তিন ছেলে। তিনজনই সম্পন্ন। অথচ তিন ছেলেই তাঁকে দেখেন না বলে অভিযোগ তুলে বিডিও-র দ্বারস্থ হয়েছেন বলরামপুরের বৃদ্ধা পুষ্পবালা পাল। বিডিওকে তিনি জানিয়েছেন, পুত্র, পুত্রবধূ, নাতি-নাতনি নিয়ে তাঁর ভরা সংসার থাকলেও সবার থেকে আলাদা হয়ে তাঁকে একটি চালাঘরে একাকী দিন কাটাতে হচ্ছে। মাঝে কিছুদিন ছেলেরা তাঁকে নিজেদের বাড়িতে পালা করে রাখতেন। কিন্তু কয়েক বছর ধরে তাও বন্ধ। পড়শিদের সাহায্যে কোনও রকমে তাঁর দিন চলছে। বলরামপুরের বিডিও পৌষালী চক্রবর্তী বলেন, ‘‘বৃদ্ধা আমাকে তাঁর অসহায় অবস্থার কথা জানিয়েছেন। তাঁর আবেদন জেলা সুরক্ষা আধিকারিকের কাছে পাঠাচ্ছি।’’
বলরামপুর সদর থেকে এক কিলোমিটার দূরে বলরামপুর থানাগোড়া এলাকার বাসিন্দা সত্তরোর্ধ বৃদ্ধা পুষ্পবালা পাল স্বামীর পৈতৃক ভিটে আঁকড়ে রয়েছেন। একটি চালাঘরে একা থাকেন তিনি। সম্বল বলতে একটি তক্তপোষ, কয়েকটা কাপড়, অল্প বাসনপত্র ও একটি উনুন। শরীরও দুর্বল। বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছেন তিনি। ঠিকমতো চলাফেরাও করতে পারেন না। বৃদ্ধা জানিয়েছেন, তাঁর স্বামী বলরামপুরেই একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করতেন। বছর ত্রিশেক আগে তাঁর মৃত্যু হয়। সেই থেকে বিধবা পুষ্পবালা তিন ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব সামলেছেন। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। তিন ছেলেই নিজেদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর বড় ছেলে বলরামপুরেই ব্যবসা করেন। মেজোছেলে অবসরপ্রাপ্ত রাজ্য সরকারি কর্মী। থাকেন পুরুলিয়া শহরে। আর ছোট ছেলে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে কাজ করেন। বড় ও ছোট ছেলে বলরামপুরেই থাকেন। তিন ছেলেই আলাদা ভাবে থাকেন।
বৃদ্ধার ইচ্ছা ছিল, বয়েসকালটা নাতি-নাতনি এবং ছেলে-বৌমাদের সঙ্গে কাটাবেন। ‘‘কিন্তু তা আর হল কই?’’— নিজেদের ঘরের দরজার চৌকাঠে বলে কাঁদতে কাঁদতে বলেন বৃদ্ধা পুষ্পবালা। তিনি জানান, কিছুদিন তিন ছেলে নিজেদের কাছে চারমাস করে তাঁরে রেখেছিলেন। কিন্তু তাও বেশিদিন নয়। বিডিওকে তিনি জানিয়েছেন, গত প্রায় বছর দশেক ধরে তাঁকে কোনও ছেলেই নিজেদের কাছে নিয়ে রাখছেন না। সেই থেকে অশক্ত শরীরে একাই স্বামী-শ্বশুরের ভিটেতে একটামাত্র চালাঘরে পড়ে রয়েছেন। রোগ হলেও ছেলেরা খোঁজ নিতে আসেন না। চিকিৎসাও করায় না। তাঁ আক্ষেপ, ‘‘আমি শেষ ক’টা দিন নাতি-নাতনিদের সঙ্গেই থাকতে চাই। ছেলেদের তা জানিয়েছি। কিন্তু কেউ আমার কথাই শোনে না।’’
সম্প্রতি সাইকেল রিকশায় চেপে তিনি কোনও রকমে বলরামপুর ব্লক অফিসে এসে বিডিও-র কাছে প্রশাসনের তরফে কিছু ব্যবস্থা করার আবেদন জানান। তিনি বলেন, ‘‘এখন কেউ আর আমাকে দেখে না। ছেলেদের সংসারে বোঝা হয়ে গিয়েছি। কতবার বলেছি ‘তোদের কাছে থাকব, কিন্তু কে নিয়ে যাবে?’ প্রতিদিন ভাল করে খাওয়াও জোটে না।’’ তাঁর আক্ষেপ, ছেলেদের রোগভোগ হলে তিনি একসময় রাত জেগে তাঁদের সুশ্রুষা করেছেন। এখন তাঁর শরীরে কষ্ট। কিন্তু তাঁদের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়ার কেউ নেই।
কী বলছেন ছেলেরা? পুষ্পবালাদেবীর মেজ ছেলে মনোরঞ্জন পালের দাবি, ‘‘আমরা চার মাস করে মায়ের দায়িত্ব নিয়েছিলাম। আমি চারমাস রেখেছিলাম। তার পরে বড়দার পালা। কিন্তু পুরুলিয়া থেকে বলরামপুরে মাকে পৌঁছে দেওয়ার পরেও বড়দা মাকে দেখছে না। আমি কী করতে পারি?’’ ছোটভাই সন্তোষ পালেরও দাবি, তাঁরা দুই ভাই দায়িত্ব নিলেও বড়দা দায়িত্ব না নেওয়ায় তাঁদের কিছু করার নেই। বড় ছেলে সুশীলবাবুর সংক্ষিপ্ত জবাব, ‘‘মায়ের মাথা ঠিক নেই। কী বলছেন, কী করছেন নিজেই জানেন না।’’
বয়স্কদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন জানাচ্ছে, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের দেখাশোনা করা নিয়ে সমস্যা দিনদিন বাড়ছে। শুধু শহরাঞ্চলেই নয়, এই ব্যাধি গ্রামাঞ্চলেও ছড়াচ্ছে। এ জন্য প্রশাসনের আরও সক্রিয় হওয়া দরকার। তবে পুরুলিয়া জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের সদস্য সচিব রোহন সিংহ বলেছেন, ‘‘আইন বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশেই রয়েছে। পুষ্পবালাদেবীর অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে কী ভাবে তাঁকে সাহায্য করা যায় দেখা হচ্ছে।’’