E-Paper

প্রান্তিকের পাশে থেকেই রাস্তা খুঁজছে সিপিএম

ফলতার পুনর্নির্বাচনের ফল দলকে নতুন উদ্যমে লড়াই করতে উৎসাহ জোগাবে বলেই সিপিএম নেতৃত্বের আশা।

সন্দীপন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ২৫ মে ২০২৬ ০৭:৪৯
পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদের পরিকল্পনার প্রতিবাদে সিপিএমের শ্রমিক সংগঠনের সভা।

পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদের পরিকল্পনার প্রতিবাদে সিপিএমের শ্রমিক সংগঠনের সভা। নিজস্ব চিত্র।

শূন্যের গেরো কাটিয়ে দিয়েছিলেন ডোমকলের মোস্তাফিজুর রহমান (রানা)। কুড়ি দিনের মধ্যে বাম শিবিরে নতুন উৎসাহের হাওয়া নিয়ে এলেন ফলতার শম্ভুনাথ কুর্মি। দু’বছর আগে লোকসভা নির্বাচনে যে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে সিপিএম পেয়েছিল ২৩১৫ ভোট, সেখানে ৪০ হাজার ৬৪৫ ভোট পেয়ে এ বার তারা দ্বিতীয় স্থানে! নতুন বিজেপি সরকারের আমলে বুলডোজ়ার-রাজের প্রতিবাদে এবং বিচারাধীন ভোটারদের অধিকার ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলনের ঝাঁঝ বাড়িয়ে রাজ্যে বিরোধী পরিসরে জমি উদ্ধারে এখন এগোতে চাইছে সিপিএম।

বিধানসভা ভোটে রাজ্যে বামেদের ফল আশানুরূপ না-হলেও সিপিএম নেতৃত্ব তার মধ্যেও রুপোলি রেখা দেখছিলেন। তাঁদের আশা ছিল, তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পরে তারা দ্রুত প্রভাব হারাবে। একই সঙ্গে জোড়া প্রতিপক্ষের বদলে এর পরে বিজেপির বিরুদ্ধে সরাসরি ও মতাদর্শগত, রাজনৈতিক লড়াই হবে বামেদের। বিজেপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরেই রাজ্যের নানা জায়গায় গরিব মানুষের ঘরে বুলডোজ়ার চালানো এবং বিভিন্ন স্টেশনে পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদের প্রতিবাদে দ্রুত পথে নেমে গিয়েছে সিপিএম ও তাদের নানা গণ-সংগঠন। ফলতার পুনর্নির্বাচনের ফল দলকে নতুন উদ্যমে লড়াই করতে উৎসাহ জোগাবে বলেই সিপিএম নেতৃত্বের আশা।

পাঁচ বছর আগে ফলতায় বাম-কংগ্রেস জোটের প্রার্থী পেয়েছিলেন ৭ হাজার ৩০০ ভোট। তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’-এর ধাক্কায় এবং জাহাঙ্গির খানের দাপটে গত লোকসভা নির্বাচনে ফলতায় সিপিএম পেয়েছিল দু’হাজারের কিছু বেশি ভোট। তৃণমূল দুর্বল এবং জাহাঙ্গিরের দাপট উধাও হতেই সিপিএম ওই কেন্দ্রে ৪০ হাজার ৬৪৫ ভোট পেয়েছে, শতাংশের হিসেবে যা ১৯.৩৪%। প্রাথমিক ভাবে মনে করা হচ্ছে, ফলতার সংখ্যালঘু ভোটের বড় অংশ এ বার ঘুরে গিয়েছে সিপিএমের দিকে। জোটসঙ্গী আইএসএফের প্রভাবও সেখানে কাজ করেছে। যদিও সংখ্যালঘু প্রার্থী দিয়েও কংগ্রেস ৩.৭% ভোট পেয়েছে। তবে প্রাথমিক হিসেবেই সিপিএম নেতৃত্বের দাবি, হিন্দু এলাকাতেও দল কিছু ভোট পেয়েছে। যা আরও বাড়ানোর দিকে এখন নজর দিতে হবে, সেই অনুযায়ী কর্মসূচি নিতে হবে। একই সঙ্গে বাম নেতাদের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বালিগঞ্জে ২০২২ সালের উপনির্বাচনে বিজেপিকে তৃতীয় স্থানে ঠেলে দ্বিতীয় হয়েছিলেন সিপিএমের সায়রা শাহ হালিম। কিন্তু তার পরে সার্বিক কোনও পরিবর্তন হয়নি। ফলে, সিপিএমকে ধারাবাহিক ভাবে আন্দোলনে থাকতে হবে।

দিল্লিকে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির তিন দিনের বৈঠকে কেরল, তামিলনাড়ু, অসম, পুদুচেরির পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলেরও প্রাথমিক পর্যালোচনা হয়েছে। সেখানে উঠে এসেছে, তৃণমূলের দুর্নীতি ও অপশাসন থেকে মুক্তির তাগিদে মানুষ বিজেপিকে ভোট দিয়‌েছেন। হিন্দু ভোটেরও অভূতপূর্ব মেরুকরণ ঘটেছে। সিপিএম প্রার্থীকে ভোট দিলে তিনি জিততে পারবেন, এই বিশ্বাস মানুষ রাখতে পারেননি। তবে রাজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি যে বামেদের জন্য নতুন সুযোগও তৈরি করেছে, সেই প্রসঙ্গও এসেছে কেন্দ্রীয় কমিটিতে। বৈঠক শেষের পরে ফলতার ফলের প্রক্ষিতে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেছেন, ‘‘প্রান্তিক মানুষ তাঁদের আশ্রয়স্থল হিসেবে সিপিএমকেই বেছে নিচ্ছেন। তৃণমূল আসলে আরএসএসের একটা সাজানো বাহিনী ছিল। তারা মস্তানি-গুন্ডামি করে যা করেছে, সেখানে মানুষ তাঁদের মতামত দিতে পারতেন না। মানুষের যদি মত প্রকাশের সুযোগ থাকে এবং গণতন্ত্রকে আমরা যদি ফিরিয়ে আনতে পারি, তা হলে সেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে বামপন্থার পুনরুত্থান হবে, এটা ফলতার ফল দিয়ে বোঝা যাচ্ছে।’’

সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘‘ফলতায় ভোট শতাংশের তথ্য শেষ কথা নয়। সরকার বদলের ১৭ দিনের মধ্যে একটা পুনর্নির্বাচন মাত্র। তবে এটা পরিষ্কার যে, সাধারণ মানুষের হয়ে লড়াইয়ের ময়দানে বামপন্থীরাই। বিজেপির বিরুদ্ধে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে লড়বে লাল ঝান্ডা।’’ সিপিএম সূত্রের খবর, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় যে ২৭ লক্ষ মানুষ ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় চলে গিয়েছিলেন এবং অধিকাংশই ভোট দিতে পারেননি, তাঁদের ভোটাধিকার ফেরানোর দাবিতে জেলায় জেলায় আন্দোলনের গতি বাড়ানো হবে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মামলার জেরে ‘বিচারাধীন’ ভোটারদের ট্রাইবুনালে আবেদন করতে বলেছিল সুপ্রিম কোর্ট। এখন জেলা নির্বাচনী আধিকারিক বা জেলাশাসকের কাছে আবেদনের সুযোগ ফেরানোর আর্জি নিয়ে আদালতে যাওয়ার ভাবনাও রয়েছে তাদের।

এরই পাশাপাশি, গরিব, সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে উচ্ছেদ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ চলবে। সিপিএমের এক নেতার কথায়, ‘‘বেলেঘাটায় রাজু নস্কর, তিলজলায় জাভেদ খান বা কসবায় সোনা পাপ্পুর অবৈধ নির্মাণ ভাঙতে যে বুলডোজ়ার চলেছে, সেখানে বামপন্থীরা আটকাতে বা ওই নির্মাণ সমর্থন করতে যায়নি। গরিব মানুষের রুটি-রুজি বা মাথার ছাদ কেড়ে নেওয়া হলে আমরা শেষ পর্যন্ত লড়ব!’’ আর বামেদের নতুন আশা দেখানো ফলতার সিপিএম প্রার্থী শম্ভুনাথ (যিনি এক সময়ে ঘরছাড়া ছিলেন) বলছেন, ‘‘তৃণমূলের অত্যাচারে এত দিন মানুষ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারেননি, সিপিএমকে সমর্থনও করতে পারেননি। আমরা যে বিকল্প শক্তি, সেটা মানুষ এখন বুঝতে পারছেন।’’"

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

CPIM

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy