E-Paper

সময় বদলাচ্ছে, পৌষে বাড়ির পিঠেও দুর্লভ

আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই চেনা ছবি আজ অনেকটাই ম্লান। তবু এখনও কিছু পরিবার পরম্পরা আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।

সীমান্ত মৈত্র  

শেষ আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:২৯

কথায় আছে, ‘ঢেঁকি স্বর্গে গিয়েও ধান ভানে।’ কিন্তু আজ সেই ঢেঁকির অস্তিত্বই বিপন্ন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি ও ঢেঁকিতে কুটে পিঠে তৈরির রীতি ক্রমশ হারিয়ে যেতে বসেছে।

এক সময়ে পৌষ মাস এলেই গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ দেখা যেত। বাড়ির মহিলারা শীতের রোদে ঢেঁকিতে আতপ চাল কুটতেন। ঢেঁকির শব্দে মুখর হয়ে উঠত গ্রাম। পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন ও সংক্রান্তির দিনে তৈরি হত নানা রকম পিঠে— কাস্তেপোড়া, কাঁচিপোড়া, কুলি পিঠে, তেলের পিঠে, রসবড়া, গোকুল পিঠে, পাটিসাপটার মতো আরও কত কী!

আধুনিকতার ছোঁয়ায় সেই চেনা ছবি আজ অনেকটাই ম্লান। তবু এখনও কিছু পরিবার পরম্পরা আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। তাঁদেরই এক জন বাগদার মথুরা গ্রামের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব আলপনা পাল। বহু বছর ধরে নিয়ম করে পৌষ সংক্রান্তিতে বাড়িতে পিঠে তৈরি করছেন তিনি। আলপনা বললেন, “শাশুড়ির কাছ থেকেই পিঠে বানানো শিখেছিলাম। ওঁর প্রয়াণের পর থেকে আমিই পিঠে করছি। এ বছরও কাস্তেপোড়া, পাটিসাপটা করেছি।”

বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা অনেকেই বাইরে কর্মরত। তাই সময়ের অভাবে তাঁদের মধ্যে বাড়িতে পিঠে তৈরির আগ্রহ কমছে বলেই মত। সময়ের অভাবের সঙ্গে রয়েছে একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে যাওয়া। প্রবীণাদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় শেখানোর মানুষও আর তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেকেই দোকান থেকে পিঠে কিনে খেতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। এক স্কুলশিক্ষিকা বললেন, ‘‘বাচ্চা সামলে, সংসারের কাজ করে স্কুলে যাওয়ার পরে আর সময় থাকে না বাড়িতে পিঠে বানানোর। ছোটবেলায় মায়ের হাতের পিঠে খেতাম, এখন দোকানের পিঠেই ভরসা।’’

বনগাঁর বাসিন্দা বেসরকারি অফিসে কর্মরত এক তরুণী বলেন, ‘‘খেতে ইচ্ছে হলেও কাজের চাপে সময় পাই না। আর তা ছাড়া বাড়ির মহিলাদেরই পিঠে বানাতে হবে কেন? বর্তমান প্রজন্মের পুরুষেরাও তো বানাতে পারেন। দু’জনে মিলে করলে কাজটা অনেক সহজ হয়। মিষ্টির দোকানে তো পুরুষ কারিগরেরাই পিঠে বানান, তা হলে বাড়িতে নয় কেন?’’

মিষ্টির দোকানগুলিতেও এই সময়ে পিঠে বিক্রির হিড়িক পড়ে যায়। দোকানিরা জানাচ্ছেন, সারা বছর পিঠে বিক্রি হলেও পৌষ মাসে বিক্রি অনেকটাই বেড়ে যায়। বিশেষ করে পাটিসাপটা ও মালপোয়ার চাহিদা বেশি।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ঢেঁকিতে কুটে আতপ চাল আর কাঠের উনুনে তৈরি পিঠের স্বাদ গ্যাস বা মেশিনে বানানো পিঠেতে পাওয়া যায় না। যদিও কাজটি পরিশ্রমসাধ্য, তবু এখনও কিছু মানুষ ঢেঁকির উপর ভরসা রাখেন। আবার, খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় খেজুরের রস ও গুড়ও এখন দুর্লভ। তবু বনগাঁ থেকে খেজুর গুড়ের পাটালি নিয়ে গিয়ে শহরে পিঠে বানানোর চেষ্টা করছেন অনেকে।

উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত হয় পিঠেপুলি উৎসব। সেখানে নানা ধরনের পিঠের সম্ভার থাকে। আয়োজকদের দাবি, এর মাধ্যমে এক দিকে যেমন বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে পিঠে তৈরির আগ্রহ বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে, তেমনই পিঠে বিক্রির সুযোগ করে দিয়ে বহু মহিলাকে আর্থিক ভাবে স্বনির্ভর করে তোলার চেষ্টাও হচ্ছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bangaon

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy