Advertisement
E-Paper

বিডিও-র সামনে তুই বিজেপি, না মুই

এত দিন ক্ষোভ-বিক্ষোভ দলের বলয়েই সীমাবদ্ধ ছিল। এ বার দলের গণ্ডী ছাড়িয়ে সরকারি দফতরেও আঁচ ফেলল বাঁকুড়া জেলা বিজেপি-র অন্তর্দ্বন্দ্ব! কোন দল আসল বিজেপি, তা নিয়েই মারপিট বাধল ব্লক অফিসে।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০১:৫১

এত দিন ক্ষোভ-বিক্ষোভ দলের বলয়েই সীমাবদ্ধ ছিল। এ বার দলের গণ্ডী ছাড়িয়ে সরকারি দফতরেও আঁচ ফেলল বাঁকুড়া জেলা বিজেপি-র অন্তর্দ্বন্দ্ব! কোন দল আসল বিজেপি, তা নিয়েই মারপিট বাধল ব্লক অফিসে।

বুধবার বাঁকুড়ার ছাতনার ঘটনা। এ দিন বিজেপি-র এক গোষ্ঠী যখন ব্লক অফিসে বিডিও-র কাছে স্মারকলিপি দিচ্ছে, তখন অন্য গোষ্ঠীর লোকজন চিৎকার করতে করতে সেখানে ঢুকে পড়ে। সরাসরি বিডিওকে প্রশ্ন করা হয়: ‘কার স্মারকলিপি নিচ্ছেন আপনি? আসল বিজেপি তো আমরা!’ সদ্য বিডিও হিসেবে যোগ দেওয়া আধিকারিক সেই প্রশ্নের মুখে পড়ে কী বলবেন বুঝে ওঠার আগেই বিজেপি-র যুযুধান দু’পক্ষ নিজেদের মধ্যে হাতাহাতিতে জড়ায়। শেষ অবধি ফোনে পুলিশ ডাকিয়ে মারপিট থামাতে হয় বিডিও-কে। গোটা ঘটনায় দৃশ্যতই বিরক্ত বিডিও মলয় চট্টোপাধ্যায়ের মন্তব্য, কে আসল, কে নকল বিজেপি, তা তাঁর জানার কথা নয়।

তৃণমূলের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব দেখতে অভ্যস্ত এ রাজ্যের মানুষ। ক’দিন আগেই বর্ধমানের গুসকরা পুরসভায় তৃণমূলের দুই দাপুটে কাউন্সিলর (এক জন আবার মহিলা) নিজেদের মধ্যে চুলোচুলি করেছিলেন। বাঁকুড়াতেও শাসকদলের গোষ্ঠী কোন্দল চরম আকার নিয়েছে। এ বার বিজেপি-তেও তেমন কাণ্ড শুরু হওয়ায় মুখ টিপে হাসছেন তৃণমূলের অনেকেই। কারণ, লোকসভা ভোট পরবর্তী সময়ে এই জেলায় তৃণমূলের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসাবে উঠে এসেছিল বিজেপি-ই। এ দিনের ঘটনার পরে জেলার সিপিএম এবং কংগ্রেস নেতাদের কটাক্ষ, তৃণমূল ও বিজেপি-র মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নিয়েই যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

Advertisement

বিজেপি-র অন্দরে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের সূত্রপাত জেলায় নতুন সভাপতি নির্বাচনের পর থেকেই। নতুন সভাপতিকে নিয়ে প্রথম থেকেই অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে জেলা বিজেপি-র একটি অংশ। সভাপতি পরিবর্তনের দাবিতে একাধিক বার তারা রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে দরবারও করেছেন। বিক্ষুব্ধদের জেলা কমিটি থেকে আগেই ছাঁটাই করেছেন নেতৃত্ব। বিক্ষুব্ধদের জেলা বিজেপি-র কর্মসূচিতেও যোগ দিতে দেখা যায়নি গত কয়েক মাস ধরে। এমনকী, সম্প্রতি ছাতনাতেই খোদ রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের সভায় মেরেকেটে শ’দেড়েক দলীয় কর্মী এসেছিলেন।

তা নিয়ে পরে বাঁকুড়ায় এসে আক্ষেপও শোনা গিয়েছিল দিলীপবাবুর মুখে। সে দিনও অবশ্য তাঁর কাছে জেলার সভাপতির অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ দেখান দলের কর্মীদের একাংশ। তার পরেও কাজ না হওয়ায় বিক্ষুব্ধ কর্মীরা নিজেদের মতো করেই নানা কর্মসূচি নিচ্ছেন। সেটা করতে গিয়েই তাঁদের সঙ্গে গোলমাল বাধছে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর। এ দিন ছাতনায় ঠিক সেটাই হয়েছে। বিডিও-র কাছে আদিবাসীদের নানা সমস্যা নিয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি নিয়েছিলেন বিক্ষুব্ধ বিজেপি নেতা জীবন চক্রবর্তী, অজয় ঘটকেরা। এ দিন দুপুরে ওই দুই নেতা জনা দশেক কর্মীকে নিয়ে ব্লক অফিসে যান।

বিজেপি সূত্রের খবর, স্মারকলিপি জমা দেওয়ার সময় হঠাৎই ছাতনা ব্লকের বিজেপি সভাপতি অশোক বিদের নেতৃত্বে জনা দশেক কর্মী চিৎকার করতে করতে জোর করে বিডিও-র ঘরে ঢুকে পড়েন। তাঁরা বিডিও-র কাছে দাবি করেন, যাঁরা এখানে স্মারকলিপি দিতে এসেছেন, তাঁরা বিজেপির কেউ নন। দলের সঙ্গে তাঁদের কোনও সম্পর্কই নেই। তাঁদের এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে রাজ্য সভাপতিকেও ফোন করতে বলেন অশোকবাবুরা। ঘটনার আকস্মিকতায় হচকচিয়ে যান সদ্য ছাতনার বিডিও-র দায়িত্ব নেওয়া মলয় চট্টোপাধ্যায়। তিনি অশোকবাবুদের জানান, স্মারকলিপি দেওয়ার অধিকার সবারই রয়েছে। এরই মধ্যে অশোকবাবুদের এই কাণ্ডের প্রতিবাদে সরব হন জীবনবাবুরা। দু’তরফে শুরু হয় বচসা। তা থেকে হাতাহাতি। অভিযোগ, জীবনবাবুর অনুগামী তথা বিজেপি-র আদিবাসী মোর্চার নেতা শিবদাস সরেনের মুখে ঘুষি মারে অশোক-গোষ্ঠী। চেয়ার হাতে তুলে একে অপরের দিকে ছুড়ে মারাও শুরু হয়। সব মিলিয়ে ব্লক অফিসে তখন ধন্ধুমার!

মারপিট থামাতে বিডিও-র চেম্বারে ছুটে আসেন নিরাপত্তা কর্মী ও দফতরের কর্মীরা। কিন্তু, পরিস্থিতি ক্রমশ ঘোরালো হচ্ছে দেখে থানা থেকে পুলিশ বাহিনী ডাকা হয়। পুলিশ এসে দু’পক্ষকে থামায়। পরে বিডিও মলয়বাবু বলেন, ‘‘যে ঘটনা আমার অফিসে ঘটল, তা লিখিত ভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও পুলিশকে জানাব। বিজেপির আদিবাসী মোর্চার তরফেই স্মারকলিপি দেওয়ার আবেদন করা হয়েছিল। কে আসল কে নকল বিজেপি, তা আমার জানার কথা নয়।’’

মারপিটের পরে অবশ্য দু’পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করেছে। জীবনবাবুর বক্তব্য, ‘‘আদিবাসীদের সমস্যা নিয়ে স্মারকলিপি দিতে গিয়েছিলাম। দলেরই লোকজন এমন কাণ্ড করবে আশা করিনি।’’ তাঁর আরও দাবি, তৃণমূলের প্ররোচনাতেই এ দিন অশোকবাবুরা এই ঘটনা ঘটিয়েছেন। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করেছে তৃণমূল।অশোকবাবুর পাল্টা অভিযোগ, ‘‘ওঁরা দলের কেউ নন। দলবিরোধী কাজ করেছেন তারা। আমাদের এক মহিলা কর্মীর শ্লীলতাহানি করা হল বিডিওর সামনে।’’

প্রত্যাশিত ভাবেই অশোকবাবুর পাশে দাঁড়িয়েছেন দলের নতুন জেলা সভাপতি পার্থসারথি কুণ্ডু। তিনি বলেন, ‘‘দলে যাঁদের কোনও পদ নেই, কারও সঙ্গে আলোচনা না করেই তাঁরা এই ধরনের কর্মসূচি নিতে পারেন না। এটা অনৈতিক কাজ।’’ জীবনবাবুর অবশ্য দাবি, এই কর্মসূচি রাজ্য সভাপতিকে জানিয়েই নেওয়া হয়েছিল। স্মারকলিপি দিতে তাঁদের সঙ্গে ব্লক অফিসে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য কমিটির সদস্য অনলবরণ ঘোষ। জেলা সভাপতির বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘যিনি বলছেন আমাদের পদ নেই, তার নিজের পদটাই কিছু দিন পরে থাকে কিনা সেটা দেখুক!’’

তৃণমূলের জেলা নেতাদের মতোই বিজেপি-র জেলা সভাপতিও এ দিনের ঘটনাকে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বলে মানতে চাননি। তাঁর কথায়, ‘‘দলের এক শ্রেণির কর্মীর অনৈতিক কাজে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে মাত্র।’’

অঙ্কন: অশোক মল্লিক

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy