Advertisement
E-Paper

করোনায় মৃত্যু নিয়ে গুজবের জেরে ভোগান্তি

শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন হাসপাতালে। পরে মারাও যান বৃদ্ধ। করোনায় মৃত্যু হয়েছে, এই গুজব ছড়িয়ে পড়ায় সৎকার নিয়ে নানা টালবাহানা চলল বসিরহাটে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০২০ ০৪:০১
স্যানিটাইজ করা হচ্ছে বসিরহাট শ্মশান। মঙ্গলবার। ছবি: নির্মল বসু

স্যানিটাইজ করা হচ্ছে বসিরহাট শ্মশান। মঙ্গলবার। ছবি: নির্মল বসু

করোনা-আবহে অসুস্থতা, মৃত্যু নিয়ে গুজবের জেরে কী ভাবে মানুষকে হেনস্থা হতে হচ্ছে— ফের তার উদাহরণ মিলল।

শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন হাসপাতালে। পরে মারাও যান বৃদ্ধ। করোনায় মৃত্যু হয়েছে, এই গুজব ছড়িয়ে পড়ায় সৎকার নিয়ে নানা টালবাহানা চলল বসিরহাটে। মৃত্যুর শংসাপত্রে করোনার উল্লেখ না থাকা সত্ত্বেও কেন এ ভাবে ভোগান্তি পোহাতে হবে, সে প্রশ্ন তুলছে পরিবারটি। করোনা-আবহে গুজব বা মিথ্যা খবর না ছড়ানোর জন্য বার বার আবেদন করছে পুলিশ-প্রশাসন। কিন্তু তা সত্ত্বেও পরিস্থিতি ঠিক কী, বসিরহাটের ঘটনা ফের সে দিকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।

বসিরহাট হাসপাতাল থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে শ্মশান। সেখানে দেহ নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রথমে তো রাজিই করা যাচ্ছিল না কাউকে। পরে যদি বা এক ব্যক্তি রাজি হন, তাঁকে দিতে হয়েছে ৫ হাজার টাকা! পরিবারটির আরও দাবি, মৃত্যুর শংসাপত্র দেখানো সত্ত্বেও ডোম এবং শ্মশানকর্মীরা দেহ সৎকার করতে অস্বীকার করেন। শেষে প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে যোগাযোগের পরে সোমবার রাত ৮টা নাগাদ পুলিশ ও পুরপ্রধানের চেষ্টায় সৎকার হয়েছে।

পুলিশ ও প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টে ভূগছিলেন বছর পঁয়ষট্টির ওই বৃদ্ধ। বৃহস্পতিবার ভর্তি করা হয়েছিল বসিরহাট জেলা হাসপাতালে। শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় করোনা সন্দেহে তাঁকে গোপালপুরে কোভিড হাসপাতালে পাঠানো হয়। করোনা পরীক্ষার জন্য লালারসের নমুনা সংগ্রহ করে কলকাতায় পাঠানো হয়। এরই মধ্যে রবিবার বেলা ৩টে নাগাদ মারা যান ওই বৃদ্ধ।

পরিবারের দাবি, গোপালপুরে কোভিড হাসপাতালে চিকিৎসকের অভাবে ঠিকঠাক চিকিৎসার সুযোগ মেলেনি। মৃত্যুর পরে দেহ প্লাস্টিকের মোড়কে প্যাকিং করে অ্যাম্বুল্যান্সে পাঠানো হয় বসিরহাট জেলা হাসপাতালে। এ দিকে, দেহ প্লাস্টিকে জড়ানো দেখে করোনায় মৃত্যু হয়েছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কে মর্গের ডোম, হাসপাতালের কর্মী— কেউ দেহ ছুঁতে পর্যন্ত রাজি হননি বলে জানিয়েছেন বৃদ্ধের আত্মীয়েরা।

শববাহী গাড়ির চালকেরা দেহ শ্মশান পর্যন্ত নিয়ে যেতে অস্বীকার করেন। দুর্ভোগের মধ্যে পড়তে হয় মৃতের পরিবারকে। দেহ তখন রাখা হয়েছে মর্গে। পরিবারের দাবি, সৎকারের বিষয়ে সাহায্যের জন্য প্রশাসনে কাছে অনুরোধ করা সত্ত্বেও ফল মেলেনি।

মৃতের আত্মীয়দের অভিযোগ, করোনা পরীক্ষার রিপোর্টে রোগের উল্লেখ ছিল না। ওই রিপোট দেখালেও কোনও শববাহী গাড়ির চালক তা মানতে রাজি হননি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন দফতরে ঘুরেও কোনও লাভ হয় না। শেষমেশ এক অ্যাম্বুল্যান্স চালক রাজি হন। কিন্তু ভাড়া যেখানে পাঁচশো টাকা হওয়া উচিত, সেখানে তিনি ৫ হাজার টাকা দাবি করেন। তাতেই রাজি হয় পরিবার।কিন্তু এত সবের পরেও সৎকার করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়।

করোনা-আক্রান্ত রোগীর দেহ আসছে— এই গুজবে কর্মীদের অনেকেই শ্মশানে ঢোকার গেটে তালা ঝুলিয়ে ভয়ে পালিয়ে যান। দেহ প্লাস্টিকে জড়ানো থাকায় গুজব আরও ছড়ায়। ডোমেরা দেহ ছুঁতে রাজি হননি। করোনা হয়নি, তার স্বপক্ষে রিপোর্ট দেখিয়েও কাজ হয়নি। দু’পক্ষের বচসা বেধে যায়।

পরে পুলিশ এবং পুরপ্রধান তপন সরকারের হস্তক্ষেপে সৎকার করা সম্ভব হয়। প্লাস্টিকে দেহ মুড়িয়ে দেওয়ার থেকেই গুজব রটেছে বলে অনেকের অনুমান। কিন্তু বৃদ্ধের মৃত্যু যদি করোনাতে না হয়েই থাকবে, তা হলে দেহ প্লাস্টিকে মোড়ানো হল কেন?

এ বিষয়ে বসিরহাট স্বাস্থ্য জেলার মুখ্য আধিকারিক দেবব্রত মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘মৃত্যুর বেশ কয়েক ঘণ্টা পরে রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছিল। কিন্তু সতর্কতার জন্য আগেই দেহ প্লাস্টিকে মুড়ে রাখা হয়েছিল।’’

কিন্তু অ্যাম্বুল্যান্স পেতে যে ভাবে পরিবারটিকে নাজেহাল হতে হল, তা নিয়ে জেলা হাসপাতালের সুপার শ্যামল হালদার বলেন, ‘‘আমরা বহুবার অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু কেউ প্রাণভয়ে যেতে না চাইলে আমরা এর থেকে বেশি কী করতে পারি!’’ কোনও চালক অতিরিক্ত টাকা চেয়ে থাকলে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। পুলিশ সুপার কঙ্করপ্রসাদ বারুই বলেন, ‘‘গুজবের জেরে বেআইনি কাজ কোনও ভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।’’

পুরপ্রধান তপন সরকারের কথায়, ‘‘নেহাতই গুজবের জেরে এই কাণ্ড। আমরা রিপোট নেগেটিভ দেখিয়ে সকলকে বুঝিয়ে কাজ সারি।’’

স্রেফ গুজবে এই কাণ্ড ঘটলে সত্যি কারও করোনায় মৃত্যু ঘটলে কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বসিকহাট শহরের সচেতন নাগরিকদের অনেকেই। এই পরিস্থিতিতে গুজব না ছড়ানোর অনুরোধ নিয়ে এ দিন ফের প্রচারে নামে পুলিশ। পাশাপাশি বসিরহাট শ্মশান আশপাশের এলাকা দমকল কর্মীরা জীবাণুমুক্ত করেন।

Coronavirus Health
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy