কোথাও তাঁতের শাড়ি তৈরির পরে পড়ে থাকা অংশ, কোথাও আবার চাল, ফল এমনকী, ভুট্টা দিয়েও তৈরি হয়েছে প্রতিমা।
আবার কোথাও প্লাস্টিকের বোতল, বাঁশ, বেত, কিংবা বালি দিয়েও সেজেছে মণ্ডপ। এককথায়, কালনায় এ বার আক্ষরিক অর্থেই বাহারি বাণী-বন্দনা।
শহরের মতোই শহর লাগোয়া বিভিন্ন পুজো মণ্ডপেও এ বার বিভিন্ন থিম নজর কাড়ছে। কোথাও ঐতিহ্যকে ফিরে দেখা, কোথাও আধুনিকতাকে দেখানোর চেষ্টা। দর্শক টানতে একে অপরকে টেক্কা দিতে তৈরি কালনার বিভিন্ন ক্লাব।
শহর থেকে কিছু দূরের হাটকালনা পঞ্চায়েতের রংপাড়া দক্ষিণ এলাকার মণ্ডপের থিম এবার তাঁত শিল্প। কয়েক হাজার রঙিন বোবিন দিয়ে সেজে উঠেছে মণ্ডপটি। ভিতর থাকছে বিভিন্ন মডেল। এই সব মডেলের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সুতো রং করা, গোটানো, তাঁত বোনার পদ্ধতি, সুতোর দোকান, বাজারে কীভাবে বিক্রি হয় তাঁতের জিনিস ইত্যাদি। এর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে নানা ধরনের তাঁত যন্ত্র। মূর্তি তৈরি হয়েছে তাঁতের শাড়ির ফেলে দেওয়া টুকরো থেকে। মূর্তিটি তৈরি করেছেন এলাকারই শিল্পী লক্ষ্মণ বারুই। এই সবের পাশাপাশি কাপড় তৈরির পর পড়ে থাকা সুতোর কুচো দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছেন গ্রামের বিভিন্ন টুকরো ছবি। লক্ষ্মণবাবু জানান, কালনার তাঁত শিল্প সারা রাজ্যে বিখ্যাত। সেই তাঁত শিল্পকে তুলে ধরতেই ক্লাবের তরফে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁত শিল্পের ঐতিহ্যের পাশাপাশি রুগ্ন হয়ে পড়া এই শিল্প কী ভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সে বার্তাও থাকবে বলে দাবি মণ্ডপ শিল্পীদের।
বরাবরই নতুনত্বের ছোঁয়া থাকে লিচুতলা এলাকার সমাপ্তি সঙ্ঘের প্রতিমা তৈরিতে। উদ্যোক্তারা জানান, এর আগের বছরগুলিতে প্রতিমা তৈরিতে কখনও চকলেট, কখনও সীতাভোগ মিহিদানা আবার কখনও কাজুবাদামের মতো খাদ্য সামগ্রী ব্যবহার করেছেন তাঁরা। এ বার প্রতিমা তৈরি হচ্ছে গোবিন্দভোগ চাল দিয়ে। ব্যবহার করা হয়েছে প্রায় ১০ কেজি চাল। লিচুতলা এলাকার পবিত্র সঙ্ঘের প্রতিমা আবার তৈরি হয়েছে ডিমের খোসা দিয়ে। নবশক্তি ক্লাবের প্রতিমা তৈরি হয়েছে ভুট্টা এবং পপকর্ন দিয়ে। ৬ ফুট লম্বা প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহার হয়েছে ২০ কেজি ভুট্টা। উদ্যোক্তাদের দাবি, প্রতিমার পাশাপাশি মণ্ডপেও থাকছে চমক। রবিবার ভ্যালেনটাইন্স ডে। এই দিনটির কথা মাথায় রেখে মণ্ডপ সাজানো হয়েছে নানা মডেলে। ফুটিয়ে তোলা হয়েছে প্রেমের নানা দৃশ্য।
রামেশ্বরপুর অগ্রদ্বীপ ক্লাবের মণ্ডপে এ বার প্রতিমা তৈরি হয়েছে বাজি দিয়ে। প্রতিমা তৈরি করেছেন কালনার শিল্পী অরিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি জানান, প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহার হয়েছে চারশো’টি কালী পটকা, হাজারটি আছাড়ে পটকা, তিনশোটি তুবড়ি, দু’হাজার সাপবাজি, শ’তিনেক ফুলঝরি, ১০০টি রংমশলা, ১০০টি দড়ি বাজি। সবমিলিয়ে মণ্ডলে ঢুকলে চমক লাগবেই, এমনই দাবি উদ্যোক্তাদের। যুবশক্তি ক্লাবের মণ্ডপ সেজেছে লক্ষাধিক বনজ ফল দিয়ে। ৬৫ ফুট লম্বা এই মণ্ডপ তৈরি হয়েছে কাল্পনিক মন্দিরের আদলে। ক্লাবের তরফে সুখেন চক্রবর্তী জানান, মণ্ডপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে প্রতিমা। মণ্ডপের ভিতরে থাকছে ঝাড়বাতি। শহরের ফাইভ বুলেটস ক্লাবের মণ্ডপ তৈরি হয়েছে ছোট-বড় ঘুড়ি দিয়ে। সূর্য সমিতির মণ্ডপে থাকছে প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে তৈরি বিভিন্ন মডেল। রূপালিকা ক্লাব আবার দেশলাই কাঠি দিয়ে তৈরি হয়েছে প্রতিমা। মণ্ডপ তৈরি হয়েছে বাঁশের টুকরো দিয়ে। জাগরনী সমিতির থিম ‘হস্তশিল্প অভিযান’। শহরের প্রাচীন এই ক্লাবের প্রতিমা তৈরি হয়েছে শীতলপাটি দিয়ে। এখনকার মণ্ডপে ব্যবহার করা হয়েছে বাঁশ, বেত, কুলো-সহ নানা সামগ্রী।
কিছু দূরেই রোহিণীপাড়া ক্লাবের মণ্ডপ। এখানে মণ্ডপে আস্ত সমুদ্র তট। মণ্ডপ ও প্রতিমা তৈরি হয়েছে বালু শিল্প দিয়ে। স্থানীয় শিল্পী বিমল পোদ্দার জানান, ২০ ট্রাক বালি, ৬ বস্তা নুন দিয়ে তৈরি হয়েছে প্রতিমা। অসহিষ্ণুতা এই মণ্ডপের থিম। শহরের যুগীপাড়া পুরাতন সঙ্ঘে প্রতিমা ও মণ্ডপ তৈরি হয়েছে ফল ও সব্জি দিয়ে।