সর্ষের মধ্যেই বাসা বেঁধে থাকা ‘ভূত’-কে কিছুতেই বোতলবন্দি করতে পারছিলেন না রাজ্য দুর্নীতিদমন শাখা (এসিবি)-র অফিসারেরা। সেই সুযোগটা করে দিলেন দুর্নীতিতে অভিযুক্ত এক পদস্থ বনকর্তাই।
কাজটা সহজ ছিল না। কারণ, ‘ভূত’ বলে যাঁর দিকে অভিযোগের আঙুল উঠছিল, সেই শুভাশিস চক্রবর্তী নিজেই দুর্নীতিদমন শাখার ডিএসপি! তাঁকে বহু চেষ্টা করেও ফাঁদে ফেলা যায়নি। তক্কে তক্কে ছিল দফতর। অবশেষে শনিবার যে ভাবে তিনি ধরা পড়লেন, তা যেন রুপোলি পর্দার ছবি!
বনকর্তা অলঙ্কারকুমার ঝা-র বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত করছিলেন শুভাশিস চক্রবর্তী। ডানলপের কাছে একটি হোটেলে অলঙ্কার ও শুভাশিস দেখা করবেন এবং সেখানে টাকার ‘লেনদেন’ হবে, এ খবরটা আগেভাগে চলে এসেছিল দুর্নীতিদমন শাখার কর্তাদের কাছে। এসিবি সূত্রের বক্তব্য, সেই খবরের ভিত্তিতে হোটেলের ভিতরে কয়েক জন সোর্সকে রাখা হয়। দু’জনের ছবিও তাদের দেওয়া হয়। হোটেলের বাইরে, কিছুটা দূরে এক জায়গায় অপেক্ষা করছিলেন গোয়েন্দারা। সূত্রের খবর, প্রথমে হোটেলে পৌঁছে ভিতরের রেস্তোরাঁয় যান শুভাশিসবাবু। তখনও অলঙ্কার হোটেলে পৌঁছননি। রেস্তোরাঁয় কিছুক্ষণ থেকে বেরিয়ে আসেন শুভাশিসবাবু। একটু পরে এক মহিলাকে সঙ্গে নিয়ে হোটেলের রেস্তোরাঁয় পৌঁছন অলঙ্কার। তাঁদের পিছু পিছু সেখানে ঢোকেন শুভাশিসবাবু।
ঠিক যেন সিনেমা! রেস্তোরাঁয় প্রথমে আলাদা আলাদা টেবিলে বসেছিলেন দু’জনে। এ দিক সে দিক দেখে একটু পরেই শুভাশিসবাবু উঠে গিয়ে অলঙ্কারের পাশে বসেন। পকেট থেকে একটি কাগজ বের করে অভিযুক্ত বনকর্তাকে দেন। এই ‘ব্রাহ্ম’ মুহূর্তের অপেক্ষাতেই ছিলেন গোয়েন্দারা। ভিতরে থাকা সোর্সদের ইঙ্গিত পেয়ে রেস্তোরাঁয় হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়েন তাঁরা। সোজা গিয়ে দাঁড়ান টেবিলের সামনে।
নিজের দফতরের যে অফিসারেরা এত দিন তাঁকে ‘স্যার’ বলে স্যালুট ঠুকতেন, তাঁরাই বুক চিতিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে! এসিবি সূত্রের খবর, বিপদ বুঝে শুভাশিসবাবু প্রথমে সপ্রতিভ হওয়ার চেষ্টা করলেও তা স্থায়ী হয়নি। ওই দলে শুভাশিসবাবুর সিনিয়র অফিসারও ছিলেন। তা ছাড়া টেবিলের উপরে সেই সময়ে পড়ে থাকা একটি প্যাকেটে ছিল নগদ ২ লক্ষ ৪৮ হাজার টাকা। ওই টেবিলে বসেই ‘টাকার বিনিময়ে’ শুভাশিসবাবু অলঙ্কারের হাতে মামলার নথি তুলে দিচ্ছিলেন বলে এসিবি সূত্রের অভিযোগ।
বিভিন্ন দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্তেরা তদন্তের গোপন তথ্য পেয়ে যাচ্ছেন, কখনও কখনও আলগা হচ্ছে মামলার রাশ— এমনই নানা অভিযোগ পাচ্ছিলেন দফতরের শীর্ষকর্তারা। অভিযুক্তকে হেফাজতে নিয়েও জেরা না করায় আদালতে এসিবি-র মুখ পুড়েছে, এমন নজিরও রয়েছে। এসিবি সূত্রের খবর, এ সব অভিযোগে বারবারই উঠছিল শুভাশিসবাবুর নাম। কিন্তু হাতেনাতে প্রমাণের অভাবে কিছুই করা যাচ্ছিল না। তবে শুভাশিসবাবুর উপরে নজরদারি চলছিল বলে শাখার অফিসারেরা জানিয়েছেন।
এসিবি-র এক অফিসার জানান, দার্জিলিঙের পদ্মজা নায়ডু চিড়িয়াখানার অধিকর্তা থাকার সময় অলঙ্কারকুমার ঝা-র বিরুদ্ধে ওঠা নানা বেনিয়মের অভিযোগের তদন্ত করছিলেন দুর্নীতিদমন শাখার শুভাশিসবাবু। এ হেন অভিযুক্ত ও তদন্তকারী অফিসারের সাক্ষাতের খবর শনিবার দুপুরে পাওয়ার পরেই জাল বিছিয়েছিলেন এসিবি-র কর্তারা। ‘‘শিকারের গন্ধ পেয়েছিলাম আমরা। কারণ, সম্প্রতি অলঙ্কারের বিহারের বাড়িতে দলবল নিয়ে তল্লাশি করতে গিয়েছিলেন শুভাশিসবাবু। অভিযুক্তের সঙ্গে আলাদা করে তাঁর হোটেলে দেখা করতে যাওয়ার উদ্দেশ্য তাই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল,’’ মন্তব্য ওই এসিবি-অফিসারের।
এসিবি-র এক শীর্ষকর্তা বলছেন, সরকারি অফিসারদের দুর্নীতি রুখতেই দুর্নীতিদমন শাখা তৈরি করা হয়েছিল। ‘‘দুর্নীতি আমরা বরদাস্ত করব না, নিজেদের অফিসারকে গ্রেফতার করে সেই বার্তাই দিলাম,’’ মন্তব্য ওই শীর্ষকর্তার। এসিবি সূত্রের খবর, শুভাশিসবাবুর সঙ্গে বাহিনীর আর কোনও অফিসার জড়িত কি না, তা-ও খতিয়ে দেখতে চাইছেন তদন্তকারীরা।
অলঙ্কারকুমার ঝা এবং শুভাশিস চক্রবর্তী, দু’জনকেই রবিবার ব্যাঙ্কশাল আদালতের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট অরবিন্দ মিশ্রের এজলাসে হাজির করা হয়। বিশদে তদন্ত প্রয়োজন এই যুক্তি দেখিয়ে সরকারি কৌঁসুলি তমাল মুখোপাধ্যায় ধৃতদের ১০ দিনের পুলিশি হেফাজতের আর্জি জানান। অলঙ্কারের আইনজীবী দেবাশিস মল্লিকচৌধুরী আদালতে জানান, গোয়েন্দাদের করা এফআইআরে আইনি গরমিল রয়েছে। দুর্নীতিদমন আইনের জন্য বিশেষ আদালতও রয়েছে। রবিবার ছুটির দিন হওয়ায় সেই আদালত বন্ধ ছিল। তাই পুলিশি হেফাজতে না পাঠিয়ে এক দিনের জন্য জেল হেফাজতে পাঠিয়ে আজ, সোমবার ফের শুনানির আর্জি জানান তিনি। বিচারক পাল্টা প্রশ্ন তোলেন, আদালত পুজোর ছুটির জন্য বন্ধ হওয়ার ঠিক আগের দিন এই গ্রেফতারি হলে দেবাশিসবাবু কী বলতেন? সওয়াল-জবাব শেষে বিচারক দু’জনকেই ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
যে দফতরে বসে অধস্তনদের নির্দেশ দিতেন, সেই অধস্তনদের অধীনেই এখন লালবাজার সেন্ট্রাল লকআপে থাকবেন শুভাশিসবাবু!