প্রায় ১৯ ঘণ্টা কেটে গিয়েছে। এখনও ধিকিধিকি করে জ্বলছে পূর্ব কলকাতার আনন্দপুরের নাজিরাবাদের বিশাল দু’টি গুদাম। বাতাসে পোড়া গন্ধ। কান পাতলে স্বজন হারানোর আর্তনাদ। সোমবার রাত ৯টা নাগাদ সাতটি দগ্ধ দেহাংশ মেলার খবর মিলেছে সেখান থেকে। আগে উদ্ধার হয়েছে পুড়ে কঙ্কালসার হয়ে যাওয়া তিনটি দেহ। হতাহতের সংখ্যা ঠিক কত, এখনও পরিষ্কার নয়। পুলিশ সূত্রে খবর, অগ্নিকাণ্ডের পর এখনও পর্যন্ত ২০টি পরিবারের তরফে নিখোঁজ ডায়েরি করা হয়েছে থানায়। চলছে রাজনৈতিক চাপানউতরও।
আনন্দপুরের ওই গুদামটি একটি নামী মোমো কোম্পানির। গুদাম ভর্তি ছিল নরম পানীয় এবং শুকনো খাবারের প্যাকেটে। স্থানীয় সূত্রে খবর, রবিবার রাত ৩টে নাগাদ আগুন লাগে সেখানে। তার পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা আগুনের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে দমকলবাহিনী এবং পুলিশকে। দমকলের ১২টি ইঞ্জিন কাজে লাগানো হয়েছে। তার পরেও সোমবার রাত পর্যন্ত আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি। রাত ৯টার পরেও ধিকি ধিকি করে জ্বলছে ওই গুদাম।
প্রাণহানির সংখ্যা ঠিক কত, ঠিক কত আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও জানা যায়নি। জানা যায়নি, প্রায় ২০টি পরিবারের মূল উপার্জনকারীদের এক জনও বেঁচে রয়েছেন কি না। এ নিয়ে অবশ্য পুলিশও আশার কথা শোনাতে পারেনি। তাদের একটি সূত্রে খবর, সাতটি দগ্ধ দেহাংশ মিলেছে। তা মানুষের না কি অন্য প্রাণীর, তা এখনই জানা সম্ভব নয়। শনাক্ত করার কোনও উপায় দেখছেন না কেউ। ভিসেরা পরীক্ষা হলে তবেই কিছু তথ্য জানা সম্ভব হবে। ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞদের কাজে লাগানো হচ্ছে।
আগুন লাগার পর থেকেই ২০ জন নিখোঁজ বলে দাবি ওঠে। পুলিশ সূত্রে খবর, ওই ২০ জনের নামে নিখোঁজ ডায়েরি দায়ের করা হয়েছে। গুদামের ভিতর থেকে দু’টি দেহ (বা দেহাংশ) বার করা সম্ভব হয়েছে বলেও খবর। প্রাণহানির সংখ্যা ঠিক কত, এই প্রশ্নের জবাবে বারুইপুর পুলিশ জেলার সুপার শুভেন্দ্র কুমার জানিয়েছেন, তাঁরা পুরো বিষয়টা তদন্ত করে দেখছেন। পরে এ নিয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।
আনন্দপুর অগ্নিকাণ্ড নিয়ে ইতিমধ্যে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়ে গিয়েছে। বিরোধীরা বলছেন, প্রশাসনিক ব্যর্থতা। রাজ্যের মন্ত্রীরা তা মানতে নারাজ। দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। সোনারপুর উত্তর বিধানসভা এবং নরেন্দ্রপুর থানার অন্তর্গত ওই এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে পৌঁছেছিলেন বিধায়ক ফিরদৌসী বেগমও। দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু জানিয়েছেন, কী ভাবে এমনটা হল, তার তদন্ত চলছে। তাঁর কথায়, ‘‘অনেক বড় জায়গা জুড়ে দু’খানা গোডাউন ছিল। আমরা সকাল (সোমবার) থেকে এটা ‘ফলো’ করছি। ফায়ারের রিপোর্ট হয়, কিন্তু মানুষেরও কিছু অসতর্কতা থাকে।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘এতবড় শহরের মধ্যে অনেকে অনেক কিছু ঘটনা ঘটায়। কিন্তু ওখানে এত লোক থাকবে কেন রাত্রিবেলায়? একটি গোডাউনের মধ্যে এত লোক থাকবে কেন, এগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’’ পাল্টা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলেন, ‘‘দমকল মন্ত্রী এখন কোথায় দম দিচ্ছেন, উনিই বলতে পারবেন। প্রত্যেক মাসেই বলি, দু’মাস অপেক্ষা করুন। হয় কোথাও বোমা ফাটবে, নয় কোথাও অবৈধ বাজি কারখানায় আগুন লাগবে, নইলে কোথাও কোনও বাজারে আগুন লেগে যাবে, জতুগৃহ তৈরি করে রাখা হয়েছে তো। পশ্চিমঙ্গে তো সাময়িক বিরতিতেই এই ঘটনা ঘটছে।” কটাক্ষ করেন তিনি। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী কটাক্ষ করেন, ‘‘সরকার ছুটি রয়েছে। প্রজাতন্ত্র দিবসের ছুটি কাটাচ্ছে! এই সরকার আর থাকবে না।’’ তিনি জানান, তাঁর জেলা পূর্ব মেদিনীপুরের ময়নার এক যুবকও ওই গোডাউনে কাজ করতেন। তাঁর খোঁজ মেলেনি।
আরও পড়ুন:
গড়িয়া থেকে আনন্দপুরে ছুটে যাওয়া এক বধূ কাঁদতে কাঁদতে জানান, তাঁর স্বামী ছিলেন ওই গোডাউনে। মধ্যবয়স্কা বলেন, ‘‘রাত ৩টে নাগাদ ফোন করেছিল। বলল, ‘বাঁচাও আমরা আগুনে ফেঁসে গিয়েছি।’ কী করব বুঝতে পারছিলাম না।’’ তার পর অ্যাপ ক্যাব ভাড়া করে আনন্দপুরে পৌঁছোন বধূ। কিন্তু স্বামীর আর্তনাদ এখনও কানে বাজছে— ‘‘আর পাঁচ মিনিটে সব শেষ হয়ে যাবে। তোমাদের কাছে আর ফেরা হল না।’’