E-Paper

চোখ খুইয়ে এক নৌকায় ইয়ার আলি, গোবিন্দ

ধর্ম না পেটের খিদে, কোন লড়াই এ বার? কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চলের বসতিতে খোঁজ নিলেন ঋজু বসু।

ঋজু বসু

শেষ আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:১৮
মেটিয়াবুরুজের গান্ধী ময়দানে ৭০-৮০ বছর ধরে সহাবস্থান রামচরিতমানস মন্দির (ডান দিকে) এবং স্থানীয় মসজিদের (পিছনে)।

মেটিয়াবুরুজের গান্ধী ময়দানে ৭০-৮০ বছর ধরে সহাবস্থান রামচরিতমানস মন্দির (ডান দিকে) এবং স্থানীয় মসজিদের (পিছনে)। — নিজস্ব চিত্র।

গোবিন্দ দেবনাথের সঙ্গে আলাপ নেই ইয়ার আলি মোল্লার। মহেশতলা পুরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে দত্তবাগানে আত্মীয়ের দু’ঘরের বাড়িতে আশ্রিত সস্ত্রীক গোবিন্দ। পাশেই কলকাতা পুরসভার ১৩৮ নম্বর ওয়ার্ডের তাঁরা ভোটার।

ইয়ার আলির চিলতে সিগারেট-বিস্কুটের দোকানখানা সন্তোষপুর স্টেশনের রেললাইনের ধারে। সেই রেলবস্তির দরমার ঝুপড়ি ঘরে ছেলে-বৌমা, নাতি-নাতবৌ নিয়ে সংসার। খাতায়-কলমে বেআইনি ঝুপড়ির বাসিন্দা হলেও বৈধ ভোটার তাঁরা সেখানেই। দু’জনের বাড়ির ফাঁকে মেরেকেটে কিলোমিটারটাক। ২০২৪-এর একটি দিনে দু’জনের ভাগ‍্যও এক সুতোয় গাঁথা হয়ে গিয়েছে।

গোবিন্দ বাঁ চোখ, আর ইয়ার আলি ডান চোখে ঝাপসা দেখছিলেন। ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনী এলাকায় মেটিয়াবুরুজ সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে একই দিনে চোখের ছানি কাটাতে গিয়েছিলেন দু’জন। দু’জনকেই চোখ খোয়াতে হয়েছে বলে অভিযোগ। সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের স্বাস্থ্য শিবিরে ছানি কাটাতে গিয়ে এক সঙ্গে ২৪ জন কার্যত চোখ হারিয়েছেন বলে দাবি। তাঁদের মধ্যে একমাত্র গোবিন্দ গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি বা এপিডিআরের সাহায‍্যে মামলা লড়ছেন। গাফিলতি নয়, চিকিৎসা সরঞ্জামের ত্রুটিতে চক্ষু-বিভ্রাট বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তথা রাজ‍্য স্বাস্থ‍্য দফতর দায় এড়িয়ে হাত ধুয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন। গোবিন্দর তরফে আইনজীবী ঝুমা সেন হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে গিয়েছেন।

মেটিয়াবুরুজের দত্তবাগানের বাড়িতে বসে গোবিন্দ এবং তাঁর স্ত্রী সুজাতা বলছিলেন, অস্ত্রোপচার পর্ব মিটিয়ে দিনের দিনই বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ডাক্তারবাবু। বলে দেন, পরশু ফের এলে চোখের পটি খোলা হবে। পরের দিনটা সম্ভবত রবিবার ছিল। অস্ত্রোপচারে কিছু একটা গোলমাল হয়েছে, বলে সে দিনই মেটিয়াবুরুজ হাসপাতালে ফের ডেকে পাঠানো হয় তাঁদের।

হন্তদন্ত হয়ে মধ‍্য ষাটের ইয়ার আলি ও সত্তরোর্ধ্ব গোবিন্দ, দু’জনেই গিয়েছিলেন হাসপাতালে। সেখান থেকে সটান কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ‘রেফার’ করা হয়। অত দূর যাওয়াই সার। গোবিন্দ, ইয়ার আলি বা অন‍্য দুর্ভাগাদের ছানি-পড়া চোখের দৃষ্টি পুরোপুরি মুছে গিয়েছে।

বিষয়টি এখানেই ধামাচাপা পড়ার কথা ছিল। গালভরা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে কেন ছানি কাটার শিবির বসিয়ে একসঙ্গে অনেকের চোখে শল‍্য চিকিৎসা হবে? কেন চক্ষু বিভাগে এই চিকিৎসার স্থায়ী পরিকাঠামো থাকবে না? এ সব প্রশ্ন ওঠার কথাই ছিল না। এপিডিআর-এর স্থানীয় কর্মী আলমগির মোল্লা, গার্ডেনরিচ নাগরিক পরিষদের সুজাউদ্দিন মোল্লারা আক্ষেপ করেন, চোখ খোয়ানো হতভাগ‍্যদের ঘরে ঘরে গিয়ে আইনি লড়াইয়ের কথা বুঝিয়েও লাভ হয়নি। একমাত্র গোবিন্দ মামলা লড়ছেন। বাকিরা জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে লড়া অসম্ভব জেনে পিছু হটেন।

ইয়ার আলির ছেলে নুরনবি মোল্লা অবশ্য বলেন, “আমি চেয়েছিলাম, মামলাটা হোক। কিন্তু আমার ভাইরা রাজি হল না।” পরে ইয়ার আলির বাঁ চোখের ছানি বজবজ হাসপাতালে কাটিয়েছেন বাড়ির লোক। সেই বাঁ চোখটুকুই এখন ভরসা। অন‍্য দিকে, বাঁ চোখে সম্পূর্ণ আঁধার দেখা গোবিন্দর ডান চোখের দৃষ্টিও ক্রমশ ক্ষীণ হচ্ছে। অস্ত্রোপচারের সঙ্গতি নেই। ক্ষতিপূরণের আশার খড়কুটো আঁকড়ে মামলাটা লড়ছেন।

আজকের পশ্চিমবঙ্গে ধর্ম-ভিত্তিক বিদ্বেষের রাজনীতির কারবারিদের একটি প্রধান ল‍্যাবরেটরির নাম হল মেটিয়াবুরুজ। প্রধানত বাঙালি মুসলিম বস্ত্র ব‍্যবসায়ী, দর্জিদের খাসতালুক। বিহার-ওড়িশার বাসিন্দাও কিছু আছেন। এই ঘিঞ্জি জনপদকে ‘মিনি পাকিস্তান’ বলে দাগিয়ে হিন্দুদের বিপন্নতার তত্ত্ব খাড়া করার চেষ্টা হয়েছে বারে বারে। আট কিলোমিটার দূরে, বিক্ষিপ্ত গোষ্ঠী সংঘর্ষেও মেটিয়াবুরুজের নাম জড়িয়ে বদনাম করার চেষ্টা করেছে গেরুয়া-শিবির। একটি রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠ এক ব‍্যবসায়ীর উস্কানিতে রবীন্দ্রনগর থানার সামনে ব‍্যস্ত বাজারে তুলসী মঞ্চ বসিয়েও বিদ্বেষ-বীজ বপনের চেষ্টা হয়। কিন্তু নানা ঘটনায় পদে পদে বোঝা যায়, তৃণমূল স্তরে ইয়ার আলি বা গোবিন্দ দেবনাথেরা আসলে এক নৌকায় টলমল করছেন।

একটা চোখ হারানো গোবিন্দ নামমাত্র স্কুলে পড়েছেন। আগের মতো মই বেয়ে উঠতে পারেন না। কোনও রকমে ইলেকট্রিক মিস্ত্রির সহকারীর কাজ করেন। আয় ছিটেফোঁটা। কলকাতার পুরএলাকায় পাঁচপাড়া রোডে পারিবারিক বাড়ি এখন বেহাত। গোবিন্দর স্ত্রী সুজাতার আত্মীয়দের বাড়িতে ঠাঁই মিলেছে। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়েছে উলুবেড়িয়ায়।

দুর্ভাগ‍্যের শিকার সুজাতাও। এক যুগের বেশি, এমনকি অতিমারি-পর্বেও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে কার্যত নিখরচায় খেটেও বয়স পেরিয়ে যাওয়ায় পাকা চাকরি জোটেনি। কয়েক বাড়িতে রান্নার কাজ করে সংসারটা টানছেন এখন।

ছোট দোকানদার ইয়ার আলির ছেলেরা বেশির ভাগই পেশায় দর্জি। বছর কুড়ি হল, আট নম্বর ওয়ার্ডেই গোরস্থানের কাছের পুরনো ঘরবাড়ি বেহাত হওয়ায় রেলবস্তিতে উঠে এসেছেন। সাব-মিটার বসিয়ে ভাগাভাগিতে ঘরে বিদ‍্যুতের লাইন ঢুকলেও, কাছাকাছি সরকারি টাইমের কল নেই। ঘরের পিছনেই পচা খালে শৌচকর্মের বন্দোবস্ত। নুরনবি বলেন, “বর্ষা হলেই খালের নোংরা পানি ঘরে ঢোকে। গ‍্যাসে (দুর্গন্ধে) তখন তুমি শুতি পারবে না!”

মহেশতলা পুরসভার চেয়ারম‍্যান দুলাল দাস অবশ‍্য ‘বেআইনি’ বস্তির বাসিন্দাদের দায় নিতে নারাজ। তাঁর দাবি, “সব ক‍্যানিং, মথুরাপুরের বাসিন্দা। আয়লার পর থেকে রোজগারের আশায় এখানে এসে উঠেছেন।” ইয়ার আলি, নুরনবিরা কিন্তু রেলবস্তির ঠিকানারই ভোটার। নুরনবির স্ত্রী লক্ষ্মীর ভান্ডারও পান। শোনা যায়, শাসক দলের বড়সড় মিটিং-মিছিলে জমায়েত বাড়াতে স্থানীয় নেতাদের বড় ভরসা ‘বেআইনি’ মানুষগুলো। মাথা পিছু ১০০-২০০ টাকাতেও অনায়াসে সভায় নিয়ে যাওয়া হয়।

এ তল্লাটের মানুষজনের জন্য তৈরি হাসপাতালটি সুপারস্পেশালিটি নামেই। রোগীর গুরুতর সঙ্কটে চিকিৎসার সিসিইউ নেই। এক্স-রে, সিটি স্ক‍্যানের সমস‍্যা সদ‍্য মিটেছে। সাংসদের স্বাস্থ্য-শিবির বসলেও তা স্থায়ী সমাধানসূত্র দিতে ব‍্যর্থই।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর্বের সংঘাতের সময়ে মোহনদাস কর্মচন্দ গান্ধী আসেন মেটিয়াবুরুজে। রাজাবাগান থানার সামনে একটি ফলকে শুধু সেই ইতিহাসের স্বাক্ষর। বন্ধ চটকল, থান কাপড়ের হাট এবং শপিংমল ঢেকে ফেলেছে গান্ধীর সভার মাঠ। তবে লোকমুখে এলাকাটি আজও গান্ধী ময়দান। সেখানে গা-ঘেঁষেই সহাবস্থান পুরনো মসজিদ ও হনুমানজি শোভিত শ্রীরামচরিতমানস মন্দিরের। শুধু খেটে খেতে মেটিয়াবুরুজে আসা সাধারণ হিন্দু, মুসলিমের দাম ক্রমশ তলানিতে ঠেকছে।

(চলবে)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Sebashray Medical Camp Abhishek Banerjee Diamond Harbour

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy