চলছে চিঁড়ে-জিরে তৈরির প্রস্তুতি। নিজস্ব চিত্র।
চিঁড়ে-জিরে, এলোঝেলো আর পদ্ম চিনি— হাতে গড়া এই তিন মিষ্টি ছাড়া দেবীর নৈবেদ্য অসম্পূর্ণ। তাই মহালয়ার দিন থেকেই কোমর বেঁধে নেমে পড়েছেন বর্ধমান শহরের পিলখানা রোডের সেন বাড়ির বধূরা।
বাড়ির প্রবীণেরা জানান, ঘর ছেড়ে আসতে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বিশেষ নাড়ু, মুড়কিতেই ও পার বাংলার রেওয়াজ ধরে রেখেছেন তাঁরা। বাড়ির মেয়ে-বউরাও বলেন, ‘‘হাতে গ়়ড়া এই তিন মিষ্টি ভোগে না থাকলে মায়ের মুখটা কেমন ভার হয়ে যায়।’’
পুরনো জমিদারি বাড়ির ধাঁচে তৈরি পিলখানা রোডের এই বাড়ি। এই মূহূর্তে পরিবারের সদস্য সংখ্যা ১৩০। সারা বছর একসঙ্গে না হলেও পুজোর সময় দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাইয়ে ছড়িয়ে থাকা ছোট-বড় সদস্যেরা হাজির হয়ে যান বর্ধমানে। ষষ্ঠী থেকে একাদশী পর্যন্ত একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, পুজোর দালানে পরিবারের লোকেদের নাচ-গানের আসরে গমগম করে ওঠে বাড়ি। নতুন প্রজন্মের এক সদস্য জয়রঞ্জন সেন বলেন, ‘‘সবাই মিলে একসঙ্গে থাকা, খাওয়া, আনন্দ করাটাই তো যৌথ পরিবারের রীতি ও ঐতিহ্য। আমরা সেটাই বহন করে নিয়ে যাচ্ছি।”
তাঁরাই জানান পুজো শুরুর কথা। তখন ও পার বাংলার যশহর জেলার কালিয়াভোগে জাঁককমক করে দুর্গাপুজো হতো। কিন্তু দেশভাগের পরে পুজো বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের এ পার বাংলার থাকা সদস্যেরা পুজো শুরু করেন বর্ধমানে। ১৯৪৮-৪৯ সালে আইনজীবী ভামিনীরঞ্জন সেনের হাত ধরে শুরু হয় পুজো। সেন বাড়ির সদস্যদের দাবি, পূর্ববঙ্গের সময় থেকে ধরলে পুজোর বয়স এখন দেড়শো পার। দু’বার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুও এ বাড়িতে পা রেখেছিলেন বলে তাঁদের দাবি। পুরনো ঐতিহ্য মেনে একচালার প্রতিমা সাজেন ডাকের সাজে। মা ব্রহ্মময়ীদেবীর নামে যে দেবত্তর তহবিল তৈরি করে গিয়েছিলেন ভামিনীরঞ্জনবাবু সেই ট্রাস্ট থেকেই পুজোর খরচ চলে।
তবে পুজোর নিয়মকানুনের থেকেও এই বাড়ির আকর্ষণ দেবীর ভোগে। পরিবারের প্রবীণ সদস্য সলিল সেন, সুশান্তরঞ্জন সেনরা জানান, দেবীর নৈবেদ্যে নারকেলের তৈরি চিঁড়ে জিরে, এলোঝেলো ও পদ্ম চিনি থাকতেই হবে। তাই মহালয়ার দিন থেকে ঠাকুর দালানেই সেন বাড়ির ৮-১০ জন বধূ নারকেলের ওই মিষ্টি তৈরি করতে শুরু করে দিয়েছেন। এ ছাড়াও দুর্গার জন্য তৈরি হয় জিভে গজা, গজা, মন্ডা। আর চিরাচরিত নারকেল নাড়ু তো থাকেই। বাড়ির বধূ মিতালি সেন, নিবেদিতা সেনরা বলেন, “দেবীর নৈবেদ্যে নারকেল ও চিনির রসে তৈরি এই মিষ্টি দেওয়াটা পূর্ববঙ্গের রেওয়াজ।”
তবে শুধু নৈবেদ্যেই শেষ নয়। পুজোর চারটে দিন রকমারি ভোগেরও আয়োজন হয়। প্রথম তিন দিন পোলাও, খিচুড়ি, পায়েস দিয়ে নিরামিশ রান্না। বিদায়ের আগে মেয়ের জন্য মাছ-ভাত। সমিতাদেবী, কেয়াদেবীরা জানান, দেবীকে মাছ দেওয়া হলেও তা রান্না করা হয় পেঁয়াজ-রসুন ছাড়া।
ভোগের রেসিপি
চিঁড়ে-জিরে: নারকেল ছুরি দিয়ে কেটে নেওয়া হয়। তারপরে ধীরে ধীরে পাতলা করে কেটে চিঁড়ের আকারে আনা হয়। এর সঙ্গে মেশানো হয় নারকেল কোরা। মেশানো হয়ে গেলে পরিমাণ মতো চিনি মাখিয়ে জল দিয়ে হালকা আঁচে ফোটানো হয়। জল শুকিয়ে গেলে নামিয়ে নিলেই তৈরি চিঁড়ে-জিরে।
পদ্ম চিনি: এতেই নারকেল মাস্ট। নারকেল কোরায় চিনি দিয়ে হালকা আঁচে ভাজতে হয়। অনেকটা ঝুরোঝুরো হয়ে গেলে নামিয়ে নিতে হয়। ঠান্ডা হলেই তৈরি পদ্ম চিনি।