Advertisement
E-Paper

সই-কাণ্ডে আজই হাজিরার নির্দেশ অভিষেককে! ‘ওর জন্য দল শেষ হয়েছে’, ঔদ্ধত্যে চটে মামলা থেকে সরলেন কল্যাণ

বিচারপতি কৌশিক চন্দের নির্দেশ, বৃহস্পতিবারই সিআইডি-র তলবে সাড়া দিয়ে হাজিরা দিতে হবে অভিষেককে। দু’সপ্তাহ পরে এই মামলার পরবর্তী শুনানি। এই সময়ের মধ্যে অভিষেকের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করতে পারবে না সিআইডি।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ ১১:৫৭
(বাঁ দিকে) অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)।

(বাঁ দিকে) অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।

তৃণমূল বিধায়কদের সই জাল সংক্রান্ত মামলায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে আজই সিআইডি-র কাছে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ দিল কলকাতা হাইকোর্ট। অভিষেক এখন দিল্লিতে। তৃণমূল সূত্রে খবর, বিকেল চারটে নাগাদ কলকাতায় ফিরে সন্ধ্যা ছ’টার মধ্যে ভবানী ভবনে সিআইডি দফতরে যাবেন তিনি। দু’সপ্তাহ পরে মামলার পরবর্তী শুনানির মধ্যবর্তী সময়ে অভিষেকের বিরুদ্ধে কোনও কড়া পদক্ষেপ করা যাবে না বলেও নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

আদালতের এই নির্দেশে অভিষেক আপাতত স্বস্তি পেলেও এ দিনই তাঁর অস্বস্তি বাড়িয়েছেন তৃণমূলের আইনজীবী সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিষেকের বিরুদ্ধে ‘ঔদ্ধত্যের’ অভিযোগ এনে রক্ষাকবচ মামলা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে কল্যাণের বিস্ফোরক মন্তব্য, ‘‘ওর জন্যই দলটা শেষ হয়ে গিয়েছে!’’

প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে, বিকেল ৪টে নাগাদ দিল্লি থেকে ফিরছেন অভিষেক। সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে তাঁকে সিআইডি দফতর ভবানী ভবনে হাজির হতে হবে। তদন্তের প্রয়োজনে তদন্তকারী সংস্থা আইন মেনে পদক্ষেপ করতে পারবে।

বৃহস্পতিবার কলকাতা হাই কোর্টে অভিষেকের এই মামলায় আইনজীবী হিসাবে সওয়াল করার কথা ছিল কল্যাণের। কিন্তু শুনানির আগে মামলা থেকে সরে দাঁড়ান শ্রীরামপুরের তৃণমূল সাংসদ। এই মামলায় অভিষেকের হয়ে আদালতে সওয়াল করেন অয়ন ভট্টাচার্য। শুধু কল্যাণ নন, কল্যাণের ছেলে শীর্ষণ্য বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অন্য জুনিয়র আইনজীবীরাও মামলা থেকে সরে দাঁড়ান।

এই প্রসঙ্গে কল্যাণের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে শ্রীরামপুরের সাংসদ আনন্দবাজার ডট কম-কে বলেন, “আমি অভিষেকের মামলা ছেড়ে দিয়েছি। কী উদ্ধত রে বাবা! কাল (বুধবার) আমি ওর মামলার কথা আদালতে উল্লেখ করলাম। মমতাদির বাড়িতে সিআইডি-র যাওয়ার বিষয়টিও তুললাম। অভিষেকের মামলাটা কোনও কারণে কাল কোর্ট শোনেনি। আমরা বিচারপতি কৌশিক চন্দকে বলি, এটা জরুরি ভিত্তিতে শুনুন। আজ শুনানি হত।” তার পরেই কল্যাণের সংযোজন, “কাল রাত সাড়ে ১২টায় আমার ছেলেকে ফোন করে বলা হয়েছে, জুনিয়রস্য জুনিয়র অয়ন এই মামলায় সওয়াল করবে। আমি বলে দিয়েছি এর (অভিষেক) সঙ্গে থাকব না। এই পেশায় ৪৫ বছর আছি। এই উদ্ধত মনোভাব মেনে নেব না। আমি মমতাদিকে বলব, হয় অভিষেককে রাখুন, আমাদের ছেড়ে দিন। নয় আমাদের রাখুন, অভিষেককে সরান।” একই সঙ্গে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদককে নিশানা করে কল্যাণ বলেন, “ওর জন্য দলটা শেষ হয়েছে। তার পরেও উদ্ধত ভাব যায়নি।”

সম্প্রতি অভিষেকের বিরুদ্ধে সরব হয়ে বিদ্রোহী হয়েছেন দলের একাধিক সাংসদ এবং বিধায়ক। বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য অভিষেকের দল পরিচালনার নীতিকেই কাঠগড়ায় তুলেছেন তৃণমূলের একাধিক নেতা। কিন্তু দলের দুর্দিনেও মমতার সঙ্গে রয়েছেন কল্যাণ। প্রায় নিয়ম করে প্রতি দিন আক্রমণ শানাচ্ছেন বিদ্রোহীদের। এই অবস্থায় অভিষেকের ‘ঔদ্ধত্যে’ চটলেন মমতার আস্থাভাজন হিসাবে পরিচিত কল্যাণও।

সই জাল কাণ্ডে সিআইডি-র আতশকাচের নীচে রয়েছেন অভিষেক। অভিযোগ ওঠে, অভিষেক বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুর কাছে তৃণমূল বিধায়কদের সই করা যে চিঠি পাঠান, তাতে কয়েক জন বিধায়কের সই ‘জাল’ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, যে বৈঠকে বিধায়কদের সই সংগ্রহ করা হয়েছিল, সেটা হয়েছিল কালীঘাটে তৃণমূলনেত্রী মমতার বাড়ি সংলগ্ন দলীয় কার্যালয়ে। সূত্রের খবর, সে দিনের বৈঠকে ঠিক কী ঘটেছিল, কারা উপস্থিত ছিলেন, কারা সই করেছিলেন— এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তদন্তকারীরা মঙ্গলবার মমতার বাড়ি লাগোয়া ওই কার্যালয়ে যান। সেখানকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহও করতে চায় সিআইডি।

সই-কাণ্ডের তদন্তের সূত্র ধরে গত ৩০ মে প্রথম অভিষেকের কালীঘাটের বাড়িতে যায় সিআইডি। ১ জুন তৃণমূল সাংসদকে হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অভিষেক হাজিরা না-দিয়ে সিআইডির থেকে ১৪ দিনের সময় চান। তবে সিআইডি অভিষেককে সময় দেয়নি। ১ জুন আবার কালীঘাটের বাড়ি গিয়ে সাত দিনের মধ্যে হাজিরার নির্দেশ সংবলিত নোটিস দিয়ে আসে সিআইডি। কিন্তু সোমবারও হাজিরা দেননি অভিষেক। সোমবার তাঁর কালীঘাটের বাড়িতে গিয়ে তৃতীয় নোটিস ধরিয়ে আসে সিআইডি। মঙ্গলবারই হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল অভিষেককে। তখন তিনি অবশ্য দিল্লিতে। মঙ্গলবার দুপুরে কালীঘাটে তৃণমূলের কার্যালয়ে যায় সিআইডি-র দল। আদালতের নির্দেশ, বৃহস্পতিবারই সিআইডি-র দফতরে হাজিরা দিতে হবে অভিষেককে।

কী এই সই-কাণ্ড?

বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা, উপদলনেতা এবং মুখ্যসচেতক কে হবেন, এ নিয়ে পরিষদীয় নিয়মের জটিলতায় পড়তে হয়েছে প্রাক্তন শাসকদলকে। ৪ মে ভোটের ফলঘোষণার পরে ৬ মে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কালীঘাটের বাড়িতে জয়ী বিধায়কদের বৈঠকে ডেকেছিলেন। সে দিনই দলের প্রস্তাবে বিধায়কেরা হাত তুলে সায় দেন, পরিষদীয় দলের নেতা, উপ দলনেতা এবং মুখ্যসচেতক কে হবেন, তা ঠিক করুন দলনেত্রী মমতা। তার পর শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা, নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় ও অসীমা পাত্রকে উপদলনেতা এবং ফিরহাদ হাকিমকে মুখ্যসচেতক করার কথা জানানো হয় তৃণমূলের তরফে। সেই মর্মে দলের তরফে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয় বিধানসভায়। কিন্তু তা গৃহীত হয়নি।

তার কারণ, পরিষদীয়দলের নেতা বা অন্য পদাধিকারীর নির্বাচন পরিষদীয়দলের বৈঠকেই করতে হয়। তৃণমূলের ক্ষেত্রে তা হয়নি। ৬ মে বৈঠক থেকে বেরিয়ে একাধিক বিধায়ক সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, পরিষদীয়দলের নেতা বা অন্যান্য পদাধিকারী কে হবেন, তা ঠিক করার ভার দেওয়া হয়েছে মমতাকে। বিধানসভা অভিষেকের চিঠি প্রত্যাখ্যান করলে ১৯ মে কালীঘাটে ফের যে বৈঠক হয়, সেখানে পরিষদীয় দলের সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর করানো হয় বিধায়কদের। একাধিক বিধায়ক জানিয়েছিলেন, সেই সই তাঁদের করানো হয়েছিল ৬ মে তারিখের কার্যবিবরণীতে। এখানেই মূল জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে খবর।

সই-কাণ্ড নিয়ে তদন্তে নেমে সিআইডি চার জনের বাড়িতে গিয়েছিল। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন চৌরঙ্গীর নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, বেলেঘাটার কুণাল ঘোষ, ডোমজুড়ের তাপস মাইতি এবং ক্যানিং পূর্বের বাহারুল ইসলাম।

কিন্তু বাহারুলের সই নিয়ে ‘বিতর্ক’ তৈরি হয়েছে। ১৯ তারিখের বৈঠকে সই করানো হলেও বিধানসভায় জমা পড়া চিঠিটিতে তারিখ রয়েছে ৬ মে। ওই দিন মমতার বাড়ির বৈঠকে বাহারুল হাজির ছিলেন না। বাহারুল বলেছিলেন, ‘‘তদন্ত যখন চলছে, তখন এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বেশি কিছু বলব না। শুধু এটুকু বলি, তদন্তকারীরা আমার কাছে জানতে চান ৬ মে আমি কোথায় ছিলাম। আমি তাঁদের জানাই, ওই দিন আমি বাড়িতেই (ভাঙড়ে) ছিলাম। ওই দিনের একটি মিটিংয়ের সই আমায় দেখানো হয়। আমি তাঁদের বলি, ওই দিন আমি কোনও মিটিংয়ে যোগ দিইনি। ভোট-পরবর্তী হিংসার কারণে বাড়িতেই ছিলাম।’’

বিষয়টি দলের গোচরেও এনেছেন বলে দাবি করেন বাহারুল। অন্য দিকে, গোটা পরিস্থিতি নিয়ে প্রবীণ নেতা তথা বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব বলেন, ‘‘আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারছি না এই কারণে, আমরা কাউকে দিয়ে জোর করে সই করাইনি। কে লিখেছে জানি না। তবে বাহারুল ওই সইটি দেখে বলেছেন ওটা ওঁর সই নয়।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy