Advertisement
E-Paper

একমোয় থেকেও ফিরে এলাম প্রার্থনার জোরে

অদৃশ্য হানাদার ঠেকাতে চলছে যুদ্ধ। যাঁরা প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে লড়ছেন, তাঁদের আত্মত্যাগ যেন যথাযথ সম্মান পায়। এই থাক প্রতিজ্ঞা।

সঙ্ঘমিত্রা সরকার  (চিকিৎসক)

শেষ আপডেট: ২৯ মে ২০২১ ০৬:৩০

প্রতীকী ছবি

এ ভাবেও ফেরা যায়! ৪৯ বছরের জীবন থমকে যেতে যেতে ফিরে আসার পরে এই বিস্ময় আসাটাই স্বাভাবিক। ২৪ দিন একমো সাপোর্টে কাটানোর পরে টানা দেড় মাসের হাসপাতাল-বাস। হারিয়েই গিয়েছিলাম। শুধু আমাকে ঘিরে থাকা মানুষগুলোর সেবা-শুশ্রূষা আর অসংখ্য পরিচিত, স্বল্প পরিচিত মানুষের প্রার্থনা এবং ভালবাসায় ফিরে এসেছি।

শুরুতে কিন্তু মোটেও বুঝিনি যে, পরিস্থিতি এত ভয়াবহ হতে চলেছে। পেশায় আমি নিউরোসার্জন। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। রোগী দেখা এবং অস্ত্রোপচার, দুই-ই চলছিল সতর্কতার সঙ্গে। হঠাৎ জ্বর এল। সামান্য অপেক্ষা করেই পরীক্ষা

করাই। ২৫ নভেম্বর রিপোর্ট আসে কোভিড পজ়িটিভ। এর পরে জ্বর কমে গেলেও শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। সিটি স্ক্যান করানো হয়। রিপোর্ট আসে, মডারেট কোভিড নিউমোনিয়া। ২৮ তারিখ কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হই। হাই-ফ্লো অক্সিজেন শুরু হয়। ৬ ডিসেম্বর রাত পর্যন্ত এ ভাবেই চলছিল।

পরদিন সকাল থেকে অবস্থা খারাপ হতে শুরু করে। প্রথমে বাইপ্যাপ দেওয়া হয়। তাতেও আয়ত্তে না আসায় ভেন্টিলেশনে দেওয়া হয়। কিন্তু কিছুতেই অবস্থার উন্নতি হচ্ছিল না। দেরি না করে ওই রাতেই আমার স্বামী, যিনি নিজেও চিকিৎসক, মেডিকা সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করেন। সেখানে পৌঁছনোর কিছু পরেই আমাকে একমোয় দিয়ে দেওয়া হয়। সে দিন থেকে টানা তিন সপ্তাহ ছিলাম সংজ্ঞাহীন। মোট ২৪ দিন একমোয় থেকে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠি। বাড়ি ফিরি ১২ জানুয়ারি।

এর পরে শুরু হয় অন্য লড়াই। সেই লড়াই ছিল শরীরের সঙ্গে মনের। ছুরি-কাঁচি ধরা আমার পেশা এবং একই সঙ্গে নেশাও। আরও একটা বড় নেশা ফোটোগ্রাফি, যা ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না বলেই বিশ্বাস করি। প্রথম দিকে সেই সব কাজে ফেরার আস্থা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিলাম। কারণ, এ পাশ-ও পাশ করতে পারতাম না। সামান্য জিনিস তোলার মতো ক্ষমতা ছিল না। দীর্ঘদিন শুয়ে থাকলে পেশির এই কাঠিন্য আসবেই। বহু দিন লেগেছিল নিজে উঠে দাঁড়াতে। চোখ বুজলেই মনে হত আবার ফিরে যাচ্ছি মেশিনে ঘিরে থাকা জীবনে। আইসিইউ সাইকোসিসের সঙ্গে কোভিড-পরবর্তী বাধা কাটাতে ফিজ়িয়োথেরাপির পাশাপাশি চলেছিল মেন্টাল কাউন্সেলিং। স্বাভাবিক জীবনে ফেরাতে সঙ্গে ছিল মা-বাবা, শাশুড়ি, স্বামী আর ভাইপোর আপ্রাণ চেষ্টা।

সেই সম্মিলিত চেষ্টার জোরেই দীর্ঘ তিন মাস পরে, ২৫ ফেব্রুয়ারি ফিরেছিলাম কাজে। তারও বেশ কিছু দিন পরে, মার্চের মাঝামাঝি নিজের হাতে আবার মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার করি। অবশ্যই সেটা সম্ভব হয়েছিল সহকর্মীদের সহযোগিতায়। এখনও আমার পায়ের জোর পুরো আসেনি। বেশি ক্ষণ দাঁড়াতে পারি না। তবে হাতে তুলে নিতে পেরেছি ভারী ক্যামেরা। সেটাই মনের জোর ফিরিয়ে দিয়েছে অনেকখানি।

একমাত্র সন্তান অসুস্থ থাকাকালীন ওই দীর্ঘ সময়ে প্রায় খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন আমার ৮১ বছরের বাবা। এখন তিনি বিভিন্ন শারীরিক অসুস্থতায় জর্জরিত। তাঁর পাশে থাকতে মা-বাবার কল্যাণীর বাড়িতে যাতায়াত করছি। ওই বাড়ি আমার জীবনের সব কিছু। আমার মা-বাবা, যাঁরা আমার পুরোটা জুড়ে আছেন, শাশুড়ি, স্বামী, ভাইপো, আটখানা বেড়াল, একটা নেড়ি এবং ক্যামেরা— এই সব সম্পত্তি আগলে রাখতে চাই। আর আমি আগলে থাকতে চাই তাঁদের ভালবাসায়, যাঁদের প্রার্থনায় ফিরে এলাম।

প্রার্থনা করুন সবার জন্য, সহিষ্ণু হোন সকলের প্রতি। অনিশ্চিত জীবন নিয়ে সমাজের সব স্তরের মানুষ যুদ্ধ করছেন। যাঁর পক্ষে যতটা সম্ভব, ততটা দিয়ে লড়াই চলছে। তাই সমস্ত পেশার মানুষকে সম্মান করুন। সমালোচনা না করে সকলেই যদি নিজের কাজটা মন দিয়ে করি, এক দিন মেঘ সরে যাবেই।

coronavirus
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy