ঘোষণা হয়ে গিয়েছে রাজ্যসভা নির্বাচনের দিণক্ষণ। পশ্চিমবঙ্গে এ বার পাঁচটি আসনে নির্বাচন। বিধানসভার বিন্যাস বলছে, অঘটন না ঘটলে এ নির্বাচনে তৃণমূল চারটি এবং বিজেপি একটি আসন জিতবে। দু’দলের অন্দরেই প্রার্থী বাছাই নিয়ে তৎপরতা তুঙ্গে। কিন্তু বিজেপির ক্ষেত্রে সেই তৎপরতা এ বার আগের চেয়ে আলাদা। তৎপরতার ভরকেন্দ্র সরে এসেছে দিল্লি থেকে কলকাতায়। কারণ ‘অনন্ত-শিক্ষা’র পরে দিল্লি আর সমালোচিত হওয়ার ঝুঁকি নিতে চাইছে না।
রবিবার রাজ্য বিজেপির বিধাননগর কার্যালয়ে বৈঠকে বসেছিল কোর কমিটি। শমীক ভট্টাচার্য, শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদার তো ছিলেনই, ছিলেন কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকেরাও। বিজেপি সূত্রের খবর, রাজ্যসভা নির্বাচনের প্রার্থী বাছাই সংক্রান্ত আলোচনার জন্যই এই বৈঠক ডাকা হয়েছিল। তবে শুধু দলের অন্দরে আলোচনা করেই প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করবে না বিজেপি। কয়েক দিনের মধ্যেই আরএসএস-এর স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে এ বিষয় নিয়ে বিজেপির তরফ থেকে কয়েকজন বৈঠক করবেন। তার পরেই চূড়ান্ত পছন্দ দিল্লিকে জানানো হবে।
২০২১ সালের আগে পর্যন্ত এ রাজ্য থেকে কারওকে রাজ্যসভায় পাঠানোর ক্ষমতা বিজেপির ছিল না। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৭৭টি আসনে জেতায় সেই সুযোগ আসে। তার পরে প্রথম রাজ্যসভা নির্বাচন হয় ২০২৩ সালে। আর সেই নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি প্রার্থীর নাম অনেককেই চমকে দেয়। রাজবংশী সমাজের নেতা নগেন্দ্র রায় ওরফে অনন্ত মহারাজকে প্রার্থী করে বিজেপি।
কোনও দলই হিসাবের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত প্রার্থী না-দেওয়ায় অনন্ত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়ে রাজ্যসভায় পৌঁছে যান। কিন্তু রাজ্য বিজেপির একাংশ হতাশ হয়। দলের একাধিক প্রবীণ বা অভিজ্ঞ মুখ অপেক্ষায় থাকা সত্ত্বেও অনন্তকে রাজ্যসভায় পাঠানো হল! তাও আবার এমন এক নির্বাচনে, যখন প্রথম বারের জন্য বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ থেকে কারওকে রাজ্যসভায় পাঠাচ্ছে!
অনন্তকে প্রার্থী হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। রাজ্য নেতৃত্বের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন দিল্লি সে বার বোধ করেনি বলে বিজেপি সূত্রেই জানা গিয়েছিল। অনন্তকে দলের প্রার্থী হতে দেখে বিস্মিত হলেও সে সব নিয়ে কেউ মুখ খোলেননি। প্রকাশ্যে ক্ষোভ ব্যক্ত করা দূরের কথা, দলের অন্দরেও কেউ উচ্চবাচ্য করেননি। কিন্তু পরবর্তী আড়াই বছরে অনন্ত যত রকমের ‘খেলা’ দেখিয়েছেন, তা বিজেপির রাজ্য নেতাদের জন্য ‘হাতিয়ার’ হয়েছে। আর কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অস্বস্তি বেড়েছে।
কোচবিহার বা উত্তরবঙ্গকে পৃথক রাজ্য কেন করা হচ্ছে না, সে প্রশ্ন তুলে অনন্ত কখনও রাজবংশী সমাবেশে বিজেপি তথা কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকাশ্য সমালোচনা করেছেন। কখনও সংবাদমাধ্যমে বেফাঁস মন্তব্য করেছেন ওই একই বিষয়ে। পশ্চিমবঙ্গের অন্য কোনও বিজেপি সাংসদ সে মন্তব্য প্রকাশ্যে নস্যাৎ করায় অনন্ত সংসদ চত্বরেই সেই সাংসদের সঙ্গে বচসায় জড়িয়েছেন। বিজেপি সাংসদ থাকা অবস্থাতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিজের বাড়িতে আপ্যায়ন করে দলের রক্তচাপ বাড়িয়েছেন। বিধানসভা ভোটের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা পশ্চিমবঙ্গে ফের মুখ্যমন্ত্রী মমতার মঞ্চে হাজির হয়ে তাঁর হাত থেকে রাজ্য সরকারের দেওয়া পুরস্কার সানন্দে গ্রহণ করেছেন।
অনন্তকে রাজ্যসভায় পাঠিয়ে বিজেপির ছুঁচো গেলার দশা হয়েছে। না-পারছে অনন্তের এই কার্যকলাপ গিলতে অর্থাৎ মেনে নিতে, না-পারছে উগরে দিতে অর্থাৎ অনন্তের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ বা তাঁর সমালোচনা করতে। কারণ, সামনেই ভোট। অনন্তের সঙ্গে এখন দূরত্ব বাড়ালে কোচবিহারে রাজবংশী ভোটে তার কতটা প্রভাব পড়তে পারে, সে কথা বিজেপি-কে ভাবতেই হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
অনন্তকে রাজ্যসভায় পাঠানোর কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত আরএসএস-ও ভাল চোখে দেখেনি। আরএসএস-এর পূর্ব ভারত ক্ষেত্রের নেতৃত্ব ‘বিস্মিত’ হয়েছিলেন বলে সঙ্ঘ সূত্রে জানা গিয়েছিল। ২০২৫ সালের রাজ্যসভা নির্বাচনের আগে আরএসএস হাত গুটিয়ে বসেও থাকেনি। বরং পূর্ব ভারত ক্ষেত্রের এক শীর্ষ পদাধিকারী সরাসরি প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করেছিলেন। তাঁর একবগ্গা অবস্থানের কারণেই দিল্লি প্রার্থী বাছাই প্রশ্নে আর বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষায় না গিয়ে শমীক ভট্টাচার্যকে রাজ্যসভার টিকিট দিয়েছিল।
২০২৬ সালে রাজ্যসভার প্রার্থী বাছাইয়ের প্রশ্নে দিল্লি আরও বেশি সতর্ক। শুধু সঙ্ঘের নয়, রাজ্য বিজেপির মতামতেও এ বার দিল্লি গুরুত্ব দিচ্ছে। রাজ্যসভার প্রার্থী বাছতে রবিবার সন্ধ্যায় রাজ্য কোর কমিটির বৈঠকই সেই গুরুত্বের ইঙ্গিত বহন করছে। বিজেপি সূত্রের খবর, প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কোনও চমকের আশ্রয় নেওয়া হবে না। ‘ঘরের লোক’ বা ‘সঙ্ঘের আস্থাভাজন’, এই মাপকাঠিতেই এ বার রাজ্যসভার প্রার্থী বাছা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে।