উত্তরবঙ্গের বৃহত্তম দুধ সরবরাহকারী সংস্থা হিমূল এখন প্রায় ১৩ কোটি ৯০ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকার মতো দেনায় দায়ে ডুবে রয়েছে বলে সংস্থা সূত্রে খবর। এই পরিস্থিতিতে কর্মীদের বকেয়া, পঞ্চম পে কমিশন, ডিএ মেটানো সম্ভব নয় বলেও কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গিয়েছে।
আর্থিক সমস্যায় ধুঁকতে থাকা হিমূলের আর্থিক অবস্থা জানতে গত বছরের শেষে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তৈরির নির্দেশ দিয়েছিল রাজ্য সরকার। সম্প্রতি হিমূল কতৃর্পক্ষ সেই রিপোর্ট তৈরি পাঠিয়েছেন। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, রিপোর্টটি খতিয়ে দেখার পরেই সংস্থাটিকে নিয়ে কী করা হবে, তার সিদ্ধান্ত হবে। রিপোর্ট পাওয়ার পরে সরকারি তরফে এখনও পর্যন্ত হিমুলকে কিছু জানানো হয়নি। এই অবস্থায় হিমূলের স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি নিয়ে রাজ্য সরকার কী করবে তা কর্মীদের কাছে এখনও স্পষ্ট নয়। সংস্থাটিকে নতুন করে কোনও বরাদ্দ দেওয়া হবে কি না, যৌথ উদ্যোগে পুনর্গঠন করা হবে কি না, বা অন্য কোনও সংস্থার হাতে হিমুলকে তুলে দেওয়া হবে কি না, তা-ও তারপরে ঠিক করা হবে।
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, সংস্থার মুখ্য কার্যনির্বাহী আধিকারিক (সিইও) তথা দার্জিলিঙের অতিরিক্ত জেলাশাসক ইউ স্বরূপ জেলাশাসকের মাধ্যমে ওই রিপোর্ট প্রাণী সম্পদ দফতরে প্রধান সচিব রাজীব সিংহকে পাঠিয়েছেন। হিমূলের চেয়ারম্যান তথা দার্জিলিঙের জেলাশাসক অনুরাগ শ্রীবাস্তব এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তবে হিমূলের সিইও ইউ স্বরুপ বলেছেন, ‘‘আমরা আর্থিক অবস্থার একটি রিপোর্ট কয়েকদিন আগেই সরকারের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি। সরকার যেমন নির্দেশ দেবে সেই মতো কাজ হবে।’’ তিনি জানান, আপাতত হিমূলের অবস্থার কিছু উন্নতি হয়েছে। দুধ সরবরাহের পরিমাণ বাড়ছে। দুধের সঙ্গে ঘি এবং পনির বাজারে আবার আনা হয়েছে। আগামী গরমের মরসুমের জন্য লস্যি এবং বিশেষ স্বাদযুক্ত দুধের কথা
ভাবা হয়েছে।
হিমূল সূত্রের খবর, বাম আমলেই বেহাল হয়ে পড়ে হিমূল। এ সরকারের আমলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। প্রায় ১ লক্ষ লিটার উৎপাদন ক্ষমতা রয়েছে হিমূলের। সেই ক্ষমতা এক সময় ৮-৯ হাজার লিটারে এসে দাঁড়িয়েছিল। যদিও এখন তা কোনও মতো দু’বেলা মিলিয়ে ১২ হাজার লিটার দাঁড়িয়েছে। সরবরাহকারীদের বকেয়া না মেটাতে পারায় দুধ সরবরাহ গত দেড় বছরে কয়েক দফায় বন্ধও হয়েছে। ১৯৯১ সালে দুধের অভাবে প্রায় দু’মাস হিমূল বন্ধ ছিল। গত বছরের শুরুতে দুধ সরবরাহের বকেয়া প্রায় ১ কোটি ৭৬ লক্ষ টাকায় এসে দাঁড়ায়। টাকা জমা না দেওয়ায় সংস্থার পাঁচটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেন পিএফ কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে এক দফায় পিএফ, বিদ্যুৎ বিল, সরবরাহকারীদের বকেয়া মিলিয়ে ৩ কোটি ৬৭ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়। তার আগে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই হিমূলের পুরানো বকেয়া ৫ কোটি টাকা দিয়েছিল। এ ছাড়া প্রতি মাসে ২০ লক্ষ টাকা দৈনন্দিন খরচের জন্য দেওয়া শুরু হয়। সেই টাকা এবং দুধ বিক্রির টাকা মিলিয়ে এখন
হিমূল চলছে।
প্রশাসনিক অফিসারদের একাংশ জানান, দীর্ঘ দিন ধরে অত্যধিক কর্মীর চাপ ছিল। তার উপরে কিছু কর্মী, অফিসারের কাজ না করার মানসিকতা থেকেই হিমূলের এই অবস্থা তৈরি হয়। তাতে মাস বেতন নেওয়া ছাড়া হিমূলের পুনর্গঠনের জন্য এক সময় কিছুই ভাবা হয়নি। এখনও ১০২ জন কর্মীর জন্য মাসে প্রায় ১৭ লক্ষ টাকা প্রয়োজন হচ্ছে। আবার দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারদের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসাবেই হিমুলের কাজ দেওয়া হয়েছে। তাতে তাঁরাও অনেকেই হিমূল নিয়ে বিশেষ উৎসাহ দেখাননি।
বর্তমানে খাদের কিনারায় এসে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন শুরু করেছে। স্থানীয় দুধ ছাড়াও বিহারের বারউনি থেকে দুধ এনে সরবরাহের পরিমাণ বাড়াতে উদ্যোগী হয়েছে কর্তৃপক্ষ। দুই দফায় প্রায় ২০০ কেজি ঘি এবং চার দফায় ৮০০ কেজি পনির তৈরি করেও আবার বাজার ধরার চেষ্টা শুরু হয়েছে।
সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য তথা শিলিগুড়ির মেয়র অশোক ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘হিমূলকে সরকারি প্রচেষ্টায় বাঁচাতেই হবে। বাম আমলে সেই চেষ্টা আমরা করেছিলাম। এমন একটা সংস্থাকে কোনওভাবেই তুলে দেওয়া যাবে না।’’