওয়া মাওলিননঙে কেন রবিবার পর্যটক প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়েছে? ছবি: ঐন্দ্রিলা বসু সিংহ।

ছুটির দিন মানেই বেরিয়ে পড়া। শনি-রবিবার মানেই পর্যটনস্থলগুলিতে উপচে পড়া ভিড়। কিন্তু সেই ছবি খানিক ভিন্ন এশিয়ার 'পরিচ্ছন্নতম গ্রাম'-এর শিরোপা পাওয়া মাওলিননঙে।

‘ক্লিনলিনেস ইজ গডলিনেস’ অর্থাৎ পরিচ্ছন্নতাই ঈশ্বরের কাছাকাছি পৌঁছে দিতে পারে, কথাটি বইয়ের পাতাতেই থেকে যায়। আমাদের দেশে তার বাস্তব প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না। তবে ব্যতিক্রম মেঘালয়ের মাওলিননং। যাকে এশিয়ার 'সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম' হিসেবে তকমা দিয়েছে 'ডিসকভার ইন্ডিয়া' নামের একটি পত্রিকা।

শিলং থেকে দূরত্ব ৯০ কিলোমিটার। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি যত্নে সাজানো। চালা বাড়িগুলির সামনে রয়েছে ফুলের বাগান। প্রবেশদরজা, সীমানাবেড়া— সবই সুন্দর লতানে ফুলগাছে মোড়া। প্রতিটি বাড়ির সামনে ও রাস্তায় বেতের তৈরি ডাস্টবিন রাখা আছে। এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রামের খেতাবটি ধরে রাখতে গ্রাম সমিতি ও গ্রামবাসীরা খুবই সচেষ্ট। শুধু পরিচ্ছন্নতা নয়, গ্রামের নিজস্ব সংস্কৃতি ধরে রাখার ব্যাপারেও তৎপর এখানকার বাসিন্দারা।

গ্রামের বেশির ভাগ মানুষই খাসি সম্প্রদায়ভুক্ত, খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী। গ্রামে স্কুল, চার্চ, সবই আছে। কমলালেবু, কাঁঠাল, আনারস, তেজপাতা, পান ও সুপুরি চাষ এবং ফুলঝাড়ু তৈরি এই গ্রামের মানুষদের প্রধান জীবিকা।

বর্জ্য ফেলার জন্য রাস্তার ধারেই রয়েছে বেতের ঝুড়ি। সব কিছুই প্রকৃতির সঙ্গে মানানসই।

বর্জ্য ফেলার জন্য রাস্তার ধারেই রয়েছে বেতের ঝুড়ি। সব কিছুই প্রকৃতির সঙ্গে মানানসই।

তবে গ্রাম সমিতি স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেখানে রবিবার পর্যটকদের প্রবেশ নিষেধ। যাঁরা এই গ্রামের হোম স্টে-তে অতিথি হিসেবে থাকবেন, তাঁদের কথা আলাদা। তবে যাঁরা পরিচ্ছন্ন শিরোপা পাওয়া গ্রাম দিনের বেলা এসে ঘুরে যেতে চান, তাঁদের জন্য এই নিয়ম।

মনে হতেই পারে, পর্যটনের প্রসারে এ তো ভুল পদক্ষেপ! কিন্তু গ্রামের মানুষের ভাবনা অন্য। রবিবার ছুটির দিন। সারা সপ্তাহের কাজকর্ম সেরে এই দিনটায় সকলেই পরিবার-পরিজনের সঙ্গে নিজের মতো করে কাটান। সেই ব্যক্তিজীবনের পরিসরে যাতে বহিরাগত অতিথিরা ঢুকে পড়তে না পারেন, সেই জন্যই এমন সিদ্ধান্ত। এই দিন গ্রামের খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা গির্জায় যান। রাস্তাঘাট থেকে গির্জা, সর্বত্র পর্যটকদের আনাগোনা, ভিডভাট্টায় যাতে গ্রামবাসীদের নিজস্ব জীবনযাত্রায় বাধা না তৈরি হয়, সেই কারণেই এমন ভাবনা বলে জানা যায়। নি

নির্জন দুপুরে জিরিয়ে নিতে পারেন মাওলিননংঙের রাস্তার পাশের বেঞ্চে।

নির্জন দুপুরে জিরিয়ে নিতে পারেন মাওলিননংঙের রাস্তার পাশের বেঞ্চে। ছবি:সংগৃহীত।

রবিবার ছুটির দিনে এমনিতেই পর্যটকদের আনাগোনা বেশি। তবে ছুটির দিন গ্রামবাসীরাও ছুটির দিনের মতো করেই যাতে কাটাতে পারেন, দোকানপাট বন্ধ রেখে নিজেদের মতো করে উপভোগ করতে পারেন, তাই পর্যটকদের নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

পর্যটকেরা কিসের খোঁজে আসেন?

শান্ত, সুন্দর একটি গ্রাম, পরিচ্ছন্নতা, গ্রামের সৌন্দর্য এবং নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার তৎপরতা বরবারই পর্যটকদের মুগ্ধ করে। মেঘালয়ের একটি প্রত্যন্ত গ্রাম শিখিয়ে দেয় অনেক কিছুই। এখানে খাসি সম্প্রদায়ের মানুষজনের ঘরবাড়ি রয়েছে। তাঁদের জীবনযাপন, গ্রামের সৌন্দর্য, এখানকার মানুষদের সংস্কৃতির খোঁজেই আসেন পর্যটকেরা। উল্লেখ্য, খাসিদের সমাজ মাতৃতান্ত্রিক। সন্তানেরা মায়ের উপাধি পান। কনিষ্ঠা কন্যা সম্পত্তির উত্তরাধিকারিণী হন। এই সমাজের নিয়মানুযায়ী পুরুষেরা শ্বশুরবাড়ি গিয়ে বাস করেন। মাওলিননঙে এই প্রথা আজও অটুট রয়েছে। পর্যটকেরা যদি এমন মাতৃতান্ত্রিক সমাজকে কাছ থেকে দেখতে চান, তাঁদের গন্তব্য হতেই পারে এই গ্রাম।

রবিবার পর্যটন বন্ধ রাখা কি যুক্তিযুক্ত?

পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি মানে আর্থ সামজিক পরিকাঠামোর উন্নয়ন। সেখানে এমন সিদ্ধান্ত? তবে অনেকেই মনে করছেন, এটি আসলে দায়িত্বপূর্ণ পর্যটন-ভাবনার উদাহরণ। পর্যটনের প্রসার যেমন জরুরি, তেমনই স্থানীয় সংস্কৃতিকে রক্ষা করা, গ্রামবাসীদের শান্তিপূর্ণ জীবন বা ব্যক্তিজীবন যাতে কোনও ভাবেই ব্যাহত না হয়, তা দেখাও জরুরি। কারণ, সংস্কৃতি, গ্রাম বাঁচলে তবেই পর্যটন।

দর্শনীয় স্থান

মাওলিননঙের অন্যতম দ্রষ্টব্য ‘স্কাই ভিউ পয়েন্ট’। প্রায় তিন তলা বাড়ির সমান উঁচুতে বাঁশ দিয়ে শক্ত করে বাঁধা মাচান। কয়েকটা বাঁশ জুড়ে তৈরি ঢাল বেয়ে বাঁশের রেলিং ধরে মাচানে উঠতে হয়। অনেকটা ওয়াচ টাওয়ারের মতো। বিস্তৃত সবুজের মাঝে বাংলাদেশ দেখা যায়।

এখানকার আরও একটি আকর্ষণ ‘লিভিং রুট ব্রিজ’। ২৫০ মিটার সিঁড়িপথ নেমেছে থাইলং নদীর কাছে। নদীর উপরেই জীবন্ত গাছের সেতুটির অবস্থান। নদীর একপাড়ে জঙ্গলের বিশাল বিশাল গাছের ঝুরি নেমে বহু বছর ধরে বেড়েছে এবং বিনুনি পাকানোর মতো শক্ত হয়ে নদীর অন্য পাড়ে মিশেছে। দীর্ঘ দিন ধরে ঝুরির পরিমাণ বাড়তে বাড়তে সেতুর আকার ধারণ করেছে।

মাওলিননং থেকে দেখে নেওয়া যায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের শহর ডাউকি। ডাউকি নামে একটি নদীও রয়েছে। সে নদীতে নৌবিহারের ব্যবস্থাও আছে।

কোথায় থাকবেন?

মাওলিননং গ্রামে একাধিক হোম স্টে রয়েছে। শিলঙে থেকে গ্রামটি গাড়ি করে গিয়ে ঘুরে আসতে পারেন।

কী ভাবে যাবেন?

গুয়াহাটি বা শিলং পৌঁছে সেখান থেকে গাড়িতে মাওলিননং ঘুরে আসুন। যে কোনও বড় শহর থেকে ট্রেনে বা বিমানে গুয়াহাটি যাওয়া যায়। শিলঙে বিমানবন্দর থাকলেও বিমানের সংখ্যা সীমিত। গুয়াহাটি থেকে সরাসরি গাড়ি বুক করেও যেতে পারেন।

Travel Tips

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy