ছ’মাস, আট মাস বা এক বছর নয়। এ বার ৩০ দিনেই শিল্প স্থাপনের জন্য যাবতীয় সরকারি অনুমোদন মিলবে হুগলি জেলায়।
জমি অধিগ্রহণ নিয়ে রাজ্য সরকারের নীতি পাল্টায়নি। ফলে, রাজ্যে বড় শিল্প আসছে না। তার মধ্যেও নানা জেলায় ছোট-মাঝারি শিল্প স্থাপন করতে গিয়েও নানা ঝামেলার মধ্যে পড়তে হয় উদ্যোগপতিদের। কেউ জমি কিনেও জমি-মাফিয়াদের কাছে হয়রান হন। কাউকে আবার সরকারি ভাবে জমি নথিভুক্ত করাতে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন জোগাড়ের জন্য বারবার ঘুরতে হয় সরকারি দফতরে।
এ সব নিয়ে অভিযোগ হুগলি জেলাতেও বহুবার উঠেছে। বিরোধীরাও সরব হয়েছেন। প্রশাসনের কর্তাদের বিষয়টি অজানা নয়। তাই বিধানসভা ভোটের আগে সে সব ঝক্কি কমিয়ে জেলায় শিল্প স্থাপনের প্রক্রিয়া সরল করতে উদ্যোগী হল জেলা প্রশাসন। চালু করা হল ‘ইউসিসি’ (ইউনিক ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট) পদ্ধতি। অর্থাৎ, এ বার জমির মিউটেশন (নামপত্তন), কনভারসন (চরিত্র বদল) থেকে শুরু করে শিল্পের জন্য বিদ্যুৎ বা জলের সংযোগ, ব্যাঙ্ক-ঋণের ব্যবস্থা— সবই হবে একই ছাতার তলায়। জেলা ভূমি ও ভূমি সংস্কার দফতরে।
শুক্রবার ওই দফতরে এক আলোচনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলার ছোট-মাঝারি প্রায় ২৫০ জন শিল্পোদ্যোগীদের এ ব্যাপারে অবহিত করা হয়। জানানো হয়, ১৯ মে থেকে নতুন পদ্ধতিতে কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। দফতরের ওয়েবসাইটে শিল্পস্থাপনের জন্য নির্দিষ্ট আবেদনপত্র ‘ডাউনলোড’ করে পূরণ করে প্রয়োজনীয় নথিপত্র-সহ জমা দিলেই দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়ার কাজ শুরু হয়ে যাবে। এ জন্য কোনও শিল্পোদ্যোগীকে নানা দফতরে ঘুরতে হবে না।
জেলাশাসক সঞ্জয় বনশল বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী এই পদ্ধতি চালু করেছেন। এই জেলায় এর কাজ শুরু হয়ে গেলেও এতদিন শিল্পোদ্যোগীরা জানতেন না। এ দিন আমরা তাঁদের একত্রিত করে বিষয়টি জানালাম। জমি কেনা হয়ে গেলে তার নথিপত্র পরীক্ষা করে ২১ দিনের মাথায় জমির পরচা শিল্পোদ্যোগীর হাতে পৌঁছে যাবে। টাকা জমা দেওয়ার বিষয়টিও একটা জায়গায় হয়ে যাবে। এতে শিল্পোদ্যোগীরা হয়রান হওয়া থেকে বাঁচবেন। ৩০ দিনের মধ্যে যাবতীয় অনুমোদন দিয়ে দেওয়া হবে।’’
জেলাশাসক ছাড়াও এ দিনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা ও রূপায়ণ মন্ত্রী রচপাল সিংহ, অতিরিক্ত জেলাশাসক (ভূমি ও ভূমি সংস্কার) আয়েষা রানি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর) কোটেশ্বর রাও, সপ্তগ্রামের বিধায়ক তপন দাশগুপ্ত এবং ধনেখালির বিধায়ক অসীমা পাত্র। নতুন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন শিল্পোদ্যোগীরা।
বস্তুত, এ দিনের ওই আলোচনায় উপস্থিত শিল্পোদ্যোগীদের অনেকের মুখেই শোনা গিয়েছে শিল্প স্থাপন করতে গিয়ে প্রয়োজনীয় অনুমোদন জোগাড়ে আগে বিস্তর ঝক্কি পোহানোর কথা। ডানকুনির একটি পাইপ কারখানার কর্তা মৃণালকান্তি পাণ্ডে জানান, বছর পঁচিশ আগে আট বিঘা জমির উপরে কারখানাটি গড়তে গিয়ে তাঁদের জমি-মাফিয়াদের হুমকি শুনতে হয়েছিল। অনুমোদন পেতে নানা সরকারি দফতরে ঘুরে হয়রান হতে হয়েছিল।
মৃণালবাবুরা ফের একটি কারখানা গড়ার জন্য দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের ধারে জমি খুঁজছেন। নতুন ‘ইউসিসি’ ব্যবস্থায় নতুন কারখানা গড়া সহজ হবে বলে মনে করছেন মৃণালবাবু। তাঁর কথায়, ‘‘শিল্প গঠনের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপটার সরলীকরণ হয়েছে এটা খুবই ভাল। কিন্তু জমি কিনতে গেলে অস্বাভাবিক মূল্য দিতে হচ্ছে এখন। এটাই সমস্যা।’’
আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন শিল্পপতি অনিরুদ্ধ কাজোরিয়াও। তিনি গোন্দলপাড়া চটকল ও ভদ্রেশ্বরের লগন ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানার কর্ণধার। নতুন ব্যবস্থা নিয়ে তিনিও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘আগে জমি কেনা থেকে শুরু করে শিল্প গঠন— সবটার মধ্যেই অসম্ভব প্রশাসনিক জটিলতা ছিল। যেমন সময় লাগত, তেমনই হয়রান হতে হতো। এখন একটা জায়গায় কম সময়ে সেই কাজটা হয়ে যাবে, এটা খুবই ভাল।’’
তবে, রাজ্য সরকার জমি-নীতি না বদলালে শিল্পে কতটা জোয়ার আসবে তা নিয়েও এ দিনের বৈঠকের পরে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন শিল্পোদ্যোগীরা। শোনা গিয়েছে সিন্ডিকেট-রাজ নিয়ে তাঁদের উদ্বেগের কথাও।