আবর্জনা ছড়ি য়ে দূষণ শুরু হয়েছিল পর্যটন উৎসবের পর থেকেই। দিন যত গড়িয়েছে পিকনিক করতে আসা লোকজনের ফেলে যাওয়া আবর্জনায় দূষণের মাত্রা বেড়েছে জয়চণ্ডী পাহাড়ে। কিন্তু আবর্জনা সাফাইয়ের দায়িত্ব কে নেবে সে ব্যাপারে এখনও কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি পুরসভা বা প্রশাসন। স্থানীয় কিছু বাসিন্দা নিজেদের উদ্যোগে আবর্জনা সাফাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু পাহাড়ের প্রায় সর্বত্র জুড়ে যে ভাবে আবর্জনা ছড়িয়ে রয়েছে কয়েকজনের পক্ষে তা সাফাই করা আদৌ সম্ভবপর নয়। তাই স্থানীয় বাসিন্দারা চাইছেন পুরসভা বা প্রশাসন উদ্যোগী হয়ে আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ দ্রুত শুরু করুক। রঘুনাথপুরের মহকুমাশাসক সঞ্জয় পাল এবং পুরপ্রধান ভবেশ চট্টোপাধ্যায় দু’জনেই আশ্বাস দিয়েছেন, জয়চণ্ডী পাহাড়ের আবর্জনা পরিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যদিও কাজ এখনও শুরু হয়নি।
শীতে পিকনিকের মরসুম শুরু হওয়ার পর থেকেই জেলার পর্যটনস্থানগুলিতে শোলা বা পাতার থালা, প্লাস্টিকের গ্লাস, সব্জির খোসা, মুরগির পালকের মতো আবর্জনা ছড়িয়ে পরিবেশ প্রায় নরক করে তুলেছে। এমনটা বরাবরই হয়। তবে ওই এলাকার বাসিন্দাদের মতে, এ বার আবর্জনার পরিমাণ গত কয়েক বছরের তুলনায় অনেকটাই বেশি। জয়চণ্ডী পাহাড়ের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মতে, পিকনিকের সঙ্গে এ বার যোগ হয়েছে পর্যটন উৎসব। পাহাড়ের কোলে পাঁচদিন ধরে চলা এই উৎসবে প্রচুর খাবারের দোকান এসেছিল। ঠেলাগাড়িতে ছিল ফুচকা, ঘুগনি, চাট, চপের সম্ভার। অভিযোগ দোকান ও ঠেলাগাড়ির খাবারের প্লেট, ঠোঙা, প্লাস্টিকের গ্লাসে আবর্জনা আরও বেড়েছে।
ট্রেকারদের অন্যতম পছন্দের এই জয়চণ্ডী পাহাড়ে সম্প্রতি ঘুরতে গিয়ে দেখা গিয়েছে যত্রতত্র ছড়িয়ে রয়েছে শোলার প্লেট, প্লাস্টিকের গ্লাস। পাহাড়ের সামনের দিকে পর্যটন উৎসব যেখানে হয়েছে, সেই সত্যজিৎ রায় মঞ্চ-সহ পাহাড়ের পিছনের অংশের বাগ লাইন এলাকায় আবর্জনার পরিমাণ বেশি।
স্থানীয় নন্দুয়াড়া গ্রামের বাসিন্দা নন্দদুলাল চক্রবর্তী জানান, প্রতিদিন ভোরে পাহাড়ে তাঁরা কয়েকজন প্রাতঃর্ভ্রমণ করতে যান। কিন্তু দিন দিন যে ভাবে আবর্জনা জমেছে সকালে পাহাড়ে যেতেই তাঁদের ইচ্ছা করে না। তাঁর দাবি, ‘‘পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে জমে থাকা আবর্জনায় এলাকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে দেখে আমরা কয়েকজন প্রাতঃর্ভ্রমণকারী আবর্জনা সরিয়ে এক জায়গায় জমা করে পুড়িয়েছিলাম। কিন্তু চারপাশে যে ভাবে আবর্জনার স্তূপ তৈরি হয়েছে যে তা কয়েকজনের পক্ষে সাফ করা সম্ভব নয়।’’ ওই বাসিন্দাদের কথায়, পর্যটন উৎসবের পর থেকেই পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় আবর্জনা জমতে শুরু করেছিল। তার উপরে দৈনিক ২০টির বেশি পিকনিক দল এসে আবর্জনা ফেলে রেখে গিয়েছে। তাই পাহাড়ের পরিবেশ ঠিক রাখতে গেলে পুরসভা ও প্রশাসনের তরফে সামগ্রিক ভাবে উদ্যোগের প্রয়োজন।
পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকায় আবর্জনা জমে কী ভয়াবহ চেহারা নিয়েছে সম্প্রতি তা দেখে এসেছেন রঘুনাথপুরের মহকুমাশাসক। তাঁর পর্যবেক্ষণ, পিকনিক করতে আসা লোকজনের মধ্যে সচেতনতার অভাবেই পাহাড় দূষিত হচ্ছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের তরফে কি করণীয় কিছুই নেই? জবাবে এসডিও বলেন, ‘‘পিকনিকের মরসুমে একদিন আবর্জনা পরিষ্কার করলে পরের দিনই আবার নতুন পিকনিকের দল এসে ময়লা ফেলে যাবে। পিকনিক কমলেই পাহাড়ে সামগ্রিক ভাবে সাফাই অভিযান করা হবে।”
তবে স্থানীয় লোকজনের দাবি, পাহাড়ে কয়েকটি সিমেন্টের স্থায়ী ডাস্টবিন প্রশাসন তৈরি করে দিলে দূষণ অনেকটাই কমা সম্ভব। মহকুমাশাকের আশ্বাস, ডাস্টবিন তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের আরও অভিযোগ, পাহাড়ের একাংশ পড়ে রঘুনাথপুর পুরএলাকার মধ্যে। অন্যদিকটা আবার বাকি এলাকা পঞ্চায়েতের অন্তর্ভুক্ত। ফলে জায়গা নিয়ে সমস্যা থাকায় পুরসভা বা পঞ্চায়েত কেউই পাহাড়ে জমে থাকা আবর্জনা পরিষ্কারের ব্যাপারে কার্যকরী ব্যবস্থা নেয় না।
পাশাপাশি পাহাড়ে প্লাস্টিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা বা পাহাড়ের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন করার মতো বোর্ড লাগিয়ে সচেতনতা প্রচারের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে পুরসভার চেয়ারম্যান তথা জয়চণ্ডী পর্যটন উৎসব কমিটির সম্পাদক ভবেশ চট্টোপাধ্যায় এই অভিযোগ মানতে নারাজ। তাঁর দাবি, ‘‘উৎসবের সময়ে পাহাড় পরিচ্ছন্ন রাখার আবেদন জানিয়ে বোর্ড লাগানো হয়েছিল। কিন্তু কিছু দুষ্কৃতী সেগুলি তুলে ফেলে দিয়েছে।’’ পাহাড়ের আবর্জনা পরিষ্কারের বিষয়ে কি উদ্যোগ নিচ্ছে উৎসব কমিটি বা পুরসভা? ভবেশবাবু বলেন, ‘‘এ নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশাসনের সঙ্গে কথা হয়েছে। পর্যটন কমিটি পুরসভা ও প্রশাসনের সাহায্যে আবর্জনা পরিষ্কার করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।” তবে পিকনিকের মরসুম শেষ হওয়ার পরেই সাফাই অভিযান হবে বলে জানাচ্ছেন ভবেশবাবু।