আমাদের ছয় জনের পরিবার। দিদু আর ঠাম্মা আমাদের সঙ্গেই থাকেন। দিদু ৮৭ আর ঠাম্মা ৯৩। মাস্ক পরা, নিয়মিত স্যানিটাইজ়েশন করার পরেও গত সপ্তাহে বাড়িতে ঢুকে পড়ল করোনা।
১ মে, শনিবার
সকাল থেকেই দিদুর শরীরটা ভাল নেই। বিকেলের দিকে বলল, গা-হাত পা ব্যথা করছে। পরে
জ্বরও এল।
২ মে, রবিবার
ঠিক করলাম, আজই কোভিড টেস্ট করাতে হবে। ফোন করলাম স্থানীয় আরটিপিসিআর
টেস্ট ল্যাবে। টেকনিসিয়ানেরা জানালেন, বাড়ি এসে নমুনা নিয়ে যাবেন। তবে সরকারি ভাবে নির্ধারিত ৯৫০ টাকা নয়, দিতে হবে ১৭৫০ টাকা করে। মোট সাত জনের নমুনা পরীক্ষায় পাঠানো হবে। তাড়াতাড়ি টেস্ট রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে না, এমনকি সব জায়গায় টেস্ট কিটও অমিল। ফলে, টাকা নিয়ে ভাবনাচিন্তা না করে লোক পাঠাতে বললাম।
৩ মে, সোমবার
দিদুর অবস্থা খারাপ হতে শুরু করেছে। পরিবারের বাকি কয়েক জনের জ্বর এল।
৪ মে, মঙ্গলবার, সকাল
দিদুর কোভিড টেস্ট রিপোর্ট নেগেটিভ। কিন্তু অক্সিমিটারে দেখা গেল, স্যাচুরেশন কম। স্ক্যানের রিপোর্ট দেখে আমাদের চিকিৎসক বললেন, দিদুর সম্ভবত ফলস নেগেটিভ। তাড়াতাড়ি হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে রোগীকে।
৪ মে, মঙ্গলবার, দুপুর
দিদুর স্যাচুরেশন নামছে। প্রায় ৮০-তে নেমে যাওয়া স্যাচুরেশন দেখে বাড়িতেই অক্সিজেন দেওয়ার কথা ভাবলাম। কারণ, চাইলেই হাসপাতালে বেড পাওয়া যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যভবনে ফোন করলে বলা হচ্ছে, ২৪ ঘণ্টা পরে ফোন আসবে। অক্সিজেনের বিভিন্ন ডিলারের কাছে ফোন করতে
শুরু করি। সবার এক কথা— অক্সিজেন নেই।
শেষে তপন সাহা নামে এক জন ফোন ধরে বললেন ১০,০০০ টাকা পাঠাতে। আধ ঘণ্টার মধ্যে
বাড়িতে সিলিন্ডার পৌঁছে দেবেন। ফেরত দেওয়ার সময়ে সিকিয়োরিটি ডিপোজিট ওই টাকা ফেরত পেয়ে যাব। তিনি ব্যাঙ্ক ডিটেলস পাঠালেন অন্য এক জনের নামে। কালবিলম্ব না করে টাকা ট্রান্সফার করলাম ওই অ্যাকাউন্টে। ফোন করতেই তিনি বললেন, ‘‘তিন ঘণ্টা পরে
সিলিন্ডার যাবে।’’
৪ মে, মঙ্গলবার, সন্ধ্যা
সিলিন্ডারের ব্যবসায়ীর ফোনটা অফ। হোয়াট্সঅ্যাপ করলে জবাব আসছে, সিলিন্ডার এলেই পৌঁছে যাবে। কিন্তু ফোন ধরছেন না কিছুতেই। দিদুর শ্বাসকষ্ট বাড়ছে। বাড়িতে আমরা অনেকেই কোভিড পজ়িটিভ। এত অসহায় আগে কখনও লাগেনি আমার!
৪ মে, মঙ্গলবার, রাত
আমার মামা সাংবাদিক। তাঁকে ফোন করে একটি বেসরকারি হাসপাতালে দিদুকে ভর্তির ব্যবস্থা করা গেল। এক জন সরকারি আধিকারিকের সাহায্যে সরকারি কোভিড স্পেশ্যাল অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবস্থা করা গেল। দিদুকে হাসপাতালে পৌঁছে যখন ফিরলাম, রাত এগারোটা। তখনও অক্সিজেন সিলিন্ডার বাড়িতে এসে পৌঁছয়নি।
৫ মে বুধবার
অক্সিজেন সিলিন্ডারের টাকা মার গিয়েছে, বুঝতে পারছি। হাসপাতালে দিদু কেমন আছে,
খবর পাচ্ছি না। দিদু কেমন আছে, এটা কি আমাদের জানানো হাসপাতালের দায়িত্ব নয়?
৬ মে, বৃহস্পতিবার
হাসপাতালে যোগাযোগ করতে না পেরে ব্যক্তিগত সোর্সে দিদুর খোঁজ নিতে চেষ্টা শুরু করলাম। দিদু বেঁচে আছে, জানতে পারলাম। অক্সিজেন ডিলারের ফোন বন্ধ। বারুইপুর থানায় অভিযোগ জানাতে ফোন করলাম। বলা হল, গিয়ে ডায়েরি করতে হবে। এই অবস্থায় কী করে যাব? আমি কোয়রান্টিনে।
৭ মে, শুক্রবার
হাসপাতাল থেকে ফোন করে জানানো হল, দিদুর জন্য থাকা মেডিক্লেমের নির্ধারিত অঙ্ক পেরিয়ে গিয়েছে। দিনে ছয়-সাত বার করে টাকা চেয়ে ফোন আসা শুরু হল। রোগীর খবর দিতে যারা এক বারও ফোন ধরে না, তারা এত বার ফোন করতে পারে! এ-ও বলা হল, নতুন করে টাকা দিয়ে অ্যাডমিশন করতে। চেনা সরকারি আধিকারিককে দিয়ে বলানোর পরে সেটা আটকানো গেল।
১১ মে, মঙ্গলবার, সকাল
বাবা আজ দিদুকে ছাড়িয়ে আনবে। হাসপাতালে বিল করার সময়ে একটা কাগজ এনে বাবাকে বলা হল, তাতে সই করতে। সেখানে লেখা, ২২ হাজার টাকার ইঞ্জেকশন দিদুকে দিতে হয়েছে। বাবা প্রতিবাদ করে বলল, চিকিৎসক এমন কোনও ইঞ্জেকশন দিদুকে দেননি। খানিক পরে কাগজপত্র ঘেঁটে ওরা জানাল, টাকাটা দিতে হবে না।
১১ মে, মঙ্গলবার
দিদু বাড়ি এসে গিয়েছে। অক্সিজেন খুঁজছি। কিন্তু যাঁকে ১০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম, তাঁর ফোন এখনও অফ।