বেহালার ধৃত ব্যবসায়ী জয় কামদারের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ এবং কলকাতা পুলিশের কিছু আধিকারিকের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। সোমবার আদালতে এই দাবি করলেন, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) আধিকারিকেরা। জয়ের মোবাইলের বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজ এবং তাঁর ঠিকানা থেকে উদ্ধার একটি ডায়েরিতে এ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে বলে আদালতকে জানানো হয়েছে। ইডির আর্জি মেনে জয়কে এক সপ্তাহের পুলিশি হেফাজতে পাঠিয়েছেন বিচারক।
রবিবার সকাল ১১টা নাগাদ জয়কে আটক করে সল্টলেকে সিজিও কমপ্লেক্সে নিয়ে গিয়েছিলেন ইডি আধিকারিকেরা। বিকেল ৫টা নাগাদ জানা যায়, ওই ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। সোমবার জয়কে আদালতে তোলা হয়েছিল। ইডির দাবি রাজ্য ও কলকাতা পুলিশের বিভিন্ন স্তরে নিবিড় যোগাযোগ ছিল জয়ের। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার শান্তনু সিংহ বিশ্বাসও। এমনকি, শান্তনুর দুই পুত্র সায়ন্তন এবং মণীশের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল তাঁর। জয়ের কাছ থেকে পাওয়া ডায়েরিতে বিভিন্ন পুলিশ আধিকারিককে দেওয়া উপহার সংক্রান্ত তথ্য রয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে ‘শান্তনু স্যর’-এর নামও। শান্তনুর বাড়ির প্লটেই ৫এ ফার্ন রোডে জয় একটি বেআইনি নির্মাণ করছিলেন বলেও প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে। প্রসঙ্গত, রবিবার শান্তনুর বাড়িতেও দীর্ঘক্ষণ তল্লাশি অভিযান চালিয়েছিল ইডি।
আরও পড়ুন:
মোবাইলে বিভিন্ন টেক্সেট মেসেজ পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, পুলিশের বদলি প্রভাবিত করতেন জয়। ইডির দাবি, এই সূত্রে উত্তর কলকাতায় এক ওসি জয়কে ‘মাই লর্ড’ বলে সম্বোধন করেছিলেন বলেও দেখা গিয়েছে একটি হোয়াট্সঅ্যাপ মেসেজে। সান এন্টারপ্রাইজ় নামে সংস্থার ম্যানেজিং ডিরেক্টরে জয়ের বিরুদ্ধে নানাবিধ অভিযোগ উঠেছে। তাঁর সংস্থা থেকে দক্ষিণ কলকাতার ‘ত্রাস’ সোনা পাপ্পু স্ত্রীর নামে একটি আগ্নেয়াস্ত্র এবং গুলি কিনেছিলেন বলেও তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। তার উপর সোনা পাপ্পু এবং তাঁর স্ত্রীর নামে থাকা সংস্থার সঙ্গে কোটি টাকার উপর লেনদেনের নথি পেয়েছে ইডি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, জয়ের বিরুদ্ধে ১১০০ কোটি টাকা অবৈধ ভাবে লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
ইডি জানিয়েছে, জয়ের কাছ থেকে প্রাপ্ত ডিজিটাল ডিভাইস থেকে ভুয়ো সংস্থার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য মিলেছে। ক্যালকাটা গুজরাতি এডুকেশন সোসাইটির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে জয়ের ভুয়ো কোম্পানিতে ৪০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। ধৃত ব্যবসায়ীর বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খতিয়ে দেখে জানা গিয়েছে, সম্প্রতি ১১০০ কোটি টাকার লেনদেন করেছেন তিনি। তার মধ্যে চার মাসের মধ্যে ৫০০ কোটি টাকা নগদ জমা হয়েছে। জয়ের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ২৫টি ভুয়ো সংস্থার সন্ধান পেয়েছেন কেন্দ্রীয় তদন্তকারীরা। সুপ্রিম ক্রেডিট কর্পোরেশন লিমিটেড নামে একটি সংস্থার হদিস পেয়েছে ইডি। তার অন্যতম ডিরেক্টরের নাম জয়।
এ ছাড়া এসপি কনস্ট্রাকশন নামে আর একটি সংস্থার কথা জানতে পেরেছেন তদন্তকারীরা, যার মালিকানা রয়েছে সোনা পাপ্পুর নামে। ওই কোম্পানিগুলির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খতিয়ে দেখে জানা যাচ্ছে, জয় এবং সোনা পাপ্পুদের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। আবার ক্রেডিট কর্পোরেশন লিমিটেড নামক কোম্পানির সঙ্গে সোনা পাপ্পুর স্ত্রীর নামে থাকা কোম্পানি হেভেন ভ্যালি-রও আর্থিক লেনদেন হয়েছে। কিন্তু সোনা পাপ্পুর স্ত্রী সোমা পোদ্দার দাবি করেছেন, এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। রবিবার পুলিশকর্তা শান্তনুর বাড়িতে তল্লাশি চলাকালীন দুপুরের দিকে সায়ন্তনকে নিয়ে বালিগঞ্জের বাড়ি থেকে পার্ক স্ট্রিটের এক ঠিকানায় গিয়েছিলেন ইডির আধিকারিকেরা। কিন্তু কেন গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। প্রসঙ্গত, গত ফেব্রুয়ারিতে বালিগঞ্জে একটি অশান্তির ঘটনায় নাম জড়ায় সোনা পাপ্পুর । কাঁকুলিয়া রোড এলাকায় গুলিকাণ্ডে সোনা পাপ্পুর কয়েক জন সহযোগীকে গ্রেফতার করা হলেও তাঁকে হাতে পায়নি পুলিশ। ওই মামলার প্রেক্ষিতে একটি আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ পায় ইডি।