রাজ্যে আবার আক্রান্ত সংবাদমাধ্যম! বুধবার হাওড়ার পিলখানায় প্রোমোটার খুনের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে আক্রান্ত হতে হল সাংবাদিকদের। রক্তাক্ত হলেন এবিপি আনন্দের প্রতিনিধি ময়ূখ ঠাকুর চক্রবর্তী। বেধড়ক মারধরে নাকের হাড় ভেঙে গিয়েছে তাঁর। এবিপি আনন্দের চিত্রসাংবাদিক উজ্জ্বল ঘোষকেও হেনস্থা করে কয়েক জন দুষ্কৃতী। এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত তিন জনকে আটক করেছে পুলিশ। থানায় রেখে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। জানা গিয়েছে,অভিযুক্ত হাওড়ার ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল যুব নেতা হারুন খানের ঘনিষ্ঠ। হাওড়া ও কলকাতার একাধিক জায়গায় অভিযান চালাচ্ছে হাওড়া সিটি পুলিশ। তবে মূল অভিযুক্তেরা এখনও অধরা।
পুলিশ সূত্রে খবর, তিন অভিযুক্তের নাম মহম্মদ বিলাল, মহম্মদ ওয়াকিল ও দিলদার হোসেন। তারা কলকাতার বউবাজার এলাকার বাসিন্দা। অভিযুক্ত হারুনের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। অভিযোগ, এই তিন জন হারুন ও রোহিতকে খুনের ঘটনার পর পালাতে ও আশ্রয় দিতে সাহায্য করেছিল। হাওড়া সিটি পুলিশের গোয়েন্দারা অভিযান চালিয়ে বুধবার রাতে তিন জনকে আটক করে। থানায় চলছে জিজ্ঞাসাবাদ।
বুধবার সকালে হাওড়ার গোলাবাড়ি থানার পিলখানা এলাকায় গুলি করে খুন করা হয় সৌফিক খান নামে এক প্রোমোটারকে। নিহতের পরিবারের দাবি, তাঁর কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেছিলেন কয়েক জন। না-দেওয়ায় কথা বলতে বলতে ‘পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ’ থেকে গুলি করা হয় প্রোমোটারকে। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় তাঁর। দুষ্কৃতীদের সঙ্গে শাসকদলের যোগ নিয়ে অভিযোগ করে বিজেপি। শুরু হয় রাজনৈতিক তরজা। অন্য দিকে, দ্রুত অভিযুক্তদের ধরা না-হলে ভোট বয়কটের ডাক দেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এই রাজনৈতিক চাপানউতর এবং উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকায় যান বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরা। কিন্তু খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে বাধা পান তাঁরা।
ঘটনাস্থল থেকে কয়েক মিটার দূরে আটকে দেওয়া হয়েছিল সাংবাদিক ময়ূখকে। কয়েক জন তাঁকে ঘিরে ধরেন। তাঁর হাতে ‘বুম’ দেখে প্রশ্ন করা হয়, ‘‘কিঁউ আয়া হ্যায় ইধার?’’ তার জবাব দেওয়ার সুযোগ পাননি ওই সাংবাদিক। চিত্রসাংবাদিক উজ্জ্বলকে ছবি তুলতে বাধা দেওয়া হয়। এক সহকর্মীর কথায়, ‘‘প্রথমে ওই সাংবাদিকের চোখ থেকে চশমা খুলে নেওয়া হয়। তাঁর মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়। তার পর মার শুরু হয়।’’ মারধরের চোটে মুখ ফাটে ময়ূখের। পরে তাঁকে হাওড়া আইএলএস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। চিকিৎসকেরা পরীক্ষানিরীক্ষা করে জানান, নাকের হাড় ভেঙেছে তাঁর।
এখন কলকাতার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে আক্রান্ত সাংবাদিকের। আনন্দবাজার ডট কম-কে তিনি ফোনে বলেন, ‘‘অফিসের অ্যাসাইনমেন্ট পেয়ে সকালে হাওড়া গিয়েছিলাম। আচমকা কিছু লোক ঘিরে ধরে। কোনও কারণ ছাড়া মারধর শুরু করে তারা। ঘটনার আগে এবং পরে পুলিশ ছিল। আক্রমণের সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ ছিল না।’’ তিনি জানান, আপাতত শারীরিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল। তবে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। চিকিৎসকেরা বেশি কথাবার্তা বলতে বারণ করেছেন। বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছেন। ইতিমধ্যে গোলাবাড়ি থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে জানান ময়ূখ।
গত জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এক পরিযায়ী শ্রমিকের ভিন্রাজ্যে মৃত্যুর ঘটনায় উত্তপ্ত হয়েছিল মুর্শিদাবাদের বেলডাঙা। সেখানে খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে আক্রান্ত হতে হয় আর একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি সোমা মাইতিকে। পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ ওঠে।
বুধবার হাওড়ার পিলখানা-কাণ্ডে এখনও উত্তপ্ত এলাকা। হাওড়ায় জি টি রোডে বাইকে আগুন ধরিয়ে দেয় উত্তেজিত জনতা। বাধা দিতে গেলে পুলিশের সঙ্গে বচসা শুরু হয়। পরে দমকল গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে। বেশ কিছু ক্ষণ রাস্তা অবরোধ করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন:
ঘটনার নিন্দা করেছেন হাওড়া মধ্য বিধানসভার বিধায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ রায়। তবে বিরোধীদের আইনশৃঙ্খলার অবনতির অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, ‘‘আগে বেশি অপরাধ হত। বর্তমানে কমিশনারেট গঠনের পর অপরাধের সংখ্যা অনেক কমে গিয়েছে। আজ যে ঘটনা ঘটেছে, তার প্রেক্ষিতে হাওড়া সিটি পুলিশের কমিশনারকে বলব, অপরাধীদের রেয়াত নয়। অবিলম্বে তাদের গ্রেফতার করতে হবে।’’ পাশাপাশি, অভিযুক্তদের সঙ্গে শাসক-যোগ অস্বীকার করেছেন অরূপ।