Advertisement
E-Paper

‘আপনার আশীর্বাদে ওসি হলাম’! পুলিশেও নিয়ন্ত্রণ ছিল সোনা পাপ্পুর সূত্রে ধৃত জয় কামদারের, মেসেজ তুলে ধরে দাবি ইডি-র

চার্জশিটে ইডির দাবি, কলকাতা এবং রাজ্যের একাধিক থানার পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল পেশায় ব্যবসায়ী জয়ের। পুলিশের পদোন্নতি, বদলি, এমনকি মামলার গতিপ্রকৃতিও বদলে দিতে পারেন, এমন ভাবমূর্তি তৈরি করেছিলেন তিনি।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬ ১৬:২৯
(বাঁ দিকে) সোনা পাপ্পু এবং জয় কামদার (ডান দিকে)।

(বাঁ দিকে) সোনা পাপ্পু এবং জয় কামদার (ডান দিকে)। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

কেবল শান্তনু সিংহ বিশ্বাস নয়, পুলিশ, আমলা এবং রাজনৈতিক মহলের একাংশের সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠ’ সম্পর্ক ছিল জয় কামদারের! সোনা পাপ্পুদের জমিদখল মামলার তদন্তে নেমে এমনটাই দাবি করল ইডি। ইডি জয়ের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই নগর দায়রা আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে যে, দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় ৪৭.৮৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন জয়।

চার্জশিটে ইডির দাবি, কলকাতা এবং রাজ্যের একাধিক থানার পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠ’ সম্পর্ক ছিল পেশায় ব্যবসায়ী জয়ের। পুলিশের পদোন্নতি, বদলি, এমনকি মামলার গতিপ্রকৃতিও বদলে দিতে পারেন— এমন একটা ভাবমূর্তি তৈরি করেছিলেন তিনি। অন্য আধিকারিকদের সঙ্গে পুলিশ আধিকারিকদের একাংশও তাঁর সেই ভাবমূর্তির কথা মাথায় রেখে জয়কে ‘লর্ড’, ‘মাই লর্ড’, ‘বস’ ইত্যাদি নামে ডাকতেন। গত ১৯ এপ্রিল ইডি গ্রেফতার করেছিল তাঁকে। তার পর জমিদখলের মামলার সূত্রে বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে সোনা-রূপো, মোবাইল, ডিজিটাল নথি, নগদ কোটি টাকা উদ্ধার করেন তদন্তকারীরা।

মোবাইলের চ্যাট খতিয়ে দেখে দেখে ইডির তদন্তকারীরা এক পুলিশ আধিকারিকের সঙ্গে জয়ের কথোপকথনের বিবরণ পান। ইডির ৭৭ পাতার চার্জশিটের ২৬ নম্বর পাতায় বলা হয়েছে, ওই পুলিশ আধিকারিক ওসি হওয়ার পর পদপ্রাপ্তির জন্য জয়কে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন। লিখছেন, “আপনার ভালবাসা, আশীর্বাদ এবং স্নেহে আজ ওসি হিসাবে যোগ দিলাম।” ইডি সূত্রে খবর, ২০২২ সালে ইনস্পেক্টর হওয়ার পরেও ওই পুলিশ আধিকারিককে বেশ কয়েক দিন থানার ওসি হিসাবে নিযুক্ত করা হয়নি। এই পরিস্থিতিতে এক সহকর্মীর মাধ্যমে জয়ের সঙ্গে আলাপ হয় ওই পুলিশ আধিকারিকের। ওসি হতে পারেন, এই আশা থেকেই জয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন তিনি। জয়ের বাড়ির কালীপুজোতেও গিয়েছিলেন।

ইডি সূত্রে খবর, জয়ের বাড়়ির কালীপুজোয় একাধিক পুলিশকর্মী, আধিকারিক এবং পুলিশকর্তা যেতেন। যেতেন আমলা এবং রাজনীতিকদের কেউ কেউও। দীপাবলিতে জয় আবার রুপোর বার উপহার দিতেন বলে জানতে পেরেছেন ইডির তদন্তকারীরা। ওসি হয়ে জয়কে ধন্যবাদ জানানো ওই পুলিশ আধিকারিকও ১০০ গ্রাম রুপোর বার উপহার পেয়েছিলেন। যদিও তিনি সেই উপহার ফিরিয়ে দেন বলে জানিয়েছেন ওই পুলিশ আধিকারিক।

পুলিশের একাংশের উপর জয়ের প্রভাবের আরও নজির রয়েছে বলে দাবি করেছে ইডি। দুই ব্যবসায়ী জয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের উপর প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁরা ইডিকে জবানবন্দিও দিয়েছেন। চার্জশিটের ৩৮ নম্বর পাতায় এক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন যে, তাঁকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন জয়। ওই ব্যবসায়ীর ফ্লাই অ্যাশ ইটের কারখানা রয়েছে বজবজে। তাঁর সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগাযোগ ছিল জয়ের। জয়ের বিরুদ্ধে রবীন্দ্র সরোবর থানায় অভিযোগ জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পুলিশ কোনও পদক্ষেপ করেনি বলে অভিযোগ। পরে কালীঘাট থানা থেকে এক পুলিশ আধিকারিক বদলি হয়ে রবীন্দ্র সরোবর থানায় আসেন। সেই সময়ে আবার ওই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে রবীন্দ্র সরোবর থানাতেই অভিযোগ দায়ের করেছিলেন জয়।

তার পর ওই ব্যবসায়ী জয়ের বিরুদ্ধে নালিশ করতে কলকাতার ডেপুটি পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করেন। সেই সময় বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু ওই ব্যবসায়ীর অভিযোগ, জয়ের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করেনি পুলিশ। উল্টে কালীঘাট থানায় তাঁর আইনজীবীকে ডেকে বিষয়টি মিটিয়ে নিতে বলা হয়।

আর এক ব্যবসায়ীও জয়ের বিরুদ্ধে প্রায় একই অভিযোগ করেছেন। ওই ব্যবসায়ী বেহালার একটি থানায় জয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। তবে এ ক্ষেত্রেও জয়ের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি বলে অভিযোগ। ব্যবসায়ীর অভিযোগ, থানার আধিকারিকদের সঙ্গে জয়ের ‘ভাল’ সম্পর্কের জেরেই তদন্তপ্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। পরে এন্টালি থানায় ওই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধেই পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেন জয়।

ইডি সূত্রে খবর, জয় অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেন। রবীন্দ্র সরোবর থানার পুলিশ আধিকারিকের সঙ্গে তাঁর ‘ভাল সম্পর্কের’ অভিযোগ উড়িয়ে জয়ের দাবি, তাঁরা একে অপরকে চিনতেন। ওই পুলিশ আধিকারিককে চা খেতে ডেকেছিলেন বলেও জানিয়েছেন জয়। শান্তনু সিংহ বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ এবং চ্যাটের সূত্র নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জয় জানান যে, ওই পুলিশকর্তা আর তাঁর সন্তান একই স্কুলের পড়ুয়া।

অভিযোগ, বজবজে ফ্লাই অ্যাশ ইটের ব্যবসায়ীকে পুলিশের নাম করে হুমকি দেন জয়। মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। তবে জয় যা-ই দাবি করুন, তাঁর ফোন থেকে যে ভাবে পুলিশ সংক্রান্ত নথি, পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের নম্বর পাওয়া গিয়েছে, তা থেকে তাঁর প্রভাব সম্পর্কে তদন্তকারীরা এক প্রকার নিশ্চিত।

সোনা পাপ্পু ওরফে বিশ্বজিৎ পোদ্দারের বাড়িতে ইডি তল্লাশি চালানোর পরে সেই সূত্র ধরেই উঠে এসেছিল জয়ের নাম। সোনা পাপ্পুর বিরুদ্ধে ভয় দেখিয়ে কম দামে অন্যের জমি ও সম্পত্তি হস্তগত করার অভিযোগ রয়েছে। সোনা পাপ্পুর সঙ্গে এ বিষয়ে তিন জনের চক্রের কথা আদালতে উল্লেখ করে ইডি। এই সূত্রে গ্রেফতার হন বেহালার ব্যবসায়ী জয়ও। অভিযোগ, তাঁরা জমি সিন্ডিকেট চালাতেন। অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন। তৃতীয় ব্যক্তি হিসাবে এই মামলাতেই গ্রেফতার হন কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন ডিসি শান্তনু।

ED chargesheet Sona Pappu Case
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy