আধিকারিকদের দল গড়ে, এসআইআরের শুনানিতে জমা পড়া নথি পুনর্যাচাইয়ের নির্দেশ জেলাশাসকদের আগেই দিয়েছিল জাতীয় নির্বাচন কমিশন। সর্বোচ্চ আদালতে এসআইআর-মামলার আবহে এ বার কমিশন তাঁদের জানিয়ে দিল, দৈনিক সেই যাচাইয়ের রিপোর্ট নির্দিষ্ট বয়ানে জমা করতেই হবে। প্রত্যেক বিধানসভা ক্ষেত্রে যাচাইয়ের নমুনা আচমকা পরীক্ষা করবেন সেখানে নিযুক্ত পর্যবেক্ষকেরাও। এত দিন পর্যন্ত জমা পড়া নথির মধ্যে পুনর্যাচাইয়ের গতি বেশ দুর্বল। আবার কোন ভোটার তালিকাভুক্ত হচ্ছেন বা কারা বাদ যাচ্ছেন, সেই ছবি এখনও স্পষ্ট নয়। তাই নির্দিষ্ট বয়ানে সেই সব তথ্য দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। ঘটনাচক্রে, ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে তৃণমূল। তার মধ্যে অন্যতম কারণ— ওয়টস্যাপ বার্তায় নির্দেশ দেওয়া। এ বার কমিশন জেলা প্রশাসনগুলির উপর এই চাপ বাড়িয়েছে লিখিত ভাবেই।
আধিকারিকদের মতে, জেলা আধিকারিকদের একাংশের ভূমিকা নিয়ে মোটেই সন্তুষ্ট নয় কমিশন। তাদের সন্দেহ, সংশ্লিষ্টরা প্রভাবিত হচ্ছেন রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক ভাবে। তাই নথি নিয়ে নিত্য বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে জেলায় জেলায়। বাড়ছে না এসআইআরের গতিও। তাই তাঁদের আইনি বাঁধনে জড়িয়ে ফেলতেই এ ভাবে রিপোর্ট তলব। সুপ্রিম কোর্টে এ রাজ্যের এসআইআর-শুনানিতে কমিশনের তরফে প্রয়োজনে দাখিলও হতে পারে সেই সব নথি। সাংবিধানিক এই কাজে প্রশাসনিক সহযোগিতা এবং সমন্বয় কতটা এ রাজ্যে রয়েছে, এর মাধ্যমে হয়তো তা তুলে ধরার লক্ষ্য রয়েছে কমিশনের। সেই দিক থেকে এই পদক্ষেপ অর্থবহ। কারণ, মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতর জেলাগুলিকে এই চিঠি এবং বয়ান পাঠালেও, তাতে কমিশনের (কম্পিটেন্ট অথরিটি) অনুমোদনের উল্লেখও করা রয়েছে।
পাল্টা প্রশ্নও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মহল থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচন কমিশন নিয়মিত নিয়ম বদলাচ্ছে। যার ফলে তৈরি হচ্ছে প্রচুর বিভ্রান্তি। তার উপরে লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সির (তথ্যে অসঙ্গতি) ক্ষেত্রে ছোটখাট ভুলচুক থেকেও ভোটারদের একাধিক বার ডাকা হচ্ছে। কমিশনের দেওয়া নথির তালিকা নিয়েও প্রচুর প্রশ্ন আছে।
কমিশন সূত্রে বলা হয়েছে, প্রথম বয়ানে রিপোর্ট পাঠাবে জেলাশাসকের অধীনে থাকা নথি পুনর্যাচাইয়ের আধিকারিক দল। সেই বয়ানে দেওয়া রয়েছে, ম্যাপড, আন-ম্যাপড, তথ্যগত গরমিলের (লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি) আওতায় থাকা ভোটারদের কত জনের আবেদনকে গ্রহণ বা বর্জন করা হল। সেই জেলার মোট ভোটারের মধ্যে কত জনকে যোগ্য বা অযোগ্য হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে, জানাতে হবে তা-ও। জেলার নাম, তারিখ, দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকের নাম-পদ এবং তাঁর সই থাকতে হবে সেই রিপোর্টে। দ্বিতীয় রিপোর্ট দেবেন জেলাশাসকেরা।
কিন্তু কেন শুধু তাঁদের উপরেই দায় বর্তাচ্ছে? কমিশন সূত্রের জবাব, “২০২৩ সালের ম্যানুয়াল অন ইলেক্টোরাল রোল অনুযায়ী জেলাশাসক তথা জেলা নির্বাচনী আধিকারিকেরাই এ কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত। গোটা দেশে কমিশনের হয়ে জেলাশাসক-সহ বাকি আধিকারিকেরাই ভোটার তালিকা বা ভোট সংক্রান্ত কাজ করে থাকেন।”
শুরুতেই কমিশনের নির্দেশ ছিল, শুনানিতে জমা পড়া সব নথি পুনর্যাচাই করে, তার বৈধতা দেখতে হবে জেলাশাসক তথা জেলা নির্বাচনী আধিকারিকদের। এক জন জেলাশাসকের অধীনে অতিরিক্ত জেলাশাসক, এসডিও ইত্যাদি পদের অফিসারদের নিয়ে জেলায় জেলায় দল গড়া হয়েছে। তৈরি হয়েছে গড়ে ২০টি করে ‘লগ-ইন আইডি’। অর্থাৎ, ইআরও এবং এইআরও-রা যে শুনানি এবং নথি জমা নেবেন, তা সফটওয়্যারের মাধ্যমে পৌঁছে যাবে জেলাশাসক এবং তাঁর দলের কাছে। যে নথি যে দফতর বা বিভাগের অধীনে, সেখান থেকে তা পুনর্যাচাই করতে হবে তাঁদের। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, নোটিস বেরিয়েছে প্রায় ৬৫.৭৮ লক্ষ, বাকি রয়েছে প্রায় ৭৪.১৯ লক্ষ। প্রায় ৩২.৪৯ লক্ষ ভোটারকে নোটিস দেওয়া হয়েছে। তা দেওয়া বাকি রয়েছে ৩৩.২৮ লক্ষকে। শুনানি হয়েছে ৯.৩০ লক্ষ ভোটারের। জেলাশাসক স্তরে বকেয়া রয়েছে প্রায় ১৪.১৪ লক্ষ। বকেয়ার মেয়াদ পাঁচ দিনের বেশি, এমন সংখ্যা প্রায় ৭.৮১ লক্ষ। যাচাই হয়েছে ৪৬,৭৯৪ জনের। ইআরও এবং এইআরও স্তরে যোগ্য নয় বলে এখনও পর্যন্ত প্রমাণিত হয়েছেন ১১,৪৭২ জন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)