মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর কাজ স্থগিত রাখার দাবি জানিয়ে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠি লিখলেও, নির্বাচন কমিশন সেই দাবি মেনে নেওয়ার কোনও কারণ দেখছে না।
নির্বাচন কমিশন সূত্রের বক্তব্য, ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নির্বাচন কমিশনের ‘দায়িত্বের’ মধ্যে পড়ে। তবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর চিঠিতে যে সব বিষয় রয়েছে, তা গুরুত্ব দিয়েই দেখা হচ্ছে। কমিশনের সংশ্লিষ্ট দফতর মুখ্যমন্ত্রীর আপত্তির জায়গাগুলির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখছে। যেহেতু মুখ্যমন্ত্রী নিজে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি লিখেছেন, তাই তার জবাব জ্ঞানেশ কুমার দেবেন বলে আশা করা যায়। কমিশন সূত্রের যুক্তি, পশ্চিমবঙ্গে ইতিমধ্যেই ৯৯.৭৪ শতাংশ এন্যুমারেশন ফর্ম বা গণনাপত্র বিলি হয়ে গিয়েছে। ৩২.০১ শতাংশ ফর্ম ‘ডিজিটাইজ়ড’ হয়ে গিয়েছে।
চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছিলেন, পরিকল্পনা ছাড়া বুথ স্তরের অফিসার বা বিএলও-দের উপরে অমানবিক ভাবে কাজ চাপানো হয়েছে। কাজের চাপে একাধিক বিএলও-র আত্মহত্যার ঘটনারও উল্লেখ করেছেন। কমিশন সূত্রের যুক্তি, বিহারের পরে এখন পশ্চিমবঙ্গ-সহ ১২টি রাজ্যে এসআইআর-এর কাজ চলছে। ৫ লক্ষ ৩২ হাজারের বেশি বিএলও কাজ করছেন। পশ্চিমবঙ্গে বিএলও-দের উপরে বাড়তি কাজের চাপ নেই। প্রত্যেক বিএলও-র উপরে গড়পড়তা ২৫০টি পরিবার এবং ৯০০ থেকে ১,০০০ জন ভোটারের দায়িত্ব রয়েছে। এই ভোটারদের ফর্ম বিলি, তা জমা নিয়ে ফর্ম ‘ডিজিটাইজ়ড’ করার জন্য ৪ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত এক মাসের সময় রয়েছে। তবে কোনও বিএলও-র উপরে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ এলে জেলা নির্বাচনী আধিকারিক তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
মমতা চিঠিতে অভিযোগ জানিয়েছিলেন, বিএলও-দের যথাযথ প্রশিক্ষণ, সহায়তা, পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি। অমিল নথি ও প্রযুক্তিগত সমস্যা ঝুঁকি বাড়িয়েছে। নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান বলছে, পশ্চিমবঙ্গে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫২৯ জন ভোটার ছিলেন। মোট ৮০,৬৮১ জন বিএলও নিয়োগ করা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলির প্রায় দেড় লক্ষ বিএলএ বা এজেন্ট কাজ করছেন। ৭ কোটি ৬৪ লক্ষের বেশি ভোটারকে ফর্ম বিলি করা হয়ে গিয়েছে। ২ কোটি ৪৫ লক্ষের বেশি ফর্ম ‘ডিজিটাইজ়ড’ হয়ে গিয়েছে। কাজের গতিতে বাকি রাজ্যগুলির তুলনায় যে পশ্চিমবঙ্গ পিছিয়ে রয়েছে এমন নয়। তা ছাড়া, এসআইআর শুরুর আগে সমস্ত বিএলও-কে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর স্থগিত রাখার জন্য যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচন কমিশনকে চিঠি পাঠিয়েছেন, তেমন কেরলেও এসআইআর স্থগিত রাখার জন্য রাজ্যের বাম সরকার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল। কেরল সরকারের যুক্তি, ডিসেম্বর মাসে রাজ্যে পুর-পঞ্চায়েত নির্বাচন পর্যন্ত এসআইআর স্থগিত রাখা হোক। আজ বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য জানতে চেয়েছে। ২৬ নভেম্বর এই মামলার শুনানি হবে।
উত্তরপ্রদেশের বরাবাঁকীর কংগ্রেস সাংসদ তনুজ পুনিয়াও উত্তরপ্রদেশে এসআইআর-কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিলেন। এর আগে পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুতেও এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে আপত্তি তুলে সুপ্রিম কোর্টে একগুচ্ছ মামলা দায়ের হয়েছে। সব মামলারই শুনানি ২৬ নভেম্বর হবে। আজ বিচারপতি সূর্য কান্ত মন্তব্য করেছেন, ‘‘তা হলে এখন সব রাজনৈতিক দলই এসআইআর নিয়ে আদালতে আসছে।’’
বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র গুরুপ্রকাশ পাসোয়ান আজ দিল্লিতে যুক্তি দিয়েছেন, সব রাজ্যেই শান্তিপূর্ণ ভাবে এসআইআর হচ্ছে। তা হলে পশ্চিমবঙ্গে কেন হবে না? তৃণমূলও বিএলও-দের ধমকাচ্ছে। নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করুক। কংগ্রেস আজ অভিযোগ তুলেছে, পশ্চিমবঙ্গ-সহ সব রাজ্যেই বিএলও-রা মানসিক চাপে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন বলে খবর আসছে। উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থানে ভোটের অনেক দেরি। সেখানে কেন এক মাসের মধ্যে এসআইআর শেষ করার জন্য চাপ তৈরি করা হচ্ছে? কংগ্রেসের প্রশ্ন, কেন একটি ঘটনাতেও নির্বাচন কমিশন শোকবার্তাপর্যন্ত জানায়নি?
কমিশনের বক্তব্য, সামগ্রিক ভাবে ১২টি রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়ায় ৫০ কোটি ৯৭ লক্ষ ভোটারের মধ্যে ৯৮.৩ শতাংশ ভোটার এনুমারেশন ফর্ম পেয়ে গিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ২৬.৭৭ শতাংশের ফর্ম ‘ডিজিটাইজ়ড’-ও হয়ে গিয়েছে। এমনিতে বিএলও-রা বছরে ১২ হাজার টাকা করে পান। এসআইআর-এর জন্য বাড়তি ৬ হাজার টাকা পাবেন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)