পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আবহে কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় গণপরিবহণ ব্যবস্থা বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। ভোটের কাজের জন্য এমনিতেই অনেক বেসরকারি বাস রাস্তা থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহণ দফতরের আরও একটি অভ্যন্তরীণ বিষয়। পরিবহণ দফতরের একটি সূত্র থেকে জানা গিয়েছে, ফিটনেস সার্টিফিকেট (সিএফ) বা যান্ত্রিক সক্ষমতার শংসাপত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ৩৯৭টি সরকারি বাস রাস্তায় নামানো বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন।
পরিবহণ দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, মোট ৩৯৭টি বাস বর্তমানে বিভিন্ন ডিপোতে বসিয়ে রাখা হয়েছে। গত ১৩ জানুয়ারি তপসিয়ায় একটি গুরুতর বাস দুর্ঘটনার পর রাজ্য প্রশাসন তদন্তের নির্দেশ দেয়। সেই তদন্তেই উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য— একাধিক বাস দীর্ঘ দিন, এমনকি কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রায় এক দশক ধরে বৈধ সিএফ ছাড়াই রাস্তায় চলাচল করছিল। এই অনিয়ম সামনে আসতে একযোগে বাসগুলি পরিষেবা থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন নিত্যযাত্রীরা। ইতিমধ্যেই জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে অটো ও তিনচাকার যানবাহনের সংখ্যা কমে গিয়েছে। তার উপর সরকারি বাসের সংখ্যা হঠাৎ করে এতটা কমে যাওয়ায় বহু গুরুত্বপূর্ণ রুটে পরিষেবা প্রায় ভেঙে পড়েছে। কোথাও কোথাও যেখানে আগে ৮-১০টি বাস চলত, এখন সেখানে মাত্র ১ বা ২টি বাস দেখা যাচ্ছে। ফলে অফিস টাইমে যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রেই ভিড় ঠেলে যাতায়াত করতে হচ্ছে। বাধ্য হয়ে অনেকেই অ্যাপ-ক্যাব বা বাইক ট্যাক্সির মতো ব্যয়সাপেক্ষ বিকল্প বেছে নিচ্ছেন।
আরও পড়ুন:
পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত সমস্যা। বিভিন্ন ডিপোতে বকেয়া বিলের জেরে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে যে বাসগুলি এখনও সচল রয়েছে, সেগুলিও নিয়মিত চালানো সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক বাসগুলির ব্যাটারি পুরনো হয়ে পড়েছে এবং নতুন সিএনজি বাসগুলিতেও যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ১০০০ কিলোমিটার অন্তর যে রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন, তা দীর্ঘ দিন ধরেই সঠিক ভাবে করা হয়নি বলে অভিযোগ।
অন্য দিকে, সিএফ ছাড়াই বাস চালানোর কারণে বিপুল অঙ্কের জরিমানার মুখে পড়েছে পরিবহণ নিগম। প্রতিদিন ৫০ টাকা করে জরিমানা ধার্য হওয়ায় বছরের পর বছর ধরে তা জমে এখন কয়েক কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই বিপুল জরিমানার বোঝা থেকে রেহাই পেতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সরকারের কাছে তা মকুবের আবেদন জানাতে চলেছে বলে সূত্রের খবর। সব মিলিয়ে প্রশাসনিক গাফিলতি, আর্থিক সঙ্কট এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাব— এই তিনের জেরে কলকাতার গণপরিবহণ ব্যবস্থা বর্তমানে গভীর সঙ্কটের মুখে। দ্রুত সমাধান না হলে যাত্রীদুর্ভোগ আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। ৪ মে ভোটগণনা শেষ হয়ে গেলে বেসরকারি বাস আবার পরিষেবা দেওয়া শুরু করবে। তাতে সাধারণ মানুষকে অনেকটাই সুরাহা দেওয়া যাবে বলে মনে করছেন পরিবহণ দফতরের কর্তারা।