রান্নার গ্যাসের দাম এক লাফে সিলিন্ডার প্রতি ৬০ টাকা বেড়েছে। দেশের শাসকদল বিজেপির অন্দরে উদ্বেগও বেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মতো ভোটমুখী রাজ্যে সে উদ্বেগ আরও বেশি। কারণ, রাজ্যের শাসক তৃণমূল কালক্ষেপ না-করে রাস্তায় নেমে পড়ছে। গ্যাসের দামকে আসন্ন ভোটযুদ্ধে ‘হাতিয়ার’ করে তুলতে দ্রুত কোমর বেঁধে নিচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু তার মোকাবিলায় পাল্টা কোনও কর্মসূচির কথা রাজ্য বিজেপি এখনও ভেবে উঠতে পারেনি। মূল্যবৃদ্ধির কারণ এবং ভর্তুকি সম্পর্কে ভাষ্যনির্মাণ শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তৃণমূলের আক্রমণকে প্রতিহত করতে পাল্টা পথে নামার কোনও পরিকল্পনা এখনও পর্যন্ত নেই বিজেপির।
কেন নেই, তার কারণ কেউই প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করছেন না। কিন্তু বিজেপির একাংশের দাবি, ভোট পিছোতে পারে। তার আগে যুদ্ধ থেমে গেলে গ্যাসের দাম এমনিতেই আবার কমে যাবে।
শুক্রবার রাতে জানা গিয়েছে রান্নার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কথা। গোটা মধ্য এশিয়া জুড়ে যুদ্ধ চলছে। পৃথিবীতে খনিজ তেল ও গ্যাসের প্রধান উৎপাদক ওই এলাকাই। সুতরাং খনিজ তেল ও গ্যাসের উৎপাদন তথা সরবরাহে ধাক্কা লেগেছে। তার উপর আমেরিকা-ইজ়রায়েলকে চাপে ফেলতে ইরান হরমুজ় প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্ত থেকে তেল-গ্যাস আমদানি করার পথও বন্ধ। সর্বাগ্রে রান্নার গ্যাসের দাম বেড়েছে। তেলের দাম এখনও বাড়েনি জমানো ভান্ডারের সুবাদে। কেন্দ্রীয় সরকার শনিবার তড়িঘড়ি বিবৃতি জারি করে জানিয়েছে, আপাতত তেলের দাম বাড়বে না। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি জারি থাকলে সেই আশ্বাস কতদিন রাখা যাবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতাদের একাংশ ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় মেনে নিচ্ছেন, এই মুহূর্তেবিধানসভা নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি বিজেপির জন্য কিছুটা ক্ষতিকরই হল। মমতা যে ভাবে তাঁর দলের মহিলা শাখাকে কালো শাড়ি পরে, হাঁড়ি-কড়া-হাতা-খুন্তি হাতে রাস্তায় নামার নির্দেশ দিয়েছেন, তাতে রবিবার বিজেপির অস্বস্তি আরও বাড়বে। কিন্তু সে সবের মোকাবিলায় পাল্টা পথে নামার পরিকল্পনা বিজেপির নেই। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি আপাতত দু’টি কৌশলের কথা ভেবে রেখেছে। প্রথমত, গ্যাসের দাম নিয়ে কেউ প্রশ্ন করলে কী উত্তর দেওয়া হবে। দ্বিতীয়ত, পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী হরদীপ সিংহ পুরীর উদ্যোগে একটি ভিডিয়ো বার্তা। পেট্রোপণ্যের দাম কতটা বেড়েছে, সরকার এখনও কতটা ভর্তুকি দিচ্ছে এবং ভারতের পরিস্থিতি প্রতিবেশীদের চেয়ে কতটা ভাল, সে সবই তুলে ধরা হয়েছে ওই বার্তায়।
‘পরিবর্তন যাত্রা’য় অংশ নিতে রাজ্য বিজেপির গোটা নেতৃত্বই এখন পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রান্তে। শমীক ভট্টাচার্য, শুভেন্দু অধিকারী বা সুকান্ত মজুমদার তো বটেই, রাজ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় সারির নেতানেত্রীরাও যাত্রা ‘সুসম্পন্ন’ করতে ব্যস্ত। ব্যস্ততা রয়েছে আগামী শনিবার ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জনসভার প্রস্তুতি নিয়েও। ফলে শুক্রবার রাতে রান্নার গ্যাসের দাম আচমকা বেড়ে যাওয়া জনিত অস্বস্তির মোকাবিলা কী ভাবে করা হবে, তা নিয়ে দলগত ভাবে কোনও পরিকল্পনা বিজেপি এখনও তৈরি করে উঠতে পারেনি। তবে শীর্ষনেতাদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যাচ্ছে, এ প্রসঙ্গে যে কোনও প্রশ্নে গোটা দলের একই সুরে কথা বলার বিষয়ে আলোচনা হয়ে গিয়েছে।
শমীক বলছেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা তৃণমূলের প্রচারের মোকাবিলা আমাদের করতে হবে না। ওটা মানুষই করবেন। কারণ, মানুষ জানেন, রান্নার গ্যাসের দাম বেড়েছে যুদ্ধের কারণে।’’ সুকান্ত বলছেন, ‘‘পৃথিবীর যে অংশ খনিজ তেল ও গ্যাসের প্রধান উৎপাদক, সেই এলাকা যুদ্ধে বিধ্বস্ত। সেই সঙ্কটের জেরেই দাম বেড়েছে। এই সঙ্কট শুধু আমাদের নয়, গোটা বিশ্বের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দায়িত্বশীল নেত্রী হলে এই সঙ্কটকালকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতি করতেন না। তাঁর এই রাজনীতি সাধারণ মানুষ ভাল চোখে দেখবেন না।’’
এই কথাগুলিই কি রাস্তায় নেমে বা কোনও বিশেষ কর্মসূচির মাধ্যমে বলবে রাজ্য বিজেপি? মমতা যে ভাবে তৃণমূলকে পথে নামাচ্ছেন, বিজেপি কি তেমন পাল্টা পথে নামবে? রাজ্য বিজেপি সূত্র বলছে, তেমন কোনও পরিকল্পনা এখনও তৈরি হয়নি। আবার একাংশের দাবি, বুঝেশুনেই তেমন পরিকল্পনা থেকে বিজেপি আপাতত দূরে। এসআইআর প্রক্রিয়ায় ৬০ লক্ষ নামের ‘বিবেচনাধীন’ তালিকার সম্পূর্ণ নিষ্পত্তির পরে নির্বাচন করতে হলে সময়মতো ভোট হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে বিজেপির ওই অংশ মনে করছে। সে ক্ষেত্রে ভোট কতটা পিছোতে পারে, তখন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকতে পারে, সে সব না-ভেবে আগেই রাস্তায় নামা অপ্রয়োজনীয় বলে তাঁদের ব্যাখ্যা। তবে এ বিষয়ে কেউই প্রকাশ্যে মন্তব্য করছেন না।
আপাতত সমাজমাধ্যম এবং হোয়াটসঅ্যাপে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো একটি ভাষ্য তৈরি করে রাজ্যের বিজেপি নেতাদের পাঠিয়েছেন পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী পুরী। তাতে মূলত পাঁচটি বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে। ১. ভারত রান্নার গ্যাসের ৬০ শতাংশ আমদানি করে। শেষ তিন বছরে বিশ্ব বাজারে তার দাম ৪১ শতাংশ এবং শেষ তিন মাসে আরও ১৬ শতাংশ বেড়েছে। ২. রান্নার গ্যাসের প্রতিটি সিলিন্ডারে সরকার ১৩৪ টাকা করে ভর্তুকি দিচ্ছিল। কিন্তু দাম ৬০ টাকা বাড়ানো হয়েছে। মূল্যবৃদ্ধির পুরো বোঝা সাধারণের উপরে চাপানো হয়নি। ৩. প্রধানমন্ত্রী উজ্জ্বলা যোজনার সুবিধা প্রাপকদের জন্য দৈনিক খরচ বাড়ছে মাত্র ৮০ পয়সা। ৪. পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপালের চেয়ে এখনও ভারতে রান্নার গ্যাসের দাম অনেক কম। ৫. তেল ও গ্যাস উৎপাদক দেশগুলিতে ভয়াবহ যুদ্ধ সত্ত্বেও ভারত রান্নার গ্যাসের সরবরাহে কোনও সঙ্কট আসতে দেয়নি। সরবরাহ মসৃণ রাখা হয়েছে। পুরীর পাঠানো সেই ভিডিয়ো-ভাষ্যই আপাতত পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতাদের ‘হাতিয়ার’। তাতে ‘আন্দোলনমুখী’ মমতাকে দমানো যাবে কিনা, তা নিয়ে অবশ্য এখনই কেউ কোনও মন্তব্যে নারাজ।