Advertisement
E-Paper

আয়লার পর পাচারের ঝড় রুখেছে কিশোরী

কয়েক মিনিটের আয়লা ঝড় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল একের পর এক গ্রাম। বিপন্ন হয়ে পড়েছিল অসংখ্য পরিবার। সুযোগ বুঝে কাজ দেওয়ার নাম করে ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলিকে ভিন রাজ্যে নিয়ে যাচ্ছিল পাচারচক্রের দালালেরা।

দীক্ষা ভুঁইয়া

শেষ আপডেট: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৪:০২
যাদবপুরের অনুষ্ঠানে আনোয়ারা। বুধবার স্বাতী চক্রবর্তীর তোলা ছবি।

যাদবপুরের অনুষ্ঠানে আনোয়ারা। বুধবার স্বাতী চক্রবর্তীর তোলা ছবি।

কয়েক মিনিটের আয়লা ঝড় নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল একের পর এক গ্রাম। বিপন্ন হয়ে পড়েছিল অসংখ্য পরিবার। সুযোগ বুঝে কাজ দেওয়ার নাম করে ছোট ছোট ছেলেমেয়েগুলিকে ভিন রাজ্যে নিয়ে যাচ্ছিল পাচারচক্রের দালালেরা।

ব্যতিক্রম একটি গ্রাম। সেখান থেকে কাউকে বাইরে যেতে দেয়নি বছর চোদ্দোর এক কিশোরীর নেতৃত্বে একরত্তি বাচ্চাদের একটি দল।

সাত বছর পরে সেই নেত্রী এখন সদ্য তরুণী। রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণসভায় তরুণদের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে সবে দেশে ফিরেছেন। আনোয়ারা খাতুন। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সন্দেশখালি এক নম্বর ব্লকের ছোট আশকারা গ্রামের বাসিন্দা।

গোলগাল মোটাসোটা চেহারা। অন্য আর পাঁচটা মেয়ের থেকে আলাদা করার কোনও উপায় নেই। কিন্তু বাল্যবিবাহ, নারী পাচারের মতো বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলেই চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে সদ্য কুড়ির মেয়েটির। এক সময়ে অভাবের টানে স্কুল যাওয়া বন্ধ করে তাঁকেও পাড়ি দিতে হয়েছিল ভিন রাজ্যে কাজের খোঁজে। মাস কয়েক পরে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তাঁকে উদ্ধার করে। সেটা ২০০৭ সালের কথা। তার দু’বছর পরেই আছড়ে পড়ল আয়লা। তছনছ হয়ে গেল আনোয়ারার গ্রাম-সহ দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বড় একটি অংশ। তার মধ্যে সন্দেশখালি, মিনাখাঁর মতো ব্লকও ছিল। পরিসংখ্যান বলছে সেই সময় শুধুমাত্র সুন্দরবন লাগোয়া এলাকাগুলি থেকেই ২৭১ জন নাবালক-নাবালিকা নিখোঁজ হয়েছিল। কিন্তু আনোয়ারার নেতৃত্বে শিশুর দল আশকারা গ্রামের একটি ছেলেমেয়েকেও বাইরে যেতে দেয়নি।

শুধু এতেই থামেনি ওরা। ম্যানগ্রোভ ধ্বংস বন্ধ করতে আনোয়ারার দলের ছেলেমেয়েরা সংগ্রহ করে ম্যানগ্রোভ বীজ। আর সেই বীজ থেকে চারা গাছ তৈরি করে নিজেদের এলাকাগুলিতে ম্যানগ্রোভ অরণ্য তৈরি করছে। যা দেখে প্রশংসা করেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী শশী পাঁজাও।

বছর কুড়ির আনোয়ারা আজ এলাকার বাকি মেয়েদের জীবনে এগিয়ে চলার স্বপ্ন দেখান। তাঁর নেতৃত্বে সন্দেশখালি এক, দু’নম্বর ব্লক এবং মিনাখাঁয় ৮০টি শিশু দল (চিলড্রেনস গ্রুপ) বাল্যবিবাহ, পাচার রোধের মতো বিষয়গুলি দেখভাল করে। দলগুলি খোঁজ নেয় স্কুলছুট বাচ্চাদের। আনোয়ারার কথায়, ‘‘কেউ পরপর কয়েক দিন স্কুলে না গেলেই তার বা়ড়িতে পৌঁছে যায় আমাদের দল। যদি কোনও ছেলে কাজের খোঁজে অন্যত্র যায় কিংবা কোনও মেয়ের বিয়ের ঠিক হয়, আমরা তাদের পরিবারকে বোঝাই। এতেও কাজ না হলে ব্লকের শিশু সুরক্ষা কমিটির সাহায্য নিয়ে তা বন্ধ করি।’’ আনোয়ারা আরও জানান, গত দশ বছর ধরে সচেতনতা প্রচার চালিয়ে আজ অন্তত লোকজন বুঝতে শিখেছে আঠেরো বছরের কম বয়সে মেয়ের বিয়ে দেওয়া উচিত নয়। এতে শুধু আইন ভাঙা হয় না। সেই মেয়েটি কম বয়সে গর্ভধারণ করলে শারীরিক সমস্যাও দেখা দেয়। আনোয়ারার গর্ব, ‘‘আমার গ্রামে আঠেরোর নিচে একটা মেয়েরও আর বিয়ে হয় না।’’

শিশু ও মহিলা অধিকার নিয়ে কাজ করা ওই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হয়েই রাষ্ট্রপুঞ্জে গিয়েছিলেন আনোয়ারা খাতুন। সেখানে তুলে ধরেছেন মেয়েদের মধ্যে শিক্ষার হার বাড়ানোর কথা। বুধবার শহরে ফিরেছেন। তিনি বলেন, ‘‘আমার লক্ষ্য কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে বন্ধ করা। আর তা একমাত্র সম্ভব মেয়েদের সঙ্গে ছেলেদের মধ্যেও শিক্ষার প্রসার ঘটানো। আর সে কথাই আমি বলে এসেছি সাধারণসভায়।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy