Advertisement
E-Paper

‘কষিয়ে থাপ্পড় মেরেছে সুপ্রিম কোর্ট’! এসআইআর-নির্দেশের পরে কমিশন এবং বিজেপিকে অভিষেকের তোপ: খেলা শেষ

অভিষেক সভাম়ঞ্চে ওঠেন দুপুর সওয়া ২টো নাগাদ। তার ঠিক আগেই ভোটারদের শুনানি নিয়ে নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। অভিষেকের কথায়, তৃণমূলের দাবিই মান্যতা পেয়েছে আদালতের ওই নির্দেশে।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৭:৪২
সোমবার উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

সোমবার উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।

তৃণমূল কংগ্রেসের দাবিকেই সোমবার মান্যতা দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে শীর্ষ আদালতের নির্দেশের পর এমনই দাবি করলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নির্বাচন কমিশন এবং বিজেপির আঁতাত-তত্ত্ব উস্কে দিয়ে তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ বলেছেন, “যারা বাংলার মানুষের মৌলিক অধিকার, ভোটাধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছে, তাদের দু’গালে দুটো কষিয়ে থাপ্পড় মেরেছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত!”

সোমবার উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতে সভা ছিল তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের। কাছারি ময়দানের মঞ্চে অভিষেক যখন ওঠেন, তখন ঘড়িতে প্রায় সওয়া ২টো। তার কিছু ক্ষণ আগেই এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ প্রকাশ্যে এসেছে। দেশের শীর্ষ আদালত জানিয়ে দিয়েছে, তথ্যগত অসঙ্গতির (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) তালিকা প্রকাশ করতে হবে কমিশনকে। প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েত অফিস, ব্লক অফিস এবং ওয়ার্ড অফিসে প্রকাশ্যে ওই তালিকা টাঙাতে হবে।

সভামঞ্চে উঠে প্রথমেই সুপ্রিম কোর্টের সেই নির্দেশ নিয়ে কমিশন এবং বিজেপিকে তোপ দাগেন অভিষেক। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের কথা উল্লেখ করে বলেন, “বিজেপির এসআইআর-এর খেলা শেষ।” যে ভোটারদের তথ্যগত অসঙ্গতি রয়েছে, সেই তালিকা প্রকাশের দাবি আগে থেকেই তুলে আসছিল তৃণমূল। বারাসতের সভায় অভিষেক বলেন, “আজ এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি ছিল। দলীয় ভাবে তৃণমূল সেই মামলা ফাইল করেছে।” বিজেপির ‘সহযোগী’ বলেও তিনি আক্রমণ শানান কমিশনকে। নথিপত্র ঠিক থাকার পরেও গত দুই-আড়াই মাস ধরে গরিব এবং বয়স্কদের নাম ভোটার তালিকা থেকে গায়ের জোরে বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বলেও অভিযোগ তোলেন অভিষেক।

গত ৩১ ডিসেম্বর দিল্লিতে গিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দেখা করেন অভিষেক। সঙ্গে ছিল তৃণমূলের প্রতিনিধিদলও। সেই জ্ঞানেশ-সাক্ষাতের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তৃণমূলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা বলেন, “আমাদের দাবি ছিল, লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির নামে যে ১ কোটি ৩৫ লক্ষ মানুষকে হেনস্থা করা হচ্ছে, সব কিছু ঠিক থাকার পরেও হিয়ারিং নোটিস পাঠানো হচ্ছে, তাঁদের তালিকা প্রকাশ করুন। কমিশন বলেছিল, আমরা তালিকা প্রকাশ করব না। কারণ, তালিকা প্রকাশিত হলে এদের খেলাটা ধরা পড়ে যেত।”

এসআইআর-এর শুনানিকেন্দ্রে যাতে তৃণমূলের বুথস্তরের এজেন্ট (বিএলএ-২)-রা থাকতে পারেন, সেই দাবিও তুলেছিল তৃণমূল। সোমবার শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, কোনও ভোটার চাইলে প্রতিনিধির মাধ্যমে নথি জমা দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যের পাশাপাশি বিএলএ-ও সেই প্রতিনিধি হতে পারেন। তবে এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভোটারের অনুমতিপত্র থাকতে হবে। শুনানিকেন্দ্রে বিএলএ-দের উপস্থিতি নিয়েও বারাসতের সভা থেকে মন্তব্য করেন অভিষেক। বলেন, “ওরাল মেনশন চলাকালীন বিচারপতিরাও বলেছেন বিএলএ-২ থাকবেন।”

অভিষেক আরও জানান, বিএলএ-২ সংক্রান্ত এই দাবি তৃণমূল আগেই জানিয়েছিল কমিশনকে। কিন্তু ওই সময়ে কমিশন তাদের বলে দিয়েছিল, বিএলএ-২ থাকবেন না শুনানিকেন্দ্রে। কমিশনের ওই আপত্তি প্রসঙ্গে অভিষেক বলেন, “আমরা তখন বলেছিলাম, তা হলে নির্দেশিকা জারি করুন। নির্দেশিকা জারি না হলে তৃণমূল কংগ্রেস শুনানিকেন্দ্র ছাড়বে না।” তাঁর কথায়, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ আসলে বাংলার সাধারণ মানুষের জয়। বিজেপি এবং কমিশনের আঁতাতের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, “এক কোটি মানুষকে বেছে বেছে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেবে বলেছিল। এই জয় সেই খেটে খাওয়া মানুষের জয়, বাংলার জয়, মা মাটি মানুষের জয়।”

বিজেপিকে আক্রমণ শানিয়ে অভিষেকের প্রশ্ন, “কার ক্ষমতা বেশি মোদীজি? দশ কোটি মানুষ, না বিজেপির জমিদার? আজ কোর্টে হারালাম, এপ্রিলে ভোটে হারাব। তৈরি থাকো।” তিনি আরও বলেন, “আমরা যে দাবিগুলি নিয়ে সংসদের ভিতরে, বাইরে, জনসভায় সরব হয়েছিলাম, সেই দাবিকে মান্যতা দিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। বলেছে, শুধু লিস্ট রিলিজ়ই হবে না, গ্রাম পঞ্চায়েত ধরে ধরে তালিকা টাঙাতে হবে। আমরা তো এটাই চেয়েছিলাম। বিজেপি ভেবেছিল যারা এদের ভোট দেয় না, যারা এদের হারিয়েছে, তাদের জব্দ করবে। সেই কারণে এক কোটি মানুষকে রাজ্যের ভোটার তালিকা থেকে পরিকল্পিত ভাবে মোদী সরকার এবং কমিশন বাদ দিতে চেয়েছিল।”

বারাসতের সভায় অভিষেকের প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার বক্তৃতায় বড় অংশ জুড়েই ছিল সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ এবং বিজেপি-কমিশন আঁতাতের অভিযোগ। পাশাপাশি বিজেপিশাসিত রাজ্যে বাংলাভাষীদের উপরে অত্যাচার, ধর্মীয় মেরুকরণের অভিযোগ নিয়েও মোদী-শাহদের নিশানা করেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। একই সঙ্গে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের জন্য উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় তৃণমূলের লক্ষ্যও স্থির করে দেন তিনি।

উত্তর ২৪ পরগনায় ৩৩-০ করার ডাক

আগামী বিধানসভা ভোটে উত্তর ২৪ পরগনায় সবগুলি আসনে জোড়াফুল ফোটাতে হবে। বারাসতের সভা থেকে তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকদের জন্য সেই লক্ষ্যই বেঁধে দিলেন অভিষেক। জানিয়ে দিলেন, ৩৩-০ করতে হবে। এবং তার জন্য লড়াই করতে হবে একেবারে বুথ স্তর থেকেই। অভিষেকের কথায়, “বিধানসভা ধরে ধরে নয়, বুথ ধরে ধরে বিজেপিকে শিক্ষা দিতে হবে। বহিরাগতদের কোনও জায়গা পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে নেই।” উত্তর ২৪ পরগনার ভোট রাজনীতিতে মতুয়া সম্প্রদায় বরাবরই আলোচিত, যাদের একটি বড় অংশ থাকে বনগাঁয়। সোমবারের সভা থেকে সেই বনগাঁবাসীদের উদ্দেশে অভিষেক বলেন, “বিজেপি গত ১০ বছর ধরে আপনাদের নাগরিকত্বের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে।” এরপরেই অভিষেক বলেন, “এরা যে ভাষায় বোঝে সেই ভাষাতেই জবাব দিতে হবে। ভোটের আগে টাকা দিতে আসবে। টাকা নিয়ে নেবেন। এই টাকা আপনার। এই টাকা বিজেপির পৈতৃক সম্পত্তি নয়। এদের আশ্বস্ত করে বলবেন ভোট বিজেপিকেই দেব। তার পরে যে ভাবে নোটবন্দির আপনাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে হেনস্থা করেছে, সেই ভাবেই জবাব দেবেন। পদ্মফুলের নেতারা যেন চোখে সরষে ফুল দেখেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। এই নির্বাচন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার মুখ্যমন্ত্রী করার বা তৃণমূলকে আবার ক্ষমতায় আনার নির্বাচন নয়, এই নির্বাচন বিজেপিকে শাস্তি দেওয়ার নির্বাচন। বিজেপিকে শিক্ষা দেওয়ার নির্বাচন।”

বিজেপি ৫০-এর নীচে নামবে

অভিষেকের কথায়, আসন্ন নির্বাচনে তৃণমূলের ২৫০-টিরও বেশি আসনে জয়ী হবে। বিজেপির আসনসংখ্যা কমে ৫০-এর নীচে নেমে যাবে বলেও প্রত্যয়ী অভিষেক। তাঁর মতে, বিধানসভায় বিজেপির আসন যদি ৫০টির নীচে নেমে আসে, তা হলে এক বছরের মধ্যে কেন্দ্রেও আর বিজেপির সরকার থাকবে না। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক বলেন, “বিজেপি যে দিন কেন্দ্র বিদায় নেবে, তার এক মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ২ লক্ষ কোটি টাকা বকেয়া পাওনা নিয়ে আসব।” তিনি আরও বলেন, “আমরা সবাই আইনকে শ্রদ্ধা করি। গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি। কিন্তু যেখানে যেখানে এরা বেশি লাফালাফি করবে, শান্তি সম্প্রীতি শৃঙ্খলা বজায় রেখে এ বার রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঙ্গে একটু ডিজেও বাজবে। তবে কেউ শালীনতার গন্ডি পেরোবেন না।”

‘প্রধানমন্ত্রীর সভায় সেবাশ্রয়ের গান’

রবিবার হুগলির সিঙ্গুরে সভা করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। তৃণমূলের তরফে দাবি করা হচ্ছে, ওই সভায় নাকি সেবাশ্রয়ের গানও চলেছে। সোমবার তা নিয়েও বিজেপিকে নিশানা করেন অভিষেক। তিনি বলেন, “ কাল দেখছি প্রধানমন্ত্রীর সভায় সেবাশ্রয়ের গান চলছে। সব এলোমেলো। পাগল হয়ে গিয়েছে। এত কিছু করেও বাংলায় কিছু করতে পারছে না। বিয়ের আয়োজন করে বর আর বউ নেই। সব আছে, শুধু বাংলার ১০ কোটি মানুষ নেই।”

বাংলাভাষীদের হেনস্থা

সাম্প্রতিক সময়ে বিজেপিশাসিত বিভিন্ন রাজ্যে পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকেরা হেনস্থার শিকার হয়েছেন। শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্যই তাঁদের হেনস্থা করা হয়েছে বলে অভিযোগ। গত কয়েক মাসে দিল্লি, হরিয়ানা, ওড়িশা, মহারাষ্ট্র-সহ বিভিন্ন বিজেপিশাসিত রাজ্যে এমন অভিযোগ উঠে এসেছে। সোমবারের সভা থেকে ফের তা স্মরণ করিয়ে দেন অভিষেক। বিজেপিকে বিঁধে তিনি বলেন, “বাংলায় কথা বললেই আমাদের বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিজেপির নেতারা বলছে বাংলা বলে কোনও ভাষাই নেই, বাংলাদেশি ভাষা। তাই নাকি! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তা হলে কী ভাষায় কবিতা লিখতেন?” সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যে সংসদে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে ‘বঙ্কিমদা’ বলে সম্বোধন করেছিলেন, তা-ও উল্লেখ করেন অভিষেক। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের কথায়, “ওড়িশা, গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, ছত্তীসগড়, দিল্লিতেও বাংলায় কথা বলার জন্য পুশ ব্যাক করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। আমাদের বলেছিল বাংলাদেশিদের স্বর্গরাজ্য। এসআইআর-এর খসড়া তালিকা যখন প্রকাশিত হল, তখন দেখা গেল সবচেয়ে কম নাম বাদ গিয়েছে বাংলায়। সবচেয়ে বেশি নাম বাদ গিয়েছে উত্তরপ্রদেশ এবং গুজরাতে। যারা আমাদের ভাষাকে অস্বীকার করে, তাদের জবাব দিতে হবে। সব বুথে জোড়াফুল ফোটাতে হবে।”

Abhishek Banerjee TMC SIR BJP Election Commission West Bengal Politics
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy