ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের বাণিজ্য প্রতিনিধিরা কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজ়ম (সিবিএএম)-এর প্রভাব কমাতে ইইউ-এ উৎপাদিত ইস্পাত ছাঁটের সরবরাহে বর্ধিত সহজলভ্যতার জন্য চাপ দিয়েছেন। জানুয়ারিতে কার্যকর হওয়া ইইউ-এর এই নীতির লক্ষ্য, লোহা, ইস্পাত এবং সার-সহ কিছু কার্বন-নিবিড় পণ্যের উৎপাদনকালে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাসের উপরে কার্বন শুল্ক আরোপ করা। যে-হেতু ভারত থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে পণ্য রফতানির সিংহভাগই ইস্পাত এবং লোহা থেকে জাত, ফলে এগুলি সবই পড়ছে সিবিএএম-এর আওতায়। সে ক্ষেত্রে বাড়তি শুল্কের চাপ উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ভারতীয় ইস্পাত উৎপাদনকারীদের। লক্ষণীয়, ইস্পাত এ দেশের সবচেয়ে কার্বন-নিবিড় শিল্পগুলির একটি। এমতাবস্থায় ২০৭০ সালের মধ্যে ‘নেট-জ়িরো’ নিঃসরণের লক্ষ্য অর্জনের জন্য ভারতের ক্ষেত্রে ইস্পাতের ডিকার্বনাইজ়েশন (মানবসৃষ্ট কার্বন ডাইঅক্সাইড এবং গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ হ্রাস এবং শেষ পর্যন্ত নির্মূল করার প্রক্রিয়া) বা কার্বনমুক্তকরণ একটি জরুরি পদক্ষেপ।
এই পটভূমিতে ভারত তার সবুজ ইস্পাত উদ্যোগকে আরও জোরদার করতে ২০৪৭ সালের মধ্যে উৎপাদনে ৫০% ইস্পাত ছাঁটের অংশের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করছে। সবুজ ইস্পাত হল সেই ইস্পাত যা উল্লেখযোগ্য ভাবে কম কার্বন নিঃসরণের মাধ্যমে উৎপাদিত হয় কয়লাচালিত ব্লাস্ট ফার্নেসকে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি, বৈদ্যুতিক আর্ক ফার্নেস (ইএএফ) অথবা সবুজ হাইড্রোজেন দিয়ে প্রতিস্থাপন করে। সবুজ ইস্পাত উৎপাদনে ইস্পাতের ছাঁট একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, যা গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ এবং জ্বালানি খরচ কমাতে প্রাথমিক কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সমস্যা হল, সবুজ ইস্পাতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে ভারত একাধিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। প্রথমত, ভারতীয় ইস্পাতের ৮০ শতাংশেরও বেশি কয়লা-ভিত্তিক ব্লাস্ট ফার্নেস বা ডাইরেক্ট রিডিউসড আয়রন (ডিআরআই)-এর মাধ্যমে উৎপাদিত হয়, ফলে তা বহুলাংশে জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর। দ্বিতীয়ত, পুনর্নবীকরণ শিল্প অসংগঠিত হওয়ায় ইএএফ-এর জন্য উচ্চ মানের ইস্পাতের ছাঁটের ঘাটতির কারণে এই ক্ষেত্রটি অনেকাংশেই আমদানিনির্ভর। তা ছাড়া, প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় সবুজ ইস্পাত উৎপাদন ৩০%-৫০% বেশি ব্যয়বহুল, যা একটি উল্লেখযোগ্য অন্তরায় ছোট ও মাঝারি আকারের উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে। আবার, নতুন, উচ্চ প্রযুক্তির ইস্পাত তৈরির প্রক্রিয়ায় দক্ষ কর্মীর অভাবও প্রকট।
বর্তমানে শিল্প পণ্যের কার্বন ফুটপ্রিন্টের বিষয়টি গোটা বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সে ক্ষেত্রে দেশের ইস্পাত শিল্প বৃদ্ধিতে কম-কার্বন নিঃসরণকারী ইস্পাত উৎপাদন প্রক্রিয়াগুলির সংযুক্তি কেবল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাই বৃদ্ধি করবে না, একই সঙ্গে ভারতকে তার জলবায়ু প্রতিশ্রুতি পূরণেও সাহায্য করবে। ক্রমবর্ধমান ইস্পাত চাহিদার মাঝে চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ— ভারত আজ দুইয়েরই মুখোমুখি। কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি, এই ক্ষেত্রে উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে এবং আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, বিশ্বের ইস্পাত বাজারে ভারত তার প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও উন্নত করতে সক্ষম। এখনই নীতিগত অভিমুখ স্থির করা বিধেয়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)