গাছে কাঁচামিঠে আম। মাঝদুপুরে চুপিসারে গুলতি নিয়ে হামলা চালাল ছেলেছোকরা। মোক্ষম টিপে একের পর এক আম ভূপতিত! গাছের ডালে বসে থাকা ডাহুক, ঘুঘু, কাঠবিড়ালি গুলতির গুলিতে কুপোকাত। খেলার উপকরণ হিসাবে এক সময়ে গ্রাম বাংলায় গুলতি ছিল জনপ্রিয়। সময়ের স্রোতে আর পাঁচটা খেলার মতো গুলতিও কার্যত অস্তিত্ব হারিয়েছে।
খেলা হিসাবে গুলতি বা স্লিংশট বিভিন্ন দেশে সমাদৃত। বহু প্রাচীন এই খেলাকে অলিম্পিক গেমসে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে ওয়ার্ল্ড স্লিংশট ফেডারেশন। ভারতেও তাকে জনপ্রিয় করার চেষ্টা চলছে। সারা বাংলা গুলতি সংস্থার (অল বেঙ্গল স্লিংশট অ্যাসোসিয়েশন) উদ্যোগে কয়েক মাস আগে হাওড়া জেলার আমতার কুশবেড়িয়ায় তৈরি হয়েছে এ রাজ্যের প্রথম গুলতি ক্লাব। ক্লাবের মাঠের একাংশ ঘিরে তৈরি হয়েছে ‘গুলতি রেঞ্জ’। চলছে অনুশীলন। ক্লাব সদস্যেরা জানান, এখানে ১০-১৫ মিটার গুলতি প্রতিযোগিতা করা যাবে।
কাঠ, প্লাস্টিক, ফাইবার গ্লাস, অ্যালুমিনিয়াম, স্টিল ইত্যাদি দিয়ে ওয়াই আকৃতির কাঠামোর দু’দিকে রবার বা ইলাস্টিক ব্যান্ড আটকে গুলতি তৈরি হয়। তা দিয়ে পাথর, গুলি ইত্যাদি ছুড়ে লক্ষ্যবস্তুতে মারা হয়। রীতিমতো বেগে সেই গুলি বা পাথর ছুটে যায় নিশানার দিকে। আমতার ওই ক্লাবের কর্তৃপক্ষ এবং সারা বাংলা গুলতি সংস্থার বক্তব্য, প্রচলিতগুলতি ছাড়াও অন্য আদলের গুলতিও তৈরি হচ্ছে। গুলতি তৈরির খরচ নগণ্য। যে কেউ কিনতে বা তৈরি করতে পারেন। মহারাষ্ট্র, গোয়া, তেলঙ্গানা, কেরলে গুলতির প্রচলন ভালই রয়েছে। তারা গুলতির সর্বভারতীয় প্রতিষ্ঠান স্লিংশট অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার সদস্য।
আমতার গুলতি ক্লাবের সভাপতি মুকুন্দ কোলে জানান, ক্লাবে বিভিন্ন ধরনের গুলতি রয়েছে। এর মধ্যে পর পর ৪০টি গুলি ছোড়ার ক্ষমতাসম্পন্ন, আংশিক স্বয়ংক্রিয় (সেমি অটোমেটিক) গুলতি রয়েছে। আছে গোল রবার গুলতি, ডান্ডা গুলতি, তির মারা গুলতি ইত্যাদি। ইতিমধ্যেই তাঁদের উদ্যোগে রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় গুলতি প্রতিযোগিতার আয়োজন করাহয়েছে। প্রতি বছর জাতীয়স্তরে প্রতিযোগিতা হয়। রাজ্যস্তরে জয়ীরা তাতে খেলার সুযোগ পায়। জাতীয়স্তরে সফল হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলার ছাড়পত্র মেলে। প্রতি বছর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ হয়।
আমতার ক্লাবে গুলতি শিখছেন সুদীপ সেনাপতি। তাঁর কথায়, ‘‘ছোট থেকেই গুলতি দিয়ে কোনও কিছু তাক করতে দারুণ লাগত। এখানে কোচের কাছে ভুলত্রুটি শুধরে নেওয়ার পাশাপাশি নিত্যনতুন কৌশলও শিখছি। ভাল ফল করতে পারলে অনেক দূর পৌঁছনোর সম্ভাবনা। তাতে আমরা আরও উজ্জীবিত।’’ সুদীপের প্রতিভার খোঁজ দিতে গিয়ে ক্লাব সভাপতি বলছেন, ‘‘গুলতি দিয়ে ৫০ মিটার দূর থেকে বোতলের ছিপিতে অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ করতে পারেন সুদীপ। এক সঙ্গে ১০টি তির ছোড়ার গুলতি সুদীপই মাথা খেটে বের করেছেন। নিজেই বানিয়েছেন।’’
পরের গাছের আম বা পাখির দিকে নয়, বিশ্বসেরা হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে গুলতি ছুড়ছে আমতার গ্রাম।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)