কিন্ডারগার্টেনে ভর্তির সময় ম্যাডাম প্রশ্নটা করেছিলেন। বড় হয়ে কী হতে চাও?
কোনও কিছু না ভেবেই জবাব দিয়েছিলাম, বড় হয়ে গুলি চালাতে চাই।
তিন-চার বছর বয়সে কেন ও রকম বলেছিলাম, তা জানি না। বড় হওয়ার ফাঁকেও অনেক বার ভেবেছি। তেমন কোনও কারণ খুঁজে পাইনি। হতে পারে, ভদ্রেশ্বরে আমাদের বাড়ির পাশেই থানা ছিল বলে, ওই বয়সে পুলিশের বন্দুক ব্যাপারটা মাথায় ছিল। তাই ম্যাডাম প্রশ্নটা করতেই, মনের ইচ্ছেটা হয়তো ঝুলি থেকে বেরিয়ে পড়েছিল। অথচ, বছরখানেক আগে পর্যন্ত ভাবিইনি আমি গুলি চালাতে পারব! ন্যাশনাল পুলিশ অ্যাকা়ডেমিতে গত কয়েক মাসে ট্রেনিং-এর অংশ হিসাবে বেশ কয়েক বার গুলি চালাতে হয়েছে। আই অ্যাম জাস্ট থ্রিল্ড!
সেই স্কুলে পড়ার সময় থেকেই কী ভাবে যেন মাথায় ঢুকে গিয়েছিল, আইএএস হতে হবে। তখন থেকেই একটা ‘গোল’ ঠিক করে নিয়েছিলাম। সেই মতোই পড়াশোনা, এমবিএ, বিদেশি সংস্থার চাকরি ছেড়ে দেওয়া। প্রথম যে দিন ২০১৪-য় ইউপিএসসি-র ফাইনাল তালিকায় নিজের নাম দেখেছিলাম, সে অনুভূতিটা বলে বোঝানো পারব না। তার পর ইন্ডিয়ান রেভিনিউ সার্ভিস (আইআরএস)-এ যোগ দিয়েছিলাম। সেই ট্রেনিং নিতে নিতেই ফের পরীক্ষা দিয়ে আইপিএস-এ সুযোগ পেলাম। সে বার র্যাঙ্ক করেছিলাম ১৪১। আইপিএস-এর ট্রেনিং-এর মধ্যেই এ বারের ফল প্রকাশিত হল। তালিকায় ১৯ নম্বরে নাম উঠল। ফল জানার পর কিছু ক্ষণ কোনও কথা বলতে পারিনি।
আরও পড়ুন
ভদ্রেশ্বরের মুদির মেয়ে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় গোটা দেশে ১৯তম!
পাখির চোখ করেছিলাম ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস (আইএএস)। তাই আইআরএস-এ সুযোগ পাওয়ার পর ফের ইউপিএসসি দিয়েছিলাম। সে বার আইপিএস-এ সুযোগ পেয়ে ফের দিয়েছিলাম ওই পরীক্ষা। চাকরি পছন্দ হয়নি, সে জন্য মোটেই নয়। আমার কাছে ভাল চাকরি, খারাপ চাকরি বলে আলাদা কিছু নেই। আসলে মাথায় ছিল সেই পাখির চোখ, আইএএস। এ বার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আইআরএস বা আইপিএস— দু’ক্ষেত্রেই আমি নিজের ১০০ শতাংশ দিতে প্রস্তুত ছিলাম। এক এক চাকরিতে নিজের ভূমিকা এক এক রকমের হয়। তাই, আইএএস হিসাবেও নিজের পুরোটাই দেব। আসলে স্বপ্ন পূরণের মজাটাই আলাদা।
জন্ম থেকে পড়াশোনা সবটাই আমার পশ্চিমবঙ্গে। ভদ্রেশ্বরের প্রতি আলাদা একটা টানও অনুভব করি। পরশু দিন জেনেছিলাম, আমাকে পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারের কর্মী হিসাবে মনোনীত করা হয়েছে। খুব খুশি হয়েছিলাম। তার পরেই তো কাল নতুন খবরটা পেলাম। আমাকে কোথায় কাজ করতে হবে, এখনও তা জানি না। তবে, এ ক্ষেত্রেও পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডার হতে পারলে ভাল লাগবে। নিজের রাজ্যে কাজ করতে পারলে, নিজের রাজ্যের উন্নয়নে সামিল হতে পারলে ভাল তো লাগবেই!
ভবিষ্যতে যাঁরা এই পেশায় আসতে চান, তাঁদের আগে থেকে গোলটা ঠিক করে রাখতে হবে। এক এক জনের প্রস্তুতির পদ্ধতি এক এক রকমের। তবে লক্ষ্যে স্থির থাকলে সাফল্য আসবেই। আমার যেমন প্রথম থেকেই মনে হত, এই দেশ আমাকে নিজস্ব পরিচয় দিয়েছে। কাজেই দেশকেও আমার কিছু দেওয়ার আছে। দেশের উন্নয়নে আমাকে অংশ নিতে হবে। সেই মানসিকতাকেই তিল তিল করে বড় করেছি।
দূর হায়দরাবাদে বসে এই মুহূর্তে বাবা-মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। গত বছরের ডিসেম্বরে শেষ বার ওঁদের সঙ্গে দেখা হয়েছে। ছোটবেলার দিনগুলিও কেমন ভিড় করে আসছে। কবে যে ভদ্রেশ্বরে গিয়ে ওঁদের দেখব! আপাতত সেই আশাতেই আছি।
অনুলিখন