Advertisement
E-Paper

Lata Mangeshkar: বাবা প্রায়ই বলতেন, লতার গলা সাক্ষাৎ সরস্বতীর গলা

বাবা আর লতাদির ‘আজ তবে এইটুকু থাক’ আজ বার বার মনে পড়ছে। না, সেই দিন আর ফিরে আসবে না! বাকি কথা আর হবে না!

অন্তরা চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ০৭:২৬
ত্রয়ী: সলিল চৌধুরী, লতা মঙ্গেশকর ও সবিতা চৌধুরী।

ত্রয়ী: সলিল চৌধুরী, লতা মঙ্গেশকর ও সবিতা চৌধুরী। ফাইল চিত্র।

মা প্রায়ই বাবার কাছে অনুযোগ করতেন— তোমার সব ভাল গানই তো লতাকে দিয়ে দাও! আমার বেলা খালি যত জ্ঞানের গান! ওই বৌ কথা কও…।

বাবা (সলিল চৌধুরী) শুনে হাসতেন, তোমাকেও তো কত ভাল গান দিয়েছি। আসলে কিন্তু বাবার কোনও পক্ষপাতিত্ব ছিল না! একটু ফোক-ঘেঁষা গান মাকে (সবিতা চৌধুরী) দিলেও নির্মোহ ভাবে কঠিন গানগুলো তিনি লতাদিকেই দিতেন। প্রায়ই বলতেন, লতার গলা সাক্ষাৎ সরস্বতীর গলা। আজ সরস্বতীর বিসর্জনের দিনে আরও বেশি করে কথাটা মনে হচ্ছে। ওঁর স্থির বিশ্বাস ছিল, লতার মতো সে-গানে আর কেউ এতটা ‘জাস্টিস’ করতে পারবেন না।

বাবা-মায়ের একটা ছবি আমার ভীষণ প্রিয়। মা হারমোনিয়ামে, বাবা তবলায় বসেছেন। বম্বের পেডার রোডের বাড়ির ছবি। আমি তখনও জন্মাইনি। ওই আশ্চর্য মুহূর্তের কিন্তু জন্মই হয়েছিল লতাদির জন্য, বাবার এক অবিস্মরণীয় গান সৃষ্টির সময়ে। রেকর্ডিং কোম্পানি থেকে বলেছে, লতার জন্য নতুন বেসিক গান করতে হবে। বাবা মাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন নতুন সুরের খোঁজে। পাওয়াইয়ের লেকে যাবেন। কিন্তু মাঝরাস্তায় বাবা বললেন গাড়ি ঘোরাতে। বাড়ি ফিরব। সুর পেয়ে গিয়েছি! ঝটপট মাকে হারমোনিয়মে বসিয়ে, নিজে তবলায় বসে সুরটা ঝালিয়ে নেওয়া। মা রেকর্ডার চালিয়ে রেখেছিলেন। বাবা সেই সুরে কথাও বসালেন মুখে মুখেই! তৈরি হল ‘না যেয়ো না’। বাবার তৈরি আমার সব থেকে প্রিয় গানগুলোর মধ্যে একটা।

লতাদিকে ছোটবেলায় আন্টিই বলতাম! কিন্তু পরে কী ভাবে বড় হয়ে দিদি বলা শুরু হল। মনে আছে, স্কুল থেকে সটান বম্বের ওয়েস্টার্ন আউটডোর স্টুডিয়োয় গিয়ে দেখি, লতাদি বাবার সুরে গান তুলছেন— ‘আজ নয় গুনগুন, গুঞ্জন প্রেমের’! বিখ্যাত রেকর্ডিস্ট দামান সুদ রেকর্ডিংয়ে। রিহার্সালের সময়ে আমি ভাবছি, লতাদির হলটা কী! গলা তো শোনাই যাচ্ছে না। কিন্তু এর পরে ‘টেক’ শুরুর পরেই পুরো অন্য মেজাজ। সেই প্রথম বুঝলাম, রেকর্ডিংয়ের আগে বেশি পরিশ্রম করলে গলা ক্লান্ত হয়ে পড়বে। আসল সময়ের জন্য শিল্পীকে গলাটা প্রিজ়ার্ভ করতে হবে তো!

বাবা ও লতাদির মধ্যে অদ্ভুত একটা ‘কমিউনিকেশন’ ছিল! তার সবটা আমাদের মতো কারও বোঝাও কঠিন। লতাদি বিদেশে গেলেই বাবার জন্য উপহার আনতেন। রেকর্ড আর সুরের বই! বিটোফেন, মোৎজ়ার্টের বিভিন্ন সিম্ফনির নোটেশন, স্কোরশিট। এর কিছু কিছু, মোৎজ়ার্টের বিখ্যাত জি মাইনর সিম্ফনির স্কোর মায়ের বাড়িতে আজও আছে। লতাদি জানতেন, হারমনি আর কাউন্টারপার্ট নিয়ে বাবা কত পড়াশোনা করতেন। সম্ভবত এর পরেই ‘মায়া’ ছবির জন্য মোৎজ়ার্টের অনুপ্রেরণায় বাবা গান বাঁধেন, ‘ইতনা না মুঝসে তু প্যায়ার বঢ়া’!

এমনও হয়েছে, লতাদির কণ্ঠ বাবা তাঁর গানে বাজনার মতো ব্যবহার করেছেন। ‘মায়া’ ছবিতেই দ্বিজেন (মুখোপাধ্যায়) আঙ্কলের গান ছিল, অ্যায় দিল কাঁহা তেরি মনজিল! তাতে লতাদি শুধু হামিং করছেন। ওঁর গলাটা যেন হাই ফ্লুট বা বেহালার মতো গানের সঙ্গে বাজছে। ১৯৭৪ সালে ‘নেল্লু’ ছবিতে লতাদির সম্ভবত একমাত্র মালয়ালম গানের জন্য বাবা সন্ধ্যা (মুখোপাধ্যায়) আন্টির বিখ্যাত গানের সুরটা নিলেন। মূল গানটা ছিল— সজনী গো সজনী দিন রজনী! লতাদিও বাবার কাছে গান চেয়ে নিতেন। যেমন, হেমন্তকাকার (মুখোপাধ্যায়) রানার! লতাদির জন্য বাবা আলাদা অ্যারেঞ্জমেন্ট করে দিলেন। পিন্টু কাকার (ভট্টাচার্য) গাওয়া ‘আমি চলতে চলতে’, হিন্দি ছবিতে মুকেশের গাওয়া ‘কোই বার ইঁয়ু ভি দেখা হ্যায়’-এর পরে লতাদির গাওয়া বাংলা গানের জন্য আলাদা অর্কেস্ট্রেশন হল। কী-সব কোলাবরেশন, ক্রিয়েশন! লতাদি বাবা আর হেমন্তকাকার কাছে যত্ন করে বাংলা শিখতেন গানের জন্য।

২০১৩ সালে সলিল চৌধুরীর রচনা সংগ্রহের ভূমিকা লতাদি লিখে দিয়েছিলেন। তখন দেখা হয়েছিল। বললেন, ‘‘তোমার বাবার গান আমার মতো আর কেউ গাইতে পারেননি।’’

বাবা আর লতাদির ‘আজ তবে এইটুকু থাক’ আজ বার বার মনে পড়ছে। না, সেই দিন আর ফিরে আসবে না! বাকি কথা আর হবে না!

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy