চাষিদের সম্মতিপত্র আগেই মিলেছে। জনা সত্তর জমি মালিকের সঙ্গে প্রাথমিক ভাবে চুক্তিও হয়ে গিয়েছে। সব ঠিক থাকলে এ বার নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ কিংবা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে জমি কিনতে নামবে এনটিপিসি। সংস্থার কর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় ১৯৭ একর জমি চাষিদের কাছ থেকে ৬টি পর্যায়ে কেনা হবে। জমি কেনার জন্য ৪২ কোটি টাকা মঞ্জুর হয়েছে বলেও জানা গিয়েছে।
দীর্ঘ টালবাহানার পরে কাটোয়ায় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির জন্য চাষিদের কাছ থেকে সরাসরি জমি কেনার বিজ্ঞপ্তি জারি করে এনটিপিসি। নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরেও আপত্তি জানানো তো দূর, যাঁরা একটু বুঝেশুনে এগোতে চাইছিলেন, সেই সব চাষিও সংস্থার নিয়োগ করা আইনজীবীদের কাছে জমির নথিপত্র জমা দিয়েছেন বলে এনটিপিসির কর্তাদের দাবি। এনটিপিসির কাটোয়া দফতরের আইনজীবী পরাগ বন্দ্যোপাধ্যায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছিলেন, তাঁর মক্কেল এনটিপিসি বর্ধমান জেলার কাটোয়ার শ্রীখণ্ডে সুবৃহৎ তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের জন্য দলিল/পরচার ভিত্তিতে সরাসরি জমি কিনতে ইচ্ছুক। চুরপুনি মৌজার ৫৩টি প্লট, শ্রীখণ্ড ও কোশিগ্রাম মৌজার একটি করে প্লট কেনা হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। পরাগাবাবু বলেন, “জমি দেবে না বলে কোনও আপত্তি জমা পড়েনি। বরং যে সব চাষি সন্দিহান ছিলেন, তাঁরাও আনন্দের সঙ্গে জমির নথিপত্র পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করার জন্য আবেদন করে গিয়েছেন।”
এক দিকে, জমি কেনার জন্য পরিচালন পর্ষদ অনুমতি দিয়েছে, আর এক দিকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি রাজ্য সরকারের তরফেও ১৯৭ একরের বেশি জমি কেনার অনুমোদন (১৪ ওয়াই) পেয়েছে এনটিপিসি। ফলে আর দেরি করতে রাজি নয় সংস্থা। সংস্থার কাটোয়া প্রকল্পের কর্তা (মানবসম্পদ) বিনয় প্রকাশ শ বলেন, “জমি কেনার জন্য শেষ পর্যায়ে প্রস্তুতি চলছে। আশা করছি এ মাসের শেষ সপ্তাহ কিংবা ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে চাষিদের কাছ থেকে সরাসরি জমি কিনতে পারব।” সংস্থা সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রথম পর্যায়ে ৩৫০ জন চাষির কাছ থেকে ৫৫টি প্লটের ২৭ একর জমি কেনা হবে। সংস্থার এক কর্তা জানান, ৬টি পর্যায়ে জমি কেনা হবে বলে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মাসে এক একটি পর্যায়ের জমি কেনা হবে। প্রথম পর্যায়ে হাতে থাকা ৫৫৬ একর লাগোয়া জমি কেনা হবে বলেও তাঁর দাবি। পরবর্তীতে দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৩৪টি প্লট থেকে ৫৪ একর, তৃতীয় পর্যায়ে ৯৭টি প্লট থেকে ৩৮ একর, চতুর্থ পর্যায়ে ৫৯টি প্লট থেকে ৩২ একর জমি কেনা হবে। শেষ দুটি পর্যায়ে পাইপ লাইনের জন্য জমি কিনবে এনটিপিসি। মোট ১৪২৮ জন চাষির কাছ থেকে জমি কেনা হবে। প্রথম পর্যায়ে চাষিদের নথিপত্র তৈরি করা হয়ে গিয়েছে বলেও এনটিপিসির কর্তাদের দাবি।
সংস্থা সূত্রে জানা গিয়েছে, শ্রীখণ্ড ফিল্ড অফিসে শিবির করে জমি কেনা হবে। জমির দাম চেকে দেওয়ার পাশপাশি ওই দিনই এনটিপিসির নামে জমি রেজিস্ট্রি করে দেবেন চাষিরা। শিবিরে জমি নিবন্ধীকরণ দফতরের আধিকারিকরা যাতে উপস্থিত থাকেন সে জন্য কাটোয়ার মহকুমাশাসকের কাছেও আবেদন করবেন এনটিপিসির কর্তারা। তাঁদের দাবি, সর্বদলীয় বৈঠকে যে পদ্ধতিতে জমি কেনার সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেই পদ্ধতি মেনেই জমি কেনা হবে।
এনটিপিসি সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি একর প্রতি জমির মূল দাম ঠিক হয়েছিল ৮ লক্ষ ৫৮ হাজার ২০৪ টাকা। তার সঙ্গে প্রতি বছর ১২ শতাংশ করে নভেম্বর মাস পর্যন্ত সুদ দেওয়া হবে। এ ছাড়াও মূল দামের সঙ্গে যোগ হবে ৩০ শতাংশ ক্ষতিপূরণ। বাম আমলে অধিগৃহীত ৫৫৬ একর জমির নিয়ম মেনেই বর্গাদারদের ২৫ শতাংশ ক্ষতিপূরণ দেবে এনটিপিসি। সংস্থার এক কর্তা বলেন, “হিসেব কষে দেখা গিয়েছে একর প্রতি জমির দাম পড়বে প্রায় ১৯ লক্ষ টাকার কাছাকাছি। জমি-মালিকেরাও ওই দামেই জমি বিক্রি করতে ইচ্ছুক।”
তবে জমি সঙ্কট কাটতে চললেও বিদ্যুৎ তৈরির কয়লা কোন খনি থেকে আসবে তা এখনও নিশ্চিত নয়। ফলে পরিবেশ সংক্রান্ত জনশুনানি হওয়ার পরেও তার ছাড়পত্র পাওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় দফতরে আবেদন করতে পারছে না এনটিপিসি। সংস্থার এক কর্তা বলেন, “রাজ্যের আবেদনের ভিত্তিতে কয়লা মন্ত্রক এখনও কিছু জানায়নি। ফলে আমরা পরিবেশ মন্ত্রক দফতরে আবেদন করতে পারছি না।” পরিবেশ সংক্রান্ত আবেদন করতে পারছে না বলে কাটোয়া প্রকল্প নিয়ে গ্লোবাল টেন্ডারও নতুন করতে ডাকতে পারছে না এনটিপিসি। এই প্রকল্পের জন্য এনটিপিসি প্রায় দশ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে।