কোচবিহার থেকে চাঁচল শিলান্যাসের হিড়িক থেকে বাদ যাচ্ছে না নর্দমার গার্ড ওয়াল থেকে বাতিস্তম্ভও। হরিশ্চন্দ্রপুরের গত সপ্তাহে একটি নর্দমার গার্ড ওয়ালের শিলান্যাস হয়েছে, আবার আলিপুরদুয়ার শহরের একটি লম্বা বাতিস্তম্ভের উদ্বোধন অনুষ্ঠানও দেখেছেন শহরবাসী। বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, সারা বছরই এমন অনেক কাজ চলতেই থাকে, ভোটের মুখে জনপ্রতিনিধিরা কাজ দেখাতে ছোট প্রকল্পের শিলান্যাস বা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানও করছেন ঘটা করে। উত্তরবঙ্গের সাত জেলার ছোট-বড় সব শিলান্যাস প্রকল্প ধরলে গত দু’সপ্তাহে ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গিয়েছে বলে প্রশাসনিক কর্তাদের দাবি। মন্ত্রী থেকে শুরু করে বিধায়ক, পুরসভা থেকে জেলা পরিষদ-গ্রাম পঞ্চায়েত সব দফতরই একাধিক প্রকল্পের উদ্বোধন-শিলান্যাস অনুষ্ঠান চলছে।
ভোটের মুখে তড়িঘড়ি শিলান্যাসের আয়োজনে বিভ্রান্তিও ঘটছে। গত মাসের শেষে মাথাভাঙার পচাগড় কৃষি খামারের জমিতে পলিটেকনিক কলেজ ভবনের নির্মাণ কাজের সূচনা করেছিলেন বনমন্ত্রী বিনয় বর্মন। যদিও বছর দু’য়েক আগেই সেই প্রকল্পের শিলান্যাস সেরে রেখেছিলেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী গৌতম দেব। বিনয়বাবু অবশ্য এ দিন দাবি করেছেন, বছর দু’য়েক আগে গৌতমবাবু শিলান্যাস করেছিলেন, গত সপ্তাহে তিনি কাজের সূচনা করেন। শিলান্যাস এবং সূচনার মধ্যে অর্থের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে বলে বনমন্ত্রীর দাবি। হলদিবাড়ি কলেজের ঘটনা অবশ্য আরও মজাদার বলে বিরোধীরা দাবি করেছেন। এ দিন বৃহস্পতিবার মন্ত্রী গৌতমবাবু কলেজের নতুন ভবনের শিলান্যাস করেছেন, যদিও গত সপ্তাহে কলেজের নির্মাণের ভিত পুজো হয়ে গিয়েছে। সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তুফানগঞ্জের বিধায়ক অর্ঘ্য রায়প্রধান। বিরোধীদের দাবি, সেদিন একবার শিলান্যাস হয়েছিল। যদিও, অর্ঘবাবুর দাবি, ‘‘কোনও শিলান্যাস অনুষ্ঠান হয়নি। আমি তো শুধু প্রসাদ খেতে গিয়েছিলাম।’’
গত সপ্তাহ থেকেই কোচবিহার জুড়ে রাস্তা, মার্কেট কমপ্লেক্স, পানীয় জল প্রকল্পের কাজের সূচনার কাজ উদ্বোধন শুরু হয়। বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ঘোষ থেকে বনমন্ত্রী বিনয়বাবু, দিনহাটার বিধায়ক উদয়নবাবু সকলেই কোনও না কোনও প্রকল্পের শিলান্যাস করেছেন। রাস্তা-নদী-নর্দমার সংস্কারের নানা প্রকল্পের মতো প্রবীণ নাগরিকদের জন্য পার্কও ঢুকেছে ভোটের মুখে শিলান্যাসের তালিকায়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মেটেলিতে প্রবীণদের জন্যে তৈরি পার্কের শিলান্যাস করেন নাগরাকাটার কংগ্রেস বিধায়ক জোসেফ মুন্ডা।
শিলান্যাসের পরে দলের কর্মী সমর্থকদের একাংশের ক্ষোভের মুখেও পড়তে হয়েছে নেতাকে। সে উদাহরণ দক্ষিণ দিনাজপুরের। গত ২১ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ দিনাজপুরের হরিরামপুরে কিসানমান্ডির দ্বিতীয়বার শিলান্যাস করে দলে তুমুল বিতর্কের মুখে পড়েন এলাকার বিধায়ক তথা ভূতপূর্ব তৃণমূল জেলা সভাপতি বিপ্লব মিত্র। প্রতিবাদে সোনা পাল অনুগামীদের বিক্ষোভ সামলাতে র্যাফ নামাতে হয় জেলা পুলিশ কর্তৃপক্ষকে। গত বছর ২৯ ডিসেম্বর তপনের বাঘইট এলাকায় সরকারি অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হরিরামপুরের কিসান মান্ডিটির শিলান্যাস করেছিলেন।
জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার দার্জিলিঙেও দেদার প্রকল্পের শিলান্যাস হয়েছে গত দু’সপ্তাহে। শাসক দলের দখলে থাকা পুরসভা জেলা পরিষদগুলির প্রকল্পেরই পাল্লা ভারি। তবে বামেদের দখলে থাকা জলপাইগুড়ি জেলা পরিষদ, শিলিগুড়ি পুরসভা, মহকুমা পরিষদেরও নানা প্রকল্পের শিলান্যাস হয়েছে। গৌতমবাবু অবশ্য দাবি করেছেন, ‘‘আরও অনেক প্রকল্প ছিল, যেগুলির শিলান্যাস এখুনি সম্ভব হল না। তবে অনুষ্ঠান করা আমাদের প্রধান লক্ষ্য নয়। সারা বছরই মানুষের জন্য কাজ করেছি।’’ শিলান্যাস নিয়ে একই সুর শোনা গিয়েছে বিরোধীদের গলাতেও। মালদহের সিপিএমের জেলা সম্পাদক অম্বর মিত্র বলেন, ‘‘আমাদের দলের বিধায়কেরা সারা বছরই মানুষের জন্য কাজ করেন। তবে তৃণমূল নেতারা ভোট এলে শিলান্যাস করতে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েন।’’