আগামী ১৬ মার্চ রাজ্যসভা নির্বাচন। দেশের ১০টি রাজ্যের মোট ৩৭টি রাজ্যসভা আসনে ভোট হবে। তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের পাঁচটি আসনও রয়েছে। বিধায়কদের সংখ্যার নিরিখে চারটি আসনে তৃণমূল এবং একটিতে বিজেপির জয় নিশ্চিত। আগামী বৃহস্পতিবার ভোটের বিজ্ঞপ্তি জারি করবে নির্বাচন কমিশন। ওই দিন থেকেই যাবতীয় তৎপরতা শুরু করবে দুই যুযুধান শিবির। কিন্তু কোনও পক্ষই তাড়াহুড়ো করতে চাইছে না। দু’তরফেরই নজর রয়েছে পরস্পরের ষষ্ঠ প্রার্থী দেওয়ার ‘কৌশল’ এবং ‘টিকিট অনিশ্চিত’ স্তরের বিধায়কদের উপর।
ষষ্ঠ প্রার্থী নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে বিজেপির তরফে আগের দুই সাংসদের মনোনয়ন পর্বের সময় একজন করে ‘ডামি’ প্রার্থী দেওয়ায়। বিজেপি এর আগে দু’টি রাজ্যসভার আসন পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে। অনন্ত মহারাজ এবং শমীক ভট্টাচার্যর মনোনয়নের সময় একজন করে ‘ডামি’ প্রার্থী দিয়েছিল তারা। বিজেপি পরিষদীয় দল জানিয়েছিল, দলীয় প্রার্থীর মনোনয়নে কোনও সমস্যা হলে যাতে ‘ডামি’ প্রার্থী লড়াই করতে পারেন, সেই কারণেই দ্বিতীয় প্রার্থীর মনোনয়ন দাখিল করানো হয়েছিল। কিন্তু মনোনয়নের প্রত্যাহারের দিনে ‘ডামি’ প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করায় কোনও বিতর্ক হয়নি।
এ বার বিজেপি কোনও ‘ডামি’ প্রার্থী খাড়া করে কি না, সে দিকে নজর রয়েছে তৃণমূলের একাংশের। কারণ, বিজেপি ষষ্ঠ প্রার্থী দিলে এবং সেই প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার না করলে রাজ্যসভা নির্বাচনে ভোট হবে।
এমনিতেই বিধানসভা ভোটের আগে নেতা-বিধায়কদের দলবদলের সম্ভাবনা থাকে। দু’পক্ষের যে সব বিধায়কের টিকিট ‘অনিশ্চিত’, রাজ্যসভা ভোটের আবহে তাঁদের উপরেই নজর রাখছে দু’পক্ষ। টিকিট না পেলে সংশ্লিষ্ট বিধায়কেরা ক্ষুব্ধ হবেন এবং তাঁদের রাজ্যসভা ভোটে ‘ক্রস ভোটিং’ করার অবকাশ তৈরি হবে। সে সব বিধায়কের ভোট ধরে রেখে ‘ক্রস ভোটিং’ আটকাতে বাড়তি নজর দিতে হবে শাসক এবং বিরোধী দুই শিবিরকেই। তাই রাজ্যসভা ভোটের মনোনয়ন দাখিলের শেষ দিন ৫ মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করার পক্ষপাতী দুই শিবিরের কৌশলীরা। তৃণমূল পরিষদীয় দলের একাংশের আশঙ্কা, তাদের টিকিট না পাওয়া বিধায়কদের ভাঙিয়ে আরও একটি রাজ্যসভার আসন পেতে চেষ্টা করতে পারে বিজেপি। তৃণমূলের বেশ কয়েক জন বিধায়ক বিধানসভা ভোটে টিকিট না-ও পেতে পারেন বলে জল্পনা। তাঁদের ‘ক্ষোভ’-কে বিজেপি কাজে লাগাতে পারে বলে তৃণমূলের আশঙ্কা। তবে কারা টিকিট পাবেন আর কারা পাবেন না, তা জানা যাবে তৃণমূলের সর্ব্বোচ্চ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রার্থিতালিকা চূড়ান্ত করার পরে। দলের এক প্রবীণ বিধায়কের বক্তব্য, সেই তালিকা প্রকাশিত হতে পারে রাজ্যসভার মনোনয়ন প্রত্যাহারের পর। ফলে বিজেপির ‘কৌশল’ কাজে আসবে না। রাজ্যসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি প্রসঙ্গে তৃণমূল পরিষদীয় দলের মুখ্য সচেতক নির্মল ঘোষ বলেছেন, ‘‘নোটিফিকেশন জারি হলেই আমরা আমাদের প্রস্তুতি শুরু করব। তাড়াহুড়ো করার কিছু নেই।’’ পক্ষান্তরে, বিজেপির প্রার্থিতালিকা ঘোষণা করা হতে পারে ১৬ মার্চ রাজ্যসভা ভোট মিটে যাওয়ার পরেই। অর্থাৎ, দুই শিবিরই ‘সাবধানি পদক্ষেপ’ করতে চাইছে।
এ বারের রাজ্যসভা নির্বাচনে একজন প্রার্থীকে জয়ী করতে ৫০ জন বিধায়কের প্রথম পছন্দের ভোট পেতে হবে। তাই একজন প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করতে পদ্মশিবিরকে ৫০ জন বিধায়ককে ধরে রাখতে হবে। তারা ষষ্ঠ কোনও প্রার্থী দিলে নিজেদের হাতে থাকা ১৪টি অতিরিক্ত ভোটের পাশাপাশি কমপক্ষে আরও ৩৬ জন বিধায়কের ভোট জোগাড় করতে হবে। যা অসম্ভব বলেই মনে করছে শাসকদলের একাংশ। তবে বিজেপি এমন কৌশল অবলম্বন করলে জবাব দেবে তৃণমূলও।
আরও পড়ুন:
এমনিতেই গত সপ্তাহে দলবদল করেছেন কার্শিয়াংয়ের বিজেপি বিধায়ক বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা। তাতে রাজ্যসভা নির্বাচনের উত্তাপ খানিক বেড়ে গিয়েছে। বিষ্ণুপ্রসাদের তৃণমূলে যোগদানের আগে বিজেপির বিধায়ক সংখ্যা ছিল ৬৫। তাঁর দলত্যাগের পর সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৪। এ বারের নির্বাচনে চার দলীয় প্রার্থীকে জেতাতে তৃণমূলের মোট ২০০ জন বিধায়কের সমর্থন প্রয়োজন। চারজন প্রার্থীর জয় নিশ্চিত করেও তৃণমূলের হাতে থাকছে আরও ২০ জন বিধায়কের ভোট। অর্থাৎ, ভোটে অবতীর্ণ হয়ে একক শক্তিতে ষষ্ঠ প্রার্থীকে জেতানোর সংখ্যা কারও হাতে নেই। তাই আদৌ অতিরিক্ত প্রার্থী দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে আলোচনা করছে দুই শিবির।
বিজেপি পরিষদীয় দল সূত্রের বক্তব্য, শাসক তৃণমূল ক্ষমতায় আছে বলে তাদের পক্ষে সুযোগ-সুবিধা রয়েছে রাজ্যসভা নির্বাচনের লড়াইয়ে। তবে জটিল অঙ্কের কথা মাথায় রেখে বিজেপি দ্বিতীয় আসন জয়ের জন্য আদৌ ঝাঁপাবে কি না, তা বোঝা যাবে ৯ মার্চ মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনে। তৃণমূলের চার এবং বিজেপির এক জন প্রার্থী শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন জমা দিলে ভোটাভুটির প্রয়োজন হবে না। স্বাভাবিক অঙ্কের নিয়মে জিতে যাবেন তাঁরা। অপেক্ষা করতে হবে শুধু মনোনয়ন স্ক্রুটিনির দিন পর্যন্ত।
আরও পড়ুন:
আগামী ২ এপ্রিল রাজ্যসভায় মেয়াদ শেষ হচ্ছে তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সী, সমাজকর্মী সাকেত গোখলে এবং তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠন আইএনটিটিইউসি-র সভাপতি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের। মৌসম বেনজির নূরের মেয়াদও এই সময়েই শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জানুয়ারি মাসে তিনি তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদপদ ত্যাগ করে কংগ্রেসে যোগদান করেন। তাই তাঁর আসন আগে থেকেই শূন্য হয়ে রয়েছে। তৃণমূল সূত্রের খবর, মৌসমের বদলে ওই আসনে কোনও সংখ্যালঘু প্রতিনিধিকে রাজ্যসভায় পাঠানো হতে পারে। অসুস্থতার কারণে তৃণমূলের রাজ্য সভাপতি সুব্রত আর প্রার্থী হতে চাইছেন না। তাই তাঁর আসনে নতুন কাউকে সংসদের উচ্চকক্ষে পাঠাতে হবে। ঋতব্রত মাত্র দেড় বছরের ভাঙা মেয়াদে রাজ্যসভায় কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। আরজি কর হাসপাতালে চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়ে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দেন প্রাক্তন আমলা জহর সরকার। সেই শূন্য আসনেই ঋতব্রতকে সংসদে পাঠায় তৃণমূল। এই স্বল্প সময়েই সংসদে তাঁর কাজে সন্তুষ্ট দল। কিন্তু তৃণমূলের একাংশের দাবি, বিধানসভা নির্বাচনে ঋতব্রতকে প্রার্থী করতে চায় দল। শেষপর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন মমতা। আরটিআই কর্মী সাকেত আবার লুইজিনহো ফেলেইরোর ছেড়ে দেওয়া আসনে রাজ্যসভায় গিয়েছিলেন। তিনিও রাজ্যসভায় পূর্ণাঙ্গ মেয়াদ পাননি। সেক্ষেত্রে তাঁকেও আবার রাজ্যসভায় পাঠানোর বিষয়টিও বিবেচনাধীন।
পঞ্চম আসনটিতে ২০২০ সালে কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট বিধায়কদের সমর্থন নিয়ে জয়ী হয়েছিলেন সিপিএমের আইনজীবী নেতা বিকাশ ভট্টাচার্য। বামফ্রন্টের ৩০-এর কম বিধায়ক সংখ্যা হলেও কংগ্রেসের বিধায়কদের সমর্থন নিয়ে তিনি সাংসদ নির্বাচন হন। কিন্তু এখন বামফ্রন্ট বা কংগ্রেসের কোনও বিধায়ক পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় নেই। ২ এপ্রিল বিকাশের মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ থেকে রাজ্যসভাতেও শূন্য হয়ে যাবে সিপিএম তথা বামেরা। প্রসঙ্গত, লোকসভাতেও পশ্চিমবঙ্গ থেকে এখন আর সিপিএম তথা বামেদের কোনও সাংসদ নেই। ২০১৮ সালের পর পশ্চিমবঙ্গে রাজ্যসভার ভোট হয়নি। ২০২০ সালে নির্দল প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন প্রাক্তন বিধায়ক দীনেশ বজাজ। কিন্তু মনোনয়নপত্রে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের সই ও সিল না থাকায় দীনেশের মনোনয়ন বাতিল করে দেন রিটার্নিং অফিসার। শেষপর্যন্ত ভোটে লড়াই না করেই বিকাশ-সহ তৃণমূলের চার প্রার্থী রাজ্যসভা ভোটে জিতেছিলেন।