দেশের প্রথম মোটরগাড়ি কারখানা, উত্তরপাড়ার হিন্দুস্থান মোটরস এক যুগ ধরে বন্ধ। হুগলিতে ভোটের পাঁচ দিন আগে উত্তরপাড়া বিধানসভা এলাকায় প্রচারে এসে সে কথা উল্লেখ করে শিল্পায়ন নিয়ে প্রতিশ্রুতি শোনালেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
কোন্নগরের অ্যালকালি মাঠে শুক্রবারের সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘‘হিন্দুস্থান মোটরস বন্ধ হয়েছে। আরও অনেক কল-কারখানা বন্ধ হয়েছে। আমরা বাংলার ক্ষমতায় আসছি। সব শিল্প ফিরে আসবে। বেকার যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থান হবে।’’ তাঁর কথায় হাততালির ঝড় ওঠে। মঞ্চে উত্তরপাড়ার পদ্ম-প্রার্থী দীপাঞ্জন চক্রবর্তী ছাড়াও দলের আরও তিন প্রার্থী শ্রীরামপুরের ভাস্কর ভট্টাচার্য, চণ্ডীতলার দেবাশিস মুখোপাধ্যায় এবং জাঙ্গিপাড়ার মধুসূদন বাগ ছিলেন।
হগলি শিল্পাঞ্চলে বহু কারখানা বন্ধ। কর্মসংস্থান নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। ভোটমুখী হুগলিতে বিভিন্ন সভা থেকে কর্মসংস্থানের কথা বলেছেন শাহ। তবে, কোনও বন্ধ কারখানার নাম করে শিল্প ফেরানোর বার্তা তাঁর এই প্রথম। শিল্পাঞ্চলে এ নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছে। বিরোধীরা অবশ্য বিষয়টিকে বিজেপির ‘ভোটের চমক’ হিসাবেই দেখছেন।
সিআইটিইউ প্রভাবিত হিন্দমোটর ওয়ার্কসম্যান ইউনিয়নের সহ-সভাপতি মণীন্দ্র চক্রবর্তীর দাবি, ‘‘এটা বিজেপির ভোট-রাজনীতি ছাড়া কিছু না।’’ তিনি বলেন, ‘‘কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও তৃণমূল সরকার বিক্রির নামে কারখানার আচ্ছাদন-সহ যন্ত্রাংশ লুটপাট করেছে। কারখানা খোলার কথাই ভাবেনি। বিজেপিও সমান। সত্যিই কিছু করতে হলে চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ কারখানায় বরাত বাড়াক। জেসপ, ব্রেথওয়েটের হাল ফেরাক।’’
হুগলি-শ্রীরামপুর সাংগঠনিক জেলা তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠন আইএনটিটিইউসি-র সভাপতি মনোজ চক্রবর্তীর প্রতিক্রিয়া, ‘‘বাম আমল থেকেই হিন্দমোটর ধুঁকছিল। তৃণমূল সরকার সেখানে টিটাগড় ওয়াগন ফ্যাক্টরি সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে হিন্দমোটরের কথা ভাবতে হবে না, আগে বাংলার বকেয়া টাকাটা ফেরত দিক।’’ কয়েক মাস আগে বন্ধ হিন্দমোটর কারখানার জমি অধিগ্রহণের বোর্ড ঝোলানো হয় রাজ্য সরকারের তরফে।
২০১৪ সালের লোকসভা ভোটের পরেই ‘সাসপেনশন অব ওয়ার্ক’ এর নোটিস ঝুলেছিল হিন্দমোটরের গেটে। তালা আর খোলেনি। যে কারখানায় দীর্ঘ ৫৭ বছর ধরে তৈরি হয়েছে অ্যাম্বাসাডর, সেখানে এখন আগাছার জঙ্গল। শেড এবং গাড়ি তৈরির যন্ত্রাংশ বিলীন হয়েছে। ট্রাকে করে মাটিও উবে গিয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
বিড়লা গোষ্ঠীর এই কারখানায় গাড়ি তৈরি শুরু হয়েছিল ১৯৫৭ সালে। গোড়ায় অ্যাম্বাসাডরের পাশাপাশি অন্য গাড়িও তৈরি হত। অ্যাম্বাসাডর দীর্ঘদিন গাড়ির বাজারে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছিল। বন্ধ হওয়ার বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই ধুঁকতে শুরু করে এই কারখানা। আধুনিক মডেলের নানা গাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতার বাজারে এঁটে উঠতে না পারাতেই হিন্দমোটরের এই হাল হয় বলে সংশ্লিষ্ট অনেকে মনে করেন।
২০০৮ সালে সিঙ্গুর থেকে ন্যানো গাড়ির প্রকল্প প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করে টাটাগোষ্ঠী। তার ছ’বছর পরে হিন্দমোটর বন্ধ হয়। সাহাগঞ্জের ডানলপের চাকাও থেমেছে। কয়েক দশকে আরও অনেক কারখানা রয়েছে বন্ধের তালিকায়।
একের পর এক চিমনির ধোঁয়া বন্ধ হওয়া ভোটমুখী হুগলিতে শিল্প-প্রতিশ্রুতির ভবিষ্যৎ কী, সেটাই দেখার।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)