বারুইপুরের জনসভার র্যাম্পে তিন জনকে তুলেছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দাবি করেন, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) খসড়া তালিকায় তাঁদের তিন জনকেই ‘মৃত’ বলে দেখানো হয়েছে। এ বার সেই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট জেলাশাসকের কাছে রিপোর্ট চাইল কমিশন। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরের তরফে জানানো হয়, ইচ্ছাকৃত ভাবে কোনও ভুল হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হবে!
বিধানসভা ভোটের লক্ষ্যে শুক্রবার থেকে জেলা সফর শুরু করছেন অভিষেক। প্রথম দিনই সভা ছিল দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে। সেই সভায় র্যাম্পে ‘চমক’ দেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। বক্তৃতার মাঝে তিনি তিন জনকে র্যাম্পে তোলেন। তাঁদের নিয়ে হাঁটেন অভিষেক। দাবি করেন, খসড়া তালিকায় তাঁরা সকলেই মৃত। ওই তিন ভোটার হলেন মনিরুল মোল্লা, হরেকৃষ্ণ গিরি এবং মায়া দাস। তাঁদের মধ্যে দু’জনের বাড়ি মেটিয়াবুরুজ এবং এক জনের বাড়ি কাকদ্বীপে।
সেই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই শোরগোল শুরু হয়। অভিষেকের বার্তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এ নিয়ে পদক্ষেপ করল কমিশন। সিইও দফতর জানায়, একই ধরনের ঘটনায় রাজ্যে এখনও পর্যন্ত ১২-১৫ জন অভিযোগ করেছেন। প্রতিটি ঘটনায় রিপোর্ট চাওয়া হয়েছে। ইচ্ছাকৃত ভাবে কোনও ভুল করা হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হবে।
কমিশন এ-ও জানিয়েছে, খসড়া তালিকা বেরিয়েছে। এটা চূড়ান্ত নয়। সেই তালিকায় কোনও ভুল থাকলে, তা অবশ্যই সংশোধন করা হবে। সব সময় সেই সুযোগ রয়েছে। তা ছাড়া, ফর্ম-৬ পূরণ করে নতুন ভাবে নাম তোলা যাবে।
খসড়া তালিকা প্রকাশের পর বর্তমানে রাজ্য জুড়ে চলছে শুনানিপর্ব। তবে রাজ্যের শাসকদলের অভিযোগ, কমিশন এসআইআর নিয়ে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে অনেক গরমিল করেছে। অনেক ভোটার জীবিত থাকা সত্ত্বেও খসড়া তালিকায় তাঁদের মৃত বলে দেখানো হয়েছে! শুক্রবারের সভা থেকে একই বিষয় উত্থাপন করেন অভিষেক। উদাহরণস্বরূপ দক্ষিণ ২৪ পরগনার তিন ভোটারকে মঞ্চে তুলে দাবি করেন, তাঁরা বেঁচে থাকা সত্ত্বেও মৃত দেখিয়েছে কমিশন। অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরেই বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপের কথা জানানো হল। কমিশন এ-ও জানিয়েছে, নাম বাদ নিয়ে তারা কোনও তথ্য গোপন করছে না। সব তথ্যই রয়েছে কমিশনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে।
বিএলওর মৃত্যু
এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন কয়েক জন বিএলও অসুস্থ হওয়ার ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। মৃত্যু হয় পাঁচ জনের। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আত্মঘাতী হয়েছেন। কেউ সুইসাইড নোটে লিখে গিয়েছেন, কারও পরিবার দাবি করেছে, এসআইআরের কাজে চাপই মৃত্যুর কারণ। সেই ঘটনায় পুলিশ এবং জেলা নির্বাচনী আধিকারিকের (ডিইও) কাছে রিপোর্ট চেয়েছিল কমিশন। তবে সিইও দফতর সূত্রে খবর, বিএলও-দের মৃত্যু নিয়ে এখনও পর্যন্ত একটিও রিপোর্ট আসেনি। জমা পড়েনি তাঁদের ময়নাতদন্তের রিপোর্টও!
রাজ্যে এখনও পর্যন্ত এসআইআর পর্বে পাঁচ জন বিএলওর মৃত্যু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরের কাজ শুরুর চার দিন পর প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। গত ৯ নভেম্বর ‘কাজের চাপে’ মৃত্যু হয় পূর্ব বর্ধমানের বিএলও নমিতা হাঁসদার। পেশায় অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী নমিতা ৮ নভেম্বর ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। পরিবারের দাবি, এসআইআরের কাজ করতে করতেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পর দিন কালনা মহকুমা হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। এর ১০ দিন পরে জলপাইগুড়িতে এক বিএলও মারা যান। অভিযোগ, কাজের চাপে আত্মঘাতী হন ডুয়ার্সের মাল ব্লকের নিউ গ্লেনকো চা-বাগান এলাকার বাসিন্দা শান্তিমুনি ওঁরাও। ৪৮ বছর বয়সি শান্তিও পেশায় অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ছিলেন। এর পরে ২১ নভেম্বর নদিয়ার কৃষ্ণনগরে আত্মঘাতী হন এক বিএলও। নাম রিঙ্কু তরফদার। ৫১ বছরের ওই বিএলও পেশায় পার্শ্বশিক্ষক ছিলেন। তাঁর দেহের পাশ থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করে পুলিশ। তার পরে মুর্শিদাবাদে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান জাকির হোসেন নামে এক বিএলও। গত ২৮ ডিসেম্বর বাঁকুড়ার রানিবাঁধে হারাধন মণ্ডল নামে এক বিএলওর আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। প্রতি ঘটনার ক্ষেত্রেই আলাদা আলাদা করে রিপোর্ট চাওয়া হয়েছিল বলে জানায় কমিশন।
আরও পড়ুন:
প্রাক্তন বাম-মন্ত্রীকে শুনানিতে তলব প্রসঙ্গ
দিন দুয়েক আগে জানা যায়, সমস্ত রকম নথি বুথ লেভেল অফিসারের (বিএলও) হাতে তুলে দেওয়ার পরেও শুনানির চিঠি পেয়েছেন বাম নেতা তথা রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়। কেন তাঁকে তলব করা হল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এ বার তা নিয়ে কমিশন জানাল, এ বিষয়ে ইআরও এবং বিএলও সঠিক ভাবে বলতে পারবেন। তবে শুনানি নিয়ে তাঁর (কান্তি গঙ্গোপাধ্যায়) কোনও অভিযোগ থাকলে কমিশনকে জানাতে পারেন। অভিযোগ এলে তা খতিয়ে দেখা হবে।
চার আধিকারিকের বিরুদ্ধে এফআইআরের নির্দেশ
ভোটার তালিকায় নাম নথিভুক্তির ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল রাজ্যের চার আধিকারিকের বিরুদ্ধে। সেই ঘটনায় আবার তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। চার জনই ডব্লিউবিসিএস অফিসার। তাঁদের মধ্যে বারুইপুর পূর্বের ইআরও এবং এইআরও হিসেবে কাজ করছিলেন দেবোত্তম দত্তচৌধুরী এবং তথাগত মণ্ডল। ময়না বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য ওই দুই দায়িত্বে ছিলেন বিপ্লব সরকার ও সুদীপ্ত দাস। তাঁদের পাশাপাশি সুরজিৎ হালদার নামে এক ডেটা এন্ট্রি অপারেটরের নামেও এফআইআর দায়ের করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেবোত্তম দক্ষিণ ২৪ পরগনার জেলা গ্রামীণ উন্নয়ন পর্ষদের ডেপুটি প্রজেক্ট ডিরেক্টর হিসাবে কাজ করেন। তথাগত জয়নগর-১ ব্লকের ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার, বিপ্লব পূর্ব মেদিনীপুরের সংখ্যালঘু বিষয়কের জেলা অফিসার, সুদীপ্ত তমলুক ব্লকের পঞ্চায়েত অ্যাকাউন্ট এবং অডিট অফিসার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।