Advertisement
E-Paper

ভাস্কর পণ্ডিতের পুজোর সাক্ষ্য দিচ্ছে ভাঙা প্রাচীর

ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে ১২০ বর্গফুটের একটা ভাঙা পাঁচিল। আড়াইশো বছরেরও বেশি পুরনো ওই পাঁচিলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দুর্গা পুজোর ইতিহাসও। এলাকার প্রবীণদের দাবি, ভাঙা পাঁচিলটি বাংলায় বর্গী হামলার অন্যতম নিদর্শন। মারাঠা দস্যু ভাস্কর পণ্ডিতের হাতে শুরু হয়েছিল এই পুজো। তারপর থেকেই দাঁইহাটের সমাজবাটি পাড়ার ওই দুর্গা পুজো ভাস্কর পণ্ডিতের পুজো বলে খ্যাত। গত ১৭ বছর ধরে সমাজবাটি পাড়ার বাসিন্দারা ওই ভাঙা পাঁচিলকে ঘিরেই পুজো করে চলেছেন।

সৌমেন দত্ত

শেষ আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০১৪ ০২:২৯
ভাঙা পাঁচিলের গায়েই দুর্গামণ্ডপ। নিজস্ব চিত্র।

ভাঙা পাঁচিলের গায়েই দুর্গামণ্ডপ। নিজস্ব চিত্র।

ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে ১২০ বর্গফুটের একটা ভাঙা পাঁচিল। আড়াইশো বছরেরও বেশি পুরনো ওই পাঁচিলের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দুর্গা পুজোর ইতিহাসও।

এলাকার প্রবীণদের দাবি, ভাঙা পাঁচিলটি বাংলায় বর্গী হামলার অন্যতম নিদর্শন। মারাঠা দস্যু ভাস্কর পণ্ডিতের হাতে শুরু হয়েছিল এই পুজো। তারপর থেকেই দাঁইহাটের সমাজবাটি পাড়ার ওই দুর্গা পুজো ভাস্কর পণ্ডিতের পুজো বলে খ্যাত। গত ১৭ বছর ধরে সমাজবাটি পাড়ার বাসিন্দারা ওই ভাঙা পাঁচিলকে ঘিরেই পুজো করে চলেছেন।

এলাকার বিমল দাস, কাশীনাথ দেরা দাবি করেন, সমাজবাটি পাড়ার এই পুজো ইতিহাস বহন করে চলেছে। ইতিহাসও বলছে, ভাগীরথীর পশ্চিম পাড়ে দাঁইহাটে ঘাঁটি গেড়েছিলেন মারাঠা দস্যু ভাস্কর পণ্ডিত। সেখানেই নবমীর রাতে তৎকালীন সুবে বাংলার নবাব (বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা) আলিবর্দি খাঁ তাঁর ঘাঁটিতে আক্রমণ করেন। প্রাণে বাঁচতে পুজো শেষ না করেই ঘোড়া ছুটিয়ে মহারাষ্ট্রের পথ ধরেছিলেন ভাস্কর পণ্ডিত। স্থানীয় ইতিহাসবিদ তথা দাঁইহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক স্বপনকুমার ঠাকুরও বলেন, “কাটোয়ার ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করলে সমাজবাটি পাড়ার ওই এলাকায় যে ভাস্কর পণ্ডিতের বিচরণ ক্ষেত্র ছিল সেই তথ্য মেলে। ভাঙা পাঁচিলটি ভাল করে লক্ষ্য করলে কামানের গোলার চিহ্নও দেখতে পাওয়া যায়।”

স্থানীয়দের মতে, সোনার দুর্গা প্রতিমা গড়ে পুজো করছিলেন ভাস্কর পণ্ডিত। নবাবের সৈন্য আক্রমণ করলে ওই দুর্গা গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে পালিয়ে যান তিনি। তবে এ নিয়ে মতভেদও রয়েছে। অনেকের মতে, নিজের হাতে প্রতিমা গড়ে পুজো করছিলেন ভাস্কর পণ্ডিত। নবাবদের আক্রমণের ভয়ে নবমীর ভোরে প্রতিমাকে ফেলে রেখে পালিয়ে যান তিনি।

ইতিহাসে মেলে, মুঘল আমলের শেষ দিকে (দিল্লির সিংহাসনে তখন সম্রাট মহম্মদ শাহ) চুক্তি বাবদ দিল্লির নবাবের কাছে সুবে বাংলার জন্য ‘চৌথ কর’ চাইলেন মারাঠারাজ। ওই কর বাংলা থেকে সরাসরি আদায় করার জন্য মারাঠাদের অনুমতি দিলেন নবাব। অনুমতি পাওয়ার পরেই মারাঠারাজ নাগপুরের রঘুজি ভোঁসলেকে দায়িত্ব দেন। রঘুজি আবার সেই দায়িত্ব অর্পণ করেন তাঁর বিশ্বস্ত ভাস্কর কোহলতকারকে, যিনি ভাস্কর পণ্ডিত নামে পরিচিত। স্বপনবাবু বলেন, “চৌথ আদায়ের উদ্দেশে ১৭৪২ সালের এপ্রিলে বাছাই করা ২২ জন মারাঠা সর্দার আর কুড়ি হাজার বর্গী সৈন্য সুবে বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদের উদ্দেশে রওনা দেয়। ১৭৫১ সালে লিখিত গঙ্গারামের ‘মহারাষ্ট্র পুরাণ’ থেকে জানা যায়, সুবে বাংলার নবাব আলিবর্দি উড়িষ্যার বিদ্রোহ দমন করে বর্ধমানের রানিসায়রের কাছে তাঁবু খাটিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, সেই সময়েই গোপনে ভাস্কর পণ্ডিত হামলা চালায়। তিন দিন অবরুদ্ধ থাকার পরে কাটোয়া হয়ে মুর্শিদাবাদ চলে যান নবাব। সেই সময় দাঁইহাটে ঘাঁটি গড়ে রাঢ়বঙ্গ জুড়ে লুঠপাট শুরু করে ভাস্কর পণ্ডিতের বর্গী সেনারা। স্থানীয় ইতিহাসবিদেরা জানান, বর্ধমানের মহারাজারা গঙ্গাস্নানের জন্য দাঁইহাটে গঙ্গাতীরে বাড়ি বানিয়েছিলেন। সেই বাড়ি দখল করে নিয়েছিলেন ভাস্কর পণ্ডিত।

কথিত আছে, বর্গী হামলার ওই নায়ক ভেবেছিলেন দুর্গাপুজো ও দশেরা উৎসব একসঙ্গে হবে। সে জন্যই বর্ধমানের মহারাজাদের ওই বাড়িতে দুর্গোৎসব শুরু করেন তিনি। কিন্তু নবমীর দিন আলিবর্দি খাঁয়ের দলবল নদিয়ার প্রান্ত থেকে কামানের গোলা দাগতে আরম্ভ করে। শাঁখাই ঘাট পেরিয়ে অতর্কিতে আক্রমণ চালান নবাব। আর তাতেই দিশেহারা হয়ে পুজো ছেড়ে পালিয়ে যান ওই মারাঠি দস্যু।

ভাস্কর পণ্ডিতের ওই পুজো একাধিক বার শুরু হয়েছে। উদ্যোগের অভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফের শুরু হয়েছে। সমাজবাটি পাড়ার পুজো কমিটির সম্পাদক অজিত মাহান্ত বলেন, “উদ্যোগের অভাবে পুজোয় বারবার বাধা পড়েছে। তবে আমরা ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নানা অনটনের মধ্যেও পুজো করে চলেছি।” ইতিহাসবিদ স্বপনবাবুরও দাবি, “গোটা বাংলায় বর্গী হামলার আর কোনও নিদর্শন নেই। একমাত্র দাঁইহাটের ওই পাঁচিলটা সাক্ষী। ওই পাঁচিল দ্রুত সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।”

soumen dutta pujo bhaskar pandit dainhat
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy