গোলমালের সময়ে নিজেকে প্রথমে পুলিশ আধিকারিক বলে পরিচয় দিয়েছিল। তবে হাওড়ার উলুবেড়িয়া শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে মহিলা চিকিৎসককে মারধরের হুমকি দেওয়ায় অভিযুক্ত প্রকৃতপক্ষে অস্থায়ী হোম গার্ড। তৃণমূলের বুথ স্তরের নেতাও। শেখ বাবুলাল নামে ওই ব্যক্তি এবং শেখ হাসিবুল নামে আর এক অভিযুক্তকে সোমবার রাতেই গ্রেফতার করে পুলিশ। মঙ্গলবার উলুবেড়িয়া আদালতে হাজির করানো হলে বিচারক তাদের তিন দিন পুলিশ হেফাজতে রাখার নির্দেশ দেন। আদালতে নিগৃহীত মহিলা চিকিৎসকের গোপন জবানবন্দিও নেওয়া হয়। আর জি কর কাণ্ডের পরেও সরকারি হাসপাতালে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটুকু শুধরেছে, সে প্রশ্ন তুলেছেন ডাক্তারদের একাংশ। শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর।
পুলিশ জানায়, চিকিৎসককে মারধর, প্রাণে মারার হুমকি, সরকারি কাজে বাধা দেওয়া-সহ নানা ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। পুলিশ সুপার (হাওড়া গ্রামীণ) সুবিমল পাল বলেন, “আরও কেউ জড়িত কি না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
বাবুলালের বাড়ি উলুবেড়িয়া পুরসভার ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের সিজবেড়িয়ায়। সমাজমাধ্যমে পুরসভার তৃণমূলের একাধিক সদস্যের সঙ্গে ছবি রয়েছে তার। দলের নেতাদের সঙ্গে তার ওঠাবসা ছিল বলে তৃণমূল সূত্রের দাবি। বছর দুয়েক আগে বাবুলাল অস্থায়ী হোমগার্ড পদে কাজে যোগ দেয়।
সোমবার বিকেলে মেডিক্যাল কলেজের প্রসূতি বিভাগে এক মহিলা ভর্তি হন। তাঁকে ওই মহিলা চিকিৎসক দেখতে যান। প্রসূতি যন্ত্রণায় ছটফট করছিলেন। অভিযোগ, ওই মহিলা চিকিৎসককে তিনি লাথি মারেন, শারীরিক পরীক্ষা করাতে চাননি। পরে তাঁর আত্মীয় শেখ বাবুলাল লোকজন নিয়ে হাসপাতালে হাজির হয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে বচসায় জড়ায়। মহিলা চিকিৎসকের অভিযোগ, তাঁকে মারধর করা হয়। হাসপাতাল থেকে জীবন্ত বাড়ি ফিরতে পারবেন না বলে হুমকিও দেওয়া হয়।
হাসপাতালের আর এক মহিলা চিকিৎসক অমৃতা ভট্টাচার্য বলেন, “আর জি কর-কাণ্ডের এক বছর কেটেছে। এরই মধ্যে ফের সরকারি মেডিক্যাল কলেজে এমন ঘটনা হবে, ভাবতেই পারছি না। সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, হাসপাতালের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে তা দেখতে পাচ্ছি না।” হাসপাতালে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তার দাবিতে এ দিন ‘ওয়েস্টবেঙ্গল জুনিয়র ডক্টরস ফোরাম’-এর প্রতিনিধি দল কলেজ কর্তৃপক্ষকে স্মারকলিপি দেয়।
মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক সুবীরকুমার মজুমদার বলেন, “৫২ জন নিরাপত্তারক্ষী আছেন, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। যত দ্রুত সম্ভব আরও নিরাপত্তা রক্ষীর ব্যবস্থা করা, সিসি ক্যামেরা বসানো, পর্যাপ্ত আলো লাগানোর চেষ্টা হচ্ছে।” তিনি জানান, প্রসূতি বিভাগে সিসি ক্যামেরা লাগানোর নিয়ম নেই। অন্য ক্যামেরার ফুটেজ দেখে বিষয়টি জানার চেষ্টা চলছে। পুলিশের কাছে প্রতিষ্ঠানের তরফে অভিযোগ জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্যভবনেও জানানো হয়েছে।
এ দিন বিকেলে বাবুলালের শাস্তির দাবিতে বিজেপি উলুবেড়িয়া আদালতের সামনে বিক্ষোভ দেখায়। বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বাবুলাল সম্পর্কে বলেন, “ও কোনও হোমগার্ড নয়। তৃণমূলের গুন্ডা, ক্যাডার।” রাজ্যে মহিলারা অসুরক্ষিত ও আতঙ্কিত বলে সমাজমাধ্যমে মন্তব্য করেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। হাসপাতাল সুপারের কাছে স্মারকলিপি দেয় কংগ্রেস। উলুবেড়িয়া পুরসভার প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা, সিপিএমের বিরউদ্দিন মোল্লা বলেন, “ভোটের সময়ে বুথ দখল থেকে শুরু করে গুন্ডামি—সবই করত বাবুলাল। মাথায় তৃণমূলের হাত থাকায় মহিলা ডাক্তারকে নিগ্রহের সাহস পেয়েছে।”
উলুবেড়িয়া পুরসভার ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল পুরসদস্য শুক্লা ঘোষ ফোন ধরেননি, মোবাইল-বার্তার উত্তর দেননি। তবে উপপুরপ্রধান শেখ ইমানুর রহমান ঘটনার নিন্দা করে বলেন, “বর্তমানে সবাই তৃণমূল। বাবুলাল দলের কর্মী কি না জানা নেই। খোঁজ নেব।” ওই মহিলা চিকিৎসকের স্বামী বলেন, “স্ত্রী অত্যন্ত আতঙ্কিত। জানি না, আবার কবে কাজে যোগ দিতে পারবেন।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)