এবড়ো খেবড়ো খড়ের কুঁড়ে ঘরের চাল। তার উপরে কালো পলিথিন ঢাকা বাড়িতে ঢোকার মুখে উঠোনে চোখে পড়বে হাঁস-মুরগি রাখার মতো ছোট খড়ে ঢাকা মাচা। হেঁট হয়ে ভিতরে নজর দিতেই দেখা গেল, হাঁস মুরগি নয়, ছোট কয়েকজন ছেলেমেয়ে ঘুমিয়ে আছে গুটিসুটি মেরে। ইন্দিরা আবাস যোজনার টাকা না পাওয়ায় রায়দিঘি পঞ্চায়েতে ২৩ নম্বর লাট তালতলা গ্রামের দিনমজুর বুদ্ধিশ্বর মাখালের পরিবারের মতো অনেকেই বসবাস করছেন এই অবস্থায়।
রায়দিঘির মথুরাপুর ২ ব্লকে ১১টি পঞ্চায়েত। গত কয়েক বছর ধরে ইন্দিরা আবাস যোজনা প্রকল্পে এখন অনেক দুঃস্থ পরিবার আবেদন করেও ঘর পাননি।
যেমন, বুদ্ধেশ্বর মাকালের কথাই ধরা যাক। মাটির দেওয়াল, টালির চালের দু’কামরা ঘরটির জরাজীর্ণ দশা। দেওয়ালে মাটি খসে খোঁদল তৈরি হয়েছে। খড়ের চালেরও একই অবস্থা। ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে এ ভাবেই পাঁচজনের সংসারে মাথা গুঁজে আছেন কোনও মতে। বৃষ্টি এলে জল পড়ে মাথায়। শুকনো জায়গা খুঁজে মাথায় পলিথিন চাপা দিয়ে দিনরাত কাটাতে হয় কোনও মতে।
বুদ্ধিশ্বরের স্ত্রী লক্ষ্মী বলেন, ‘‘ঘর তৈরি করার জন্য পঞ্চায়েতকে অনেকবার বলেছি। কেউ কোনও ব্যবস্থা করেনি। বাধ্য হয়ে বছরখানেক আগে উঠোনে কুড়ে ঘরটা তৈরি করে নিয়েছি। বেশি বৃষ্টি এলেই সকলে মিলে গাদাগাদি করে ওখানেই রাত কাটাই।’’
একই কথা শোনা গেল আরও কয়েকজন গ্রামবাসীর মুখে। কেউ ইন্দিরা আবাস যোজনায় আদৌ টাকা পায়নি। কেউ প্রথম কিস্তির কিছু টাকা পেলেও পরের কিস্তির টাকার দিকে হাপিত্যেশে চেয়ে বসে আছে। আধাখ্যাঁচরা অবস্থায় পড়ে আছে ঘর। ফলে অন্য কোনও বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে নিতে হয়েছে পরিবারগুলিকে। কেউ কেউ দ্বিতীয় কিস্তির টাকার অপেক্ষায় বসে না থেকে বাজার থেকে চড়া সুদে টাকা নিয়ে বা পরিবারের গয়না বন্ধক রেখেও ঘর তৈরি করেছেন।
রায়দিঘির নগেন্দ্রপুর পঞ্চায়েতের সিপিএমের প্রধান রাজকৃষ্ণ বৈরাগী বলেন, ‘‘আমার এলাকায় ২০১৫-১৬ আর্থিক বর্ষে ইন্দিরা আবাস যোজনায় ৬২৪ জনের নামের তালিকা ব্লকে পাঠিয়েছিলাম। ওখান থেকে প্রথম কিস্তির টাকা অনেকে পেয়ে গেলেও দ্বিতীয় কিস্তির টাকা পেতে সমস্যা হচ্ছে বলে শুনেছি।’’ তাঁর অভিযোগ, ‘‘জেলা থেকে কাকে টাকা পাঠানো হচ্ছে, তা আমাদের জানানো হচ্ছে না। ফলে ওই বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে থেকে যাচ্ছি। প্রতিনিয়ত ঘরের টাকা চেয়ে বাসিন্দাদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে।’’
ওই এলাকার সিপিএম নেতা ইয়াসিন গাজির অভিযোগ, ৩০-৩৫টি পরিবার দ্বিতীয় কিস্তির টাকা পায়নি। ফলে কেউ পলিথিন ঢাকা কুঁড়ে ঘরে, কেউ প্রতিবেশীর বাড়িতে বসবাস করছে। অথচ প্রথম কিস্তির টাকা পাওয়ার পরে নিজের থাকার জন্য যেটুকু আশ্রয় ছিল, তা-ও ভেঙে ফেলেছে।
মথুরাপুর-২ পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি পীযূষ বৈরাগী বলেন, ‘‘গ্রামে কার ঘরের কী অবস্থা তা পঞ্চায়েত সমিতেকে জানানোর জন্য প্রতিটি পঞ্চায়েতে ২ জন করে প্রতিনিধি রয়েছে। তারা ঠিকঠাক রিপোর্ট না দেওয়ায় সমস্যা হতে পারে। তবুও ওই পরিবারগুলি আমার কাছে এলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখব।’’ তিনি জানান, ২০১৫-১৬ আর্থিক বর্ষে ইন্দিরা আবাস যোজনায় ২৪০০ জনের নামের তালিকা পাঠানো হয়েছিল। ঘর নির্মাণের মোট ৭০ হাজার টাকার মধ্যে প্রথম কিস্তির টাকা অনেকে পেয়েছেন। বাকিদের টাকাও ঢুকে যাবে।
বিডিও মোনালিসা তিরকের কথায়, ‘‘এলাকায় বেনিফিসারিদের নামের তালিকা পাঠানো প্রধানের দায়িত্ব। তারা যে নামের তালিকা পাঠায়, তা আমরা জেলায় পাঠাই। আর দ্বিতীয় কিস্তির টাকা পাওয়ার বিষয়ে রাজ্য থেকে সরাসরি বেনিফিসারির ব্যাঙ্ক এ্যাকাউন্টে টাকা জমা পড়ে। ফলে আমরাও সব কিছু জানতে পারি না।’’ তাঁর দাবি, প্রত্যেক বেনিফিসারিকে বলা হয়েছে, পাস বই আপডেট করতে। অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকলে তা প্রশাসনকে জানাতে বলা হয়েছে।