গঙ্গাসাগর যাওয়ার জন্য নতুন সেতুর শিল্যান্যাস করে সোমবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, তাঁর সরকার মুখে বলে না। কাজে করে দেখায়। ১৭০০ কোটি টাকা খরচ করে চার লেনের সেতু তৈরি হওয়ার পরে গঙ্গাসাগরে যাওয়ার সমস্যা মিটবে। সে কথা জানিয়ে সরকারি কর্মসূচির মঞ্চে দাঁড়িয়ে মমতা বলেন, ‘‘এ বার সব সাগর এক বার, গঙ্গাসাগর বার বার।’’ ২০১১ সালের পর থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার পরিকাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য কী কী কাজ করেছে তাঁর সরকার, তা জানান। কত কোটি টাকার প্রকল্প হয়েছে, আরও কী কী প্রকল্পের কাজ শুরু হবে, তা-ও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। গঙ্গাসাগরে ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন, ৯ থেকে ১৭ জানুয়ারি, মেলাপর্বে কোনও পুলিশ বা প্রশাসনের আধিকারিক, কর্মী, সাংবাদিক, সাধারণ মানুষের মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারকে পাঁচ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
সোমবার গঙ্গাসাগর সেতুর শিলান্যাসের পরে মমতা জানান, এটি তৈরি হলে কাকদ্বীপের লট-৮ থেকে কচুবেড়িয়া পৌঁছোতে আর ভেসেল বা ফেরির উপর নির্ভর করতে হবে না। আগামী দু’ থেকে তিন বছরের মধ্যে এই সেতু তৈরি হয়ে যাবে। চার লেনের অত্যাধুনিক সেতু তৈরিতে খরচ পড়বে ১,৭০০ কোটি টাকা। নির্মাণের বরাত দেওয়া হয়েছে এলএনটি (লারসন অ্যান্ড টুব্রো) সংস্থাকে। তাঁর কথায়, ‘‘একটু হলেও বাংলার মানুষের জন্য, সারা বিশ্বের পর্যটকের জন্য, পুণ্যার্থীদের জন্য, সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চল-সহ সকলের জন্য গর্ববোধ করছি। আমরা মুখে বলি না। কাজে করি।’’ তিনি জানিয়েছেন, এই সেতু তৈরি হলে গঙ্গাসাগরের মানুষের ‘যন্ত্রণা’ কমবে। মমতা বলেন, ‘‘আগে বলা হত, সব সাগর বার বার গঙ্গাসাগর এক বার। এখন মানুষ বলেন, সব সাগর এক বার, গঙ্গাসাগর বার বার।’’ এই প্রসঙ্গে তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের লেখা ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন। মমতা জানিয়েছেন, সাগরসঙ্গমে এসেই উপন্যাসের নায়ক নবকুমার হারিয়ে গিয়েছিলেন। এই সেতু নির্মাণ হলে ব্যবসা, বাণিজ্যের উন্নতি হবে বলেও আশাপ্রকাশ করেছেন মমতা।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ২০১১ সালে তাঁর সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৩৭টি ছোট, মাঝারি, বড় সেতু তৈরি করানো হয়েছে। হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদীর উপরে সেতু নির্মাণের ফলে বকখালি যাওয়া যে সহজ হয়েছে, তা-ও জানিয়েছেন মমতা। তিনি জানান, সাগরদ্বীপে এখন বিদ্যুৎ পৌঁছে গিয়েছে। তাঁর সরকারের আমলে সুন্দরবন পুলিশ জেলা, তিনটে কপ্টার, একাধিক জেটি, নতুন গঙ্গাসাগর কোস্টাল থানা, কাকদ্বীপ কোস্টাল থানা তৈরি হয়েছে। পর্যটনের উন্নয়নের জন্য কী ব্যবস্থা করা হয়েছে, তা তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী। ১০০টি ডরমেটরি শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে গঙ্গাসাগরে, যার নাম সাগরকন্যা। ২০টি কটেজ তৈরি করা হয়েছে। মমতা জানিয়েছেন, নবান্নের আদলে তার নাম দেওয়া হয়েছে গঙ্গান্ন। সোমবার দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ২,৩২৪ কোটি টাকারও বেশি প্রকল্পের হয় উদ্বোধন এবং শিলান্যাস করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ক্যানিং-১, ক্যানিং-২ ব্লকে মাতলা নদীর উপরে ৬৫ কোটি টাকা খরচ করে আরসিসি সেতু তৈরি হয়েছে। তার উদ্বোধন হয়ে গিয়েছে বলে জানান তিনি। ‘আমার পাড়া আমার সমাধান’ প্রকল্পের অধীনে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার কোথায় কী কী কাজ হয়েছে, সে কথাও তুলে ধরেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানিয়েছেন, আট হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে ১০ লক্ষ টাকা করে পাবে পঞ্চায়েতের প্রতিটি বুথ। ওই প্রকল্পের ৭০-৮০ শতাংশ কাজ হয়েছে। সাধারণ মানুষ যা পরামর্শ দিয়েছেন, তা মেনে সেই টাকা খরচ করা হয়েছে। ২,০৬৩টি রাস্তার সংস্কার, ১৯০০টি রাস্তা নির্মাণের টাকা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন জেটি নির্মাণ করা হয়েছে। ৬৭ কোটি ২১ লক্ষ টাকা। বিদ্যুৎ প্রকল্পে ৫৪ কোটি ৪৯ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে। ‘আমার পাড়া আমার সমাধান’ প্রকল্পের অধীনে ৬১ কোটি টাকা আলোর জন্য দেওয়া হয়েছে। ১,৪১৫টি নিকাশি প্রকল্প এই জেলায় দেওয়া হয়েছে। দেওয়া হয়েছে পানীয় জল প্রকল্পেও। সাগর ব্লকে পানীয় জলের জন্য ৭ কোটি ৪৯ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়েছে। নিকাশি প্রকল্পে ৬ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, যা উত্ত্র ২৪ পরগনার অশোকনগরের বিধায়ক নারায়ণ গোস্বামী বলেছিলেন বলে জানান মমতা। রাজ্যের মন্ত্রী মন্টুরাম পাখিরাকেও ধন্যবাদ জানিয়েছেন মমতা।
এর পরেই মমতা কটাক্ষ করেন বিজেপি-কে। তিনি বলেন, ‘‘যাঁরা মিথ্যাবাদী লগ্নে জন্মগ্রহণ করেন, তাঁদের সত্যবাদী বলা যায় না। দুষ্টাচার, দুরাচার, অনাচার, ভ্রষ্টাচার, এটাই ওদের কাজ। আমরা কারও খারাপ চাই না। আমি ক্ষমা করে দিচ্ছি।’’ সরকারের ‘উন্নয়নের পাঁচালি’কে ‘ব্যঙ্গ’ করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘কেউ কেউ আমাদের উন্নয়নের পাঁচালি নিয়ে ঠাট্টা করার চেষ্টা করছেন। আমি বলব, তৃণমূলকে উপহাস না করে তাঁদের বিজেপিকে উপহাস করা উচিত। একবার শুধু গঙ্গাসাগরের দিকে তাকিয়ে দেখুন, তাহলেই বুঝতে পারবেন তৃণমূল কী কাজ করেছে।’’
সোমবার ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘে গিয়ে মমতা ঘোষণা করেন, মেলাপর্বে সাধারণ মানুষ বা সরকারি কর্মীদের মৃত্যু হলে তাঁর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। তিনি জানান, আগে গঙ্গাসাগরে গেলে তীর্থযাত্রীদের কর দিতে হত। তাঁর সরকার ক্ষমতায় এসে সেই কর প্রত্যাহার করেছে। এর পরেই তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে আঙুল তোলেন। জানান, কুম্ভমেলায় কেন্দ্রীয় সরকার টাকা দিলেও গঙ্গাসাগর মেলায় অনুদান দেয়নি। এসআইআরের খসড়া তালিকায় ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের মহারাজের নাম বাদ পড়ার বিষয়েও সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘এ বার পরিস্থিতি বুঝতে পারছেন! এক দিন ওরা নিজেদের নামই বাদ দিয়ে দেবে। নয়তো মানুষ ওদের নাম বাদ দেবে।’’