ক্ষমতায় এলে মহিলাদের জন্য ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর চেয়ে বেশি অর্থমূল্যের প্রকল্প ঘোষণা করা হবে। রাজ্য বিজেপির একাধিক নেতা একাধিক বার এই আশ্বাস শুনিয়েছেন। কিন্তু তাতে এ রাজ্যে বিজেপির ভোট বেড়েছে বলে বিজেপি নেতৃত্বও নিশ্চিত নন। তাই এ বার ‘নিশ্চয়তা’র সুলুক-সন্ধানে জোর। কী দেওয়া হবে, সে কথা পরে। ইতিমধ্যেই নরেন্দ্র মোদীর সরকার কী কী দিয়েছে, সেই হিসাব তুলে ধরে বাড়ি বাড়ি যাওয়ার নির্দেশ দিলেন কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। পাঁচ বছরে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ বাবদ কত পেয়েছেন আর কেন্দ্রীয় প্রকল্প থেকে কত পেয়েছেন? ৬৪ লক্ষ পরিবারের কাছে গিয়ে সেই ‘তুলনা’ তুলে ধরার নির্দেশ এসেছে দিল্লি থেকে।
৬৪ লক্ষ পরিবার মানে প্রায় ২ কোটি ভোটার। বাড়ি বাড়ি পৌঁছে এই ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে এঁদের সিংহভাগের ভোট যদি বিজেপি নিজেদের খাতায় জমা করতে সফল হয়, তা হলে ভোটের হিসাব অনেকটাই বদলে যাবে বলে বিজেপি নেতৃত্ব মনে করছেন।
রাজ্য জুড়ে ‘লাভার্থী সম্পর্ক অভিযান’ শুরু করছে বিজেপি। তার জন্য আলাদা কমিটি গড়ে দেওয়া হয়েছে। জেলাভিত্তিক ‘টিম’ গঠন সারা। রাজ্যে যে হাজার ষাটেক বুথে বিজেপি কমিটি গঠন করতে পেরেছে, সেখানেও একজন করে ‘লাভার্থী সম্পর্ক প্রমুখ’ হিসাবে দায়িত্ব পেয়েছেন। এ বার তাঁদের মাঠে নামানোর পালা। তাই রাজ্য ও জেলা স্তরের টিমকে ডেকে রবিবার বিধাননগরে বৈঠক করেছেন কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল। ছিলেন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এবং সংগঠন সম্পাদক অমিতাভ চক্রবর্তী। সেই বৈঠকেই ৬৪ লক্ষ পরিবারের দরজায় পৌঁছোনোর নির্দেশ জারি হয়েছে।
বিজেপি সূত্রের খবর, পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা কারা পেয়েছেন, সে তালিকা বনসলই তৈরি করিয়ে এনেছেন। কেন্দ্রীয় সরকার সে তালিকা তৈরি করে পাঠিয়েছে, না কি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির পরামর্শদাতা হিসাবে কর্মরত একটি সংস্থা কেন্দ্রের বিভিন্ন মন্ত্রকের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে তা তৈরি করেছে, সেটি স্পষ্ট নয়। কিন্তু তালিকা শুধু রাজ্যভিত্তিক নয়, একেবারে নীচের স্তরের জন্যও তা তৈরির কাজ সম্পন্ন। প্রতিটি ‘শক্তিকেন্দ্রে’ (পাঁচ-ছ’টি বুথের সমষ্টি) কত জন নানা কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন, কোন পরিবার ক’টি প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছে, তাঁদের নাম-ঠিকানা-ফোন নম্বর কী, সব তথ্য সংগঠনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে ৮২ লক্ষের মতো পরিবার নানা কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছে বলে বিজেপির দাবি। তার মধ্যে ১৮ লক্ষের মতো পরিবার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। বাকি ৬৪ লক্ষ হিন্দু। বিজেপির হিসাব অনুযায়ী, এই ‘লাভার্থী’ হিন্দু পরিবারগুলির মধ্যে ৪২ লক্ষ পরিবার এমন, যেগুলি অন্তত তিনটি কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছে। ৩৫ লক্ষ পরিবার এমন, যেগুলি পাঁচটি কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছে। গ্রাম সড়ক যোজনার মতো যে সব প্রকল্প কারও ব্যক্তিগত সুবিধার তালিকায় পড়ে না, সেগুলিকে তালিকায় রাখা হয়নি। বাড়ি, শৌচালয়, বিনামূল্যে রেশন, রান্নার গ্যাস, পিএম কিসান সম্মাননিধির টাকা, নলবাহিত পানীয় জল-সহ যে সব প্রকল্পের সুবিধা সরাসরি কোনও ব্যক্তি বা পরিবারের কাছে পৌঁছোয়, সেগুলিকেই হিসাবে রাখা হয়েছে। কারণ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-ও সরাসরি ব্যক্তির হাতেই পৌঁছোয়।
‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এ যাঁরা মাসে হাজার টাকা করে পান, তাঁরা পাঁচ বছরে মোট ৬০ হাজার টাকা পান। বিজেপি বলছে, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় যাঁরা বাড়ি পেয়েছেন, তাঁরা শুধু ওই একটি প্রকল্পেই ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-এর পঞ্চবার্ষিকী প্রাপ্যের পাঁচগুণ পেয়ে যাচ্ছেন। এর সঙ্গে কেউ শৌচাগার, কেউ রান্নার গ্যাস, কেউ নলবাহিত পানীয় জল, কেউ কিসান সম্মাননিধি পাচ্ছেন। বিনামূল্যে রেশন প্রাপকের তালিকা আরও লম্বা। সব মিলিয়ে অনেক পরিবার পাঁচ বছরে লাখ চারেক টাকার মতো সুবিধা পেয়েছে বলে বিজেপির দাবি। ঘরে ঘরে গিয়ে এই তুলনাই তুলে ধরতে বলা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় না-থাকা সত্ত্বেও এতগুলি কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সুবিধা যখন মিলছে, তখন বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় এলে ছবিটা কেমন হতে পারে, সেই ভাষ্য প্রচার করতে বলা হয়েছে।
উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান এবং ছত্তীসগঢ়— এই তিন রাজ্যে ‘লাভার্থী সম্পর্ক অভিযান’-ই বিজেপির ‘জয়ের কারিগর’ বলে বনসল রবিবারের বৈঠকে দাবি করেছেন। ২০১৭ সালে উত্তরপ্রদেশে অখিলেশের সপাকে হারিয়ে বিজেপি যখন ক্ষমতায় আসে, তখন বনসলই ছিলেন সে রাজ্যে বিজেপির সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন)। তাই সেই নির্বাচনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা-কর্মীদের কাছে জানিয়েছেন তিনি। ২০২৩ সালে রাজস্থান এবং ছত্তীসগঢ়েও কংগ্রেস সরকারের পতন ঘটাতে এই কৌশল কী ভাবে কাজে এসেছিল, বনসল তা ব্যাখ্যা করেছেন। আপাতত সবচেয়ে বেশি জোর দিতে বলেছেন এই কর্মসূচিতেই।