Advertisement
E-Paper

সাপ বাঁচানোই নেশা দেবাশিসের

ছোট থেকেই অসুস্থ বা আক্রান্ত প্রাণিদের জন্য মন কাঁদত। রাস্তা থেকে অসুস্থ পেঁচা বা কাঠবেড়ালি বাড়িতে এনে শুশ্রুষা করে জঙ্গলে ফিরিয়ে দিতেন স্কুলে পড়ার সময়ে। বড় হওয়ার পরে অবশ্য আগ্রহটা ঘুরে গিয়েছে সাপের দিকে।

অর্পিতা মজুমদার

শেষ আপডেট: ০৩ জুলাই ২০১৬ ০০:৪২
সাপ ধরে ঝুলিতে ভরছেন দেবাশিস মজুমদার। —নিজস্ব চিত্র

সাপ ধরে ঝুলিতে ভরছেন দেবাশিস মজুমদার। —নিজস্ব চিত্র

ছোট থেকেই অসুস্থ বা আক্রান্ত প্রাণিদের জন্য মন কাঁদত। রাস্তা থেকে অসুস্থ পেঁচা বা কাঠবেড়ালি বাড়িতে এনে শুশ্রুষা করে জঙ্গলে ফিরিয়ে দিতেন স্কুলে পড়ার সময়ে। বড় হওয়ার পরে অবশ্য আগ্রহটা ঘুরে গিয়েছে সাপের দিকে। কেউটে, গোখরো, খরিস হোক বা দাঁড়াশ— দুর্গাপুরের ইস্পাতনগরীর দেবাশিস মজুমদারের ঝোলায় দু’চারটে সাপ থাকে সব সময়েই। বেশ কয়েকটি জমে গেলে ছেড়ে আসেন জঙ্গলে।

স্কুলে পড়ার সময়ে ক্লাসঘরে একটি নির্বিষ সাপ বেরিয়েছিল। সহপাঠীরা সেটিকে পিটিয়ে মারার তোড়জোড় শুরু করেছিল। সাপটিকে তাদের হাত থেকে উদ্ধার করে জঙ্গলে ছেড়ে এসেছিলেন দেবাশিস। সেই শুরু। দোকান হোক বা আবাসন, হাসপাতাল বা কারখানা চত্বর— শহরের যেখানেই সাপ বেরোয়, ডাক পড়ে দেবাশিসের। শুধু দুর্গাপুর শহর কেন, অন্ডাল, রানিগঞ্জ, পানাগড়, বাঁকুড়াতেও ছুটে যান তিনি। সাপ ধরে অভিজ্ঞতা বেড়েছে। ২০১০ সালে সর্প বিশেষজ্ঞ দীপক মিত্রের কাছে প্রশিক্ষণও নিয়েছেন।

ইস্পাতনগরীর ঝোপজঙ্গল থেকে মাঝে-মাঝেই সাপ বেরোয়। দেবাশিস জানান, এখানেই বছরে গড়ে একশো থেকে দেড়শো সাপ ধরা পড়ে তাঁর হাতে। সম্প্রতি বি-জোনের রাজেন্দ্রপ্রসাদ রোডের এএসপি আবাসনের দোতলায় ফুট পাঁচেক লম্বা গোখরোর দেখা যায়। দেবাশিসবাবু গিয়ে সেটি এনে সামনের মাঠে নেমে বস্তাবন্দি করেন। তা দেখতে ভিড় জমিয়েছিলেন অনেকে। তাঁদের সবাইকে তিনি বলেন, ‘‘সাপ মারবেন না। বিরক্ত বা আঘাত না করলে সাপ কখনও ছোবল দেয় না।’’

Advertisement

দেবাশিসবাবুর আক্ষেপ, সাপ দেখলেই আতঙ্কিত হয়ে মেরে ফেলেন মানুষজন। কিন্তু তাতে যে বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি, তা কেউ ভাবেন না। তাঁর কথায়, ‘‘সাপ না থাকলে ইঁদুর বাড়বে। ইঁদুর চাষের ফসল খেয়ে ফেলবে। উৎপাদন কম হবে। চাষের ক্ষতি হবে, চাষিরও।’’ বছরে কয়েক বার শহরে সাপ নিয়ে সচেতনতা শিবির আয়োজন করেন তিনি। সিটি সেন্টারের ননকোম্পানি এলাকার বাসিন্দা শ্রীধর মল্লিক বলেন, ‘‘আমার বাড়িতে এখনও পর্যন্ত দু’বার সাপ বেরিয়েছে। দু’বারই দেবাশিস এসে নিয়ে গিয়েছেন।’’

বছর চল্লিশের দেবাশিসবাবু পেশায় ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। তবে সাপ ধরার নেশায় সেই কাজের সময় কম পড়ে যায়। সাপ ধরতে গেলে যাতায়াতের খরচও আছে। তাই যাঁর বা়ড়িতে সাপ ধরতে যান তাঁর কাছে দু’শো টাকা চেয়ে নেন। কেউ দেন, কেউ দেন না। অনেকে কম টাকা দেন। দেবাশিসবাবু বলেন, ‘‘জোর করি না। তাহলে আমাকে খবর না দিয়ে সাপটাই মেরে ফেলবে। তবু বোঝাই, আমাকেও তো চালাতে হবে!’’ সাপ ধরে নানা অভিজ্ঞতাও হয়েছে তাঁর। দেবাশিস বলেন, ‘‘এক বার সাপ ধরে ফেরার সময়ে একটি স্টেশনে চা খাচ্ছিলাম। সাপের ব্যাগ পাশে নামিয়ে রেখেছি। সুযোগ বুঝে ব্যাগটি ছিনতাই করে এক জন। কিন্তু খানিক দূর যেতেই ভিতর থেকে সাপ ফোঁস করেছে। ব্যাগ ফেলে পালায় সেই ছিনতাইকারী!’’

দিন হোক বা রাত, সাপ বেরিয়েছে খবর পেলেই বেরিয়ে পড়েন দেবাশিস। সঙ্গী পুরনো স্কুটার, কয়েকটি ঝোলা এবং সাপ ধরার যন্ত্রপাতি। দেবাশিস বলেন, ‘‘ডাক পেলেই সব কাজ ভুলে ছুটতে হয়। সাপ তো আর বসে থাকবে না।’’ সাপ ছাড়তে যান কাঁকসার জঙ্গলে। তবে সাপ ধরেই যেতে পারেন না, তাতে জ্বালানি খরচ হয় বেশি। তাই বস্তায় ভরে বাড়িতেই রাখেন। বেশ কয়েকটি সাপ ধরা হলে এক সঙ্গে ছেড়ে আসেন। একা এখন আর সামলাতে পারেন না। তাই সাপ ধরার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন অমিত দে, সত্যজিৎ মণ্ডল, বিশ্বজিৎ রায়দের মতো কিছু যুবককে।

গোড়ায় বাধ সাধলেও ছেলের এই কাজে এখন উৎসাহই দেন দেবাশিসবাবুর মা নমিতাদেবী। তিনি বলেন, ‘‘চিন্তা তো হয়ই। তবে ছেলের উৎসাহ দেখে না বলতে পারি না।’’

save snakes Debasish
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy