E-Paper

নজরে পেঁচা-কাহিনি, রাতের অন্ধকারে সমীক্ষা রাজ্যে

দেশে এই প্রথম কোনও রাজ্যে পেঁচার হাল-হকিকত জানতে সমীক্ষার পথে হাঁটছে রাজ্যের পাখিপ্রেমী সংগঠন বার্ড ওয়াচার্স সোসাইটি। তাদের যোগ্য সঙ্গত করছে ডব্লিউডব্লিউএফ-ইন্ডিয়া ও রাজ্যের বন দফতর।

স্বাতী মল্লিক

শেষ আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৪২
ওরিয়েন্টাল স্কপ্‌স আউল বা লাল পেঁচা।

ওরিয়েন্টাল স্কপ্‌স আউল বা লাল পেঁচা। ছবি: কনাদ বৈদ্য।

পুরনো গাছের কোটরে ছানাপোনা নিয়ে ভরা সংসার পেঁচা ও পেঁচানির। কিন্তু নগরায়ণের গুঁতোয় গাছ কাটা পড়ায় আচমকাই ঠিকানাহীন তারা। শহরে রাতারাতি পুরনো বাড়ি ভেঙে উঠছে ফ্ল্যাটবাড়ি। ফলে নতুন বহুতলে আর ঠাঁই হয় না পেঁচা দম্পতির। ইঁদুর-পোকামাকড় খেয়ে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করলেও আপাতত কোণঠাসা এই ‘কৃষকবন্ধু’। কারণ, ঘাসজমিতে থাকা ঘাস পুড়িয়ে সেখানে হচ্ছে চাষ। ফলে বাসস্থান হারাচ্ছে পেঁচারা। এমনকি, জলাভূমিতে মাছ শিকার করার সুযোগও কমছে। কারণ, মাছ ধরতে জলাজমিতে জাল ফেলে রাখছেন মাছচাষিরা। এ ছাড়া, কুসংস্কারের বশে বা পাচার করতে পেঁচা-নিধন তো আছেই। এমনই সব বাধা পেরিয়ে এ রাজ্যে কোথায়, কী ভাবে টিকে রয়েছে এই নিশাচর পাখিরা, তা জানতেই এ বার পেঁচার উপরে সমীক্ষা শুরু করেছেন পক্ষীপ্রেমীরা।

দেশে এই প্রথম কোনও রাজ্যে পেঁচার হাল-হকিকত জানতে সমীক্ষার পথে হাঁটছে রাজ্যের পাখিপ্রেমী সংগঠন বার্ড ওয়াচার্স সোসাইটি। তাদের যোগ্য সঙ্গত করছে ডব্লিউডব্লিউএফ-ইন্ডিয়া ও রাজ্যের বন দফতর। সমীক্ষায় তিনটি প্রজাতির পেঁচার উপরে বিশেষ নজর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে— ব্রাউন ফিশ (ভূতুম), ওরিয়েন্টাল বে এবং ইউরেশিয়ান স্কপ্‌স পেঁচা। সমীক্ষা চলবে মোটামুটি মে মাস পর্যন্ত।

বার্ড ওয়াচার্স সোসাইটির সেক্রেটারি সুজন চট্টোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘দেশে শিকারি পাখিরাই সব চেয়ে দ্রুত হারে কমছে। তবে, দেশের অন্যত্র অন্য শিকারি পাখিদের নিয়ে সমীক্ষা হলেও কখনও পেঁচার খোঁজখবর করা হয়নি। আজকাল চাষের খেতে বিষ খেয়ে মারা যাওয়া ইঁদুর ভক্ষণ করে পেঁচাদের কী দশা হয়, তা জানা নেই। রাতের অন্ধকারে রাজ্যের আনাচকানাচে ঘুরে কোথায়, কোন প্রজাতির পেঁচা বসবাস করে, আর কোথায় পেঁচা নেই— সেই তথ্য এ বারই প্রথম জানা যাবে। এর উপরে ভিত্তি করেই পরবর্তী কালে হয়তো সংরক্ষণের কথাও ভাবা সম্ভব হবে।’’ ডব্লিউডব্লিউএফ-ইন্ডিয়ার শিকারি পাখি সংরক্ষণ বিভাগের প্রধান রাতুল সাহার মতে, ‘‘নিশাচর হওয়ায় এবং লুকিয়ে থাকার প্রবণতার কারণে বিভিন্ন বন্যপ্রাণ পর্যবেক্ষণে এত দিন উপেক্ষিত থেকেছে পেঁচারা। তবে এদের সংখ্যা হ্রাস পেয়ে থাকলে তা বড় কোনও বাস্তুতান্ত্রিক সমস্যার দিকেই ইঙ্গিত করে। এই সমীক্ষার মাধ্যমে ভবিষ্যতে এদের নিয়ে গবেষণা ও সংরক্ষণের পথ খুলে যাবে। পেঁচা নিয়ে জনমনে ভীতি ও ভুল তথ্য সরিয়ে সচেতনতাও বাড়ানো যাবে।’’

সারা দেশে প্রাপ্ত পেঁচার ৩৬টি প্রজাতির মধ্যে ২৩টি প্রজাতিরই দেখা মেলে এই বাংলায়। হিমালয় থেকে সুন্দরবন— সর্বত্রই বিদ্যমান কোটরে পেঁচা থেকে নিমপেঁচা, লক্ষ্মীপেঁচা, কালপেঁচারা। কিছু প্রজাতিকে আবার বিশেষ অঞ্চলেই দেখা যায়। যেমন, হিমালয় ও তার পাদদেশে হিমালয়ান উড, স্পট বেলিড, মাউন্ডেন স্কপ্‌স পেঁচা, সুন্দরবনে বাফি ফিস পেঁচা, পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে হুতোম পেঁচা প্রমুখ। তবে লক্ষ্মীপেঁচা, ভূতুম পেঁচা, শর্ট ইয়ার্ড, লং ইয়ার্ড পেঁচার মতো কিছু প্রজাতি বণ্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইনের তফসিলি ১ গোত্রের অন্তর্ভুক্ত।

কী ভাবে হবে সমীক্ষা? ওই সংগঠনের সদস্য ও চিকিৎসক কনাদ বৈদ্য জানাচ্ছেন, ইতিমধ্যেই রাজ্যকে ১০টি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। সেখানে তিন কিলোমিটার অন্তর প্রায় ১০০টি পয়েন্ট চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে সূর্যান্তের পরে টানা ১৫ মিনিট ধরে পেঁচার খোঁজ চালাবেন পাখিপ্রেমী সমীক্ষকেরা। দলনেতার নেতৃত্বে ও নিয়ম-নীতি মেনে পেঁচার ‘কল’ বাজিয়ে সেখানে কোনও পেঁচা আদৌ আছে কিনা, থাকলে সেই সংক্রান্ত নানা তথ্য ও ছবি নথিভুক্ত করতে হবে ই-বার্ড পোর্টালে। এ জন্য বাদ যাবে না রাজ্যের সুরক্ষিত ও অরক্ষিত এলাকাগুলিও। জঙ্গল, ঘাসজমি, জলাজমি, চাষের খেত থেকে শহরতলি বাবড় শহর— পেঁচার খোঁজে আগামী দিনে এলাকা চষে ফেলবেন পাখিপ্রেমীরা।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

survey Bird

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy