E-Paper

রসনাতৃপ্তির আবদার মেটাতে শীতে দেদার পরিযায়ী-নিধন

শীতের সময়ে প্রতি বছরই হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে আসা পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা বাড়ে এ রাজ্যে। সেই সঙ্গেই বাড়ে ওই অতিথিদের শিকারের প্রবণতা।

স্বাতী মল্লিক

শেষ আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:১৩
জালে আটকে পরিযায়ী কাদাখোঁচা।

জালে আটকে পরিযায়ী কাদাখোঁচা। ছবি: সৌমিত্র রায়।

গত বছর শীতের এক ভোরে হাবড়ার নাংলা বিলে আসা পরিযায়ী পাখিদের দেখতে গিয়েছিলেন পাখিপ্রেমীরা। সেখানে তাঁরা আবিষ্কার করেন, বিলের পাশের একফসলি জমিতে সূক্ষ্ম জালে আটকে ঝুলছে কয়েকশো পরিযায়ী অতিথি! হাট্টিটি (গ্রে হেডেড ল্যাপউইং), ইয়েলো বিটার্ন, প্যাসিফিক গোল্ডেন প্লোভার— কে নেই তাতে! মাটির সঙ্গে সমান্তরালে মেলে রাখা ওই জালে অসহায় ভাবে তারা কেউ ঝুলছে, কেউ ছটফট করতে গিয়ে আরও জড়িয়ে যাচ্ছে, রক্তাক্ত হচ্ছে। তাদের সঙ্গে ওই মৃত্যুফাঁদে ধরা পড়েছে সাদা বুক মাছরাঙা, ডাহুক, পেঁচার মতো স্থানীয়েরাও। স্রেফ মানুষের রসনাতৃপ্তি করতে গিয়ে বেঘোরে প্রাণ দিতে হয় তাদের।

শীতের সময়ে প্রতি বছরই হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে আসা পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা বাড়ে এ রাজ্যে। সেই সঙ্গেই বাড়ে ওই অতিথিদের শিকারের প্রবণতা। দু’পয়সা রোজগারের আশায় রাতের অন্ধকারে মৃত্যুফাঁদ পাতা হয়। আর তার পরে জীবন্ত অবস্থায় পরিযায়ীদের বাজারে বিক্রি করেন স্থানীয়দেরই একাংশ। মালদহ, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা-সহ বহু জেলায় শীতে দেদার চলে এই পরিযায়ী নিধন-পর্ব।

রাজ্যের পাখিপ্রেমী সংগঠন বার্ড ওয়াচার্স সোসাইটির সদস্য, পেশায় চিকিৎসক কণাদ বৈদ্য বলছেন, ‘‘১৯৭২ সালে বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইন তৈরির আগে এ দেশে অবাধে বন্যপ্রাণ শিকার চলত। ১৫-২০ বছর আগেও এই আইন নিয়ে মানুষ এত জানতেন না। কিন্তু এখন সব জেনেও ‘পরোয়া করি না’ মনোভাব চলে এসেছে। ফলে দেদার বলি দেওয়া হচ্ছে পরিযায়ী অতিথিদের। পরিস্থিতি এমনই যে, দুবাইয়ে কাজ করা ব্যক্তিও শীতে দেশে ফেরেন পাখি শিকার করতে! বছর দুয়েক আগেএমনই এক জন ধরা পড়েছিলেন পুলিশের হাতে।’’

কী ভাবে হয় এই পরিযায়ী শিকার? পাখিপ্রেমীরা ও বন্যপ্রাণ নিয়ে কাজ করা সংস্থার সদস্যেরা জানাচ্ছেন, কাদামাটিতে রুস্টিং করতে নামা পাখিদের ধরতেই প্রধানত রাতে জাল পাতে শিকারীরা, যাতে রাতে বা ভোরের দিকে আটকে পড়ে পাখি। সকালেই তাদের জীবন্ত বাজারে বিক্রি করা হয়, মাংসের লোভে। পরিযায়ীদের সঙ্গে জালে জড়িয়ে পড়া স্থানীয় পাখিদেরও একই পরিণতি হয়। এ ছাড়া, কখনও একই প্রজাতির পাখিকে টোপ হিসাবে ব্যবহার করে, অথবা ইন্টারনেট থেকে সেই পাখির ‘কল’ নামিয়ে তা রাতের অন্ধকারে খোলা মাঠে বাজিয়ে পাখিদের সে দিকে আকৃষ্ট করা হয়।

নদিয়া ও উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় পরিযায়ী পাখি শিকার রুখতে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘বন ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য সৌমিত্র রায় বলছেন, ‘‘চ্যাগা, বগারি, চখাচখি, বিভিন্ন পরিযায়ী হাঁস-সহ একাধিক প্রজাতির পাখি ভিন্‌ দেশে এসে এ ভাবেই বেঘোরে মারা পড়ে। প্রধানত গ্রামে বেড়াতে আসা শহুরে বাবু ও পর্যটকদের ‘অন্য রকম’ মাংস চেখে দেখার আবদার মেটাতেই এই সব পাখি শিকার করা হয়। কিছু কিছু জায়গায় স্থানীয় মানুষ সচেতন, তাঁরা আমাদের সহযোগিতা করেন। আবার কোথাও বাধার মুখেও পড়তে হয়।’’

গত কয়েক বছর ধরে পাখি শিকার রুখতে কাজ করা সৌমিত্র ও তাঁর দলবল কোথাও পাখি ধরতে জাল পাতার খবর পেলেই পৌঁছে যান। কখনও জাল পুড়িয়ে আটকে থাকা পাখিদের মুক্তি দেন তাঁরা অথবা বন দফতরের হাতে তুলে দেন। আবার কখনও ওত পেতে অপেক্ষা করেন, ভোরে জাল গোটাতে আসা চোরাশিকারীকে হাতেনাতে ধরবেন বলে। এই কাজে তাঁদের অন্যতম ভরসা স্কুলপড়ুয়ারা। সেই সঙ্গে পাশে পেয়েছেন বার্ড ওয়াচার্স সোসাইটি এবং ‘ওয়াইল্ডলাইফ ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া’র মতো সংগঠনকে। সৌমিত্রের কথায়, ‘‘গত সপ্তাহে নদিয়ার গাংনাপুরের কাছে এক জায়গায় একসঙ্গে ১৪টি জাল উদ্ধার করেছি। এক-একটি জাল ছিল ২৫০ মিটার লম্বা। গত তিন মাসে এই দুই জেলায় ২৯টি জাল নষ্ট করে উদ্ধার করতে পেরেছি ৬৮৭টি পাখিকে। এর আগের শীতে শুধু উত্তর ২৪ পরগনাতেই ৮৭টি জাল নষ্ট করেছিলাম আমরা, উদ্ধার হয়েছিল ২৩০টি পাখি।’’

পাখি শিকার রুখতে অবশ্য এই সব সংগঠনের সঙ্গে কাজ করছে বন দফতরও। বীরভূমের বন দফতরের ডিএফও রাহুল কুমারের দাবি, ‘‘পাখি শিকার রুখতে র‌্যাপিড রেসপন্স দল বানিয়ে ঘটনাস্থলে পাঠাই আমরা। এ ছাড়া এলাকায় মাইকিং করে স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনিক বৈঠকেও এ নিয়ে আলোচনা হয়।’’

তবু শীতের সকালে অতিথি-নিধন থামছে কই?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Migratory Bird

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy